মাত্র দেড় হাজার টাকা মাসিক পড়াশোনার খরচ জোগাতে না পেরে মেধাবী এক স্কুলছাত্রীর বাল্যবিবাহের উদ্যোগ নিয়েছিল পরিবার। কিন্তু নিজের স্বপ্ন পূরণে অটল ছিল সে। জাতীয় শিশু সহায়তা জরুরি হটলাইন ১০৯৮-এ ফোন করে নিজেই ঠেকিয়েছিল নিজের বাল্যবিবাহ।
সেই সাহসী উদ্যোগের গল্প নিয়ে আজকের পত্রিকায় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পাঁচ দিনের মধ্যেই বদলে গেল ওই শিক্ষার্থীর জীবনের গতিপথ। তার পাশে দাঁড়িয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলা প্রশাসন। তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি তার লেখাপড়ার সম্পূর্ণ ব্যয় বহনের ঘোষণা দিয়েছে প্রশাসন।
বুধবার (২৯ জুলাই) দুপুরে গোমস্তাপুর উপজেলা পরিষদে ওই দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে ডেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অর্থাভাবে যাতে তার পড়াশোনা বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়।
এর আগে ২৪ জুলাই আজকের পত্রিকা অনলাইনে ‘পড়াশোনায় মাসে খরচ দেড় হাজার টাকা, মেধাবী ছাত্রীর বিয়ের উদ্যোগ নিয়েছিলেন বাবা-মা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে উঠে আসে, চরম দারিদ্র্যের কারণে মাসে মাত্র দেড় হাজার টাকার পড়াশোনার খরচ বহন করতে না পেরে পরিবারের পক্ষ থেকে ওই শিক্ষার্থীর বিয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে সে নিজেই ১০৯৮ নম্বরে ফোন করে বাল্যবিয়ে বন্ধ করে দেয়।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর বিষয়টি গোমস্তাপুর উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসে। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীর পরিবার ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তার শিক্ষাজীবন যাতে আর্থিক সংকটে থেমে না যায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীর মা বলেন, ‘আমরা অনেক খুশি। ইউএনও স্যার আমার মেয়ের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। আজকের পত্রিকাকেও ধন্যবাদ। আমাদের দুঃখ-কষ্টের গল্পটি তুলে ধরার কারণেই বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের নজরে এসেছে। এখন আর আমরা মেয়ের বিয়ে দেব না। তাকে ভালোভাবে পড়াশোনা করিয়ে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।’
এ বিষয়ে গোমস্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকির মুন্সী বলেন, ‘একটি দরিদ্র পরিবারের মেয়ে শুধু অর্থাভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছিল না। এ কারণে পরিবারটি বাল্যবিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু মেয়েটি অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে শিশু সহায়তা জরুরি হটলাইনে ফোন করে নিজের বাল্যবিয়ে নিজেই ঠেকিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংবাদটি প্রকাশের পর বিষয়টি আমাদের নজরে আসে। এরপর আমরা তার পরিবার ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছি। তার লেখাপড়ার ব্যয় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বহন করা হবে।’
ইউএনও আরও বলেন, ‘কোনো মেধাবী শিক্ষার্থী যেন শুধু দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষা থেকে ঝরে না পড়ে, সে বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। একই সঙ্গে তার অভিভাবকদের বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর দিক ও আইনি পরিণতি সম্পর্কে জানানো হয়েছে। তারা আশ্বস্ত করেছেন, মেয়েটি যত দিন পড়াশোনা করতে চাইবে, তত দিন তার শিক্ষা অব্যাহত থাকবে।’
স্থানীয়দের মতে, এই উদ্যোগ শুধু একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ রক্ষা করেনি, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধেও একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। এক কিশোরীর সাহসী সিদ্ধান্ত, গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং প্রশাসনের মানবিক উদ্যোগ—এই তিনের সমন্বয়ে বদলে গেছে একটি সম্ভাবনাময় জীবনের গল্প।