চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার নায়েরগাঁও উত্তর ইউনিয়নের চার গ্রামে বিএনআর নামের একটি হাইব্রিড মোটা ধান আবাদ করে বিপাকে পড়েছেন অর্ধশত কৃষক। বাম্পার ফলনের আশায় আবাদ করা প্রায় ৭০ একর জমির অধিকাংশ খেতে ধানগাছে শিষ আসেনি; কোথাও শিষ এলেও বেশির ভাগই চিটা। এতে কৃষকদের কয়েক মাসের শ্রম ও লাখ লাখ টাকার বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলো হলো গোবিন্দপুর, নন্দীখোলা, কাচিয়ারা ও বকচর। কৃষকেরা স্থানীয় এক ডিলারের কাছ থেকে প্রতি কেজি বীজ সাড়ে ৫০০ টাকা দরে কিনে বীজতলা তৈরি করেন। পরে নিয়ম মেনে জমিতে চারা রোপণ, সেচ, সার, কীটনাশক প্রয়োগসহ সব ধরনের পরিচর্যা করেন।
কৃষকদের ভাষ্য, বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা তাঁদের একরপ্রতি ১০০ মণ পর্যন্ত ধান উৎপাদনের আশা দেখিয়েছিলেন। সেই বিশ্বাসে কেউ ঋণ নিয়েছেন, কেউ সঞ্চয়ের টাকা খরচ করেছেন। কিন্তু চার মাস পর মাঠে গিয়ে তাঁরা দেখছেন, অধিকাংশ ধানগাছে শিষ নেই; কোথাও শিষ থাকলেও তাতে ধান হয়নি।
নন্দীখোলা গ্রামের কৃষক আয়েশা বেগম আড়াই একর জমিতে এই ধান আবাদ করেছিলেন। নিজের জমির পাশে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘কোম্পানির লোকজন কইছিল, একরে ১০০ মণ ধান হইব। সেই কথা বিশ্বাস কইরা আড়াই একর জমিতে চাষ করছি। যা যা লাগে সব দিছি। চার মাস পার হইয়া গেছে, কিন্তু ধান নাই। এখন আমি কী নিয়া বাঁচমু?’
একই অভিযোগ করেন কৃষক মাসুদ আলম, গোলাম মোস্তফা, জামাল হাজি, মিজানুর রহমান, আবুল কালামসহ অন্যরা। তাঁদের ভাষ্য, প্রতি একর জমিতে প্রায় ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। কিন্তু ফলনের কোনো আশা নেই। অনেকেরই জমির খরচ উঠবে না; বরং ঋণের বোঝা আরও বাড়বে।
সরেজমিনে কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ জমিতে ধানগাছ দাঁড়িয়ে থাকলেও শিষ প্রায় নেই। কোথাও শিষ থাকলেও অধিকাংশই ফাঁপা। অনেক কৃষক খড় কাটার আগ্রহও হারিয়ে ফেলেছেন। তাঁদের ধারণা, খড় কাটতে যে খরচ হবে, তা বিক্রি করে ওঠানো সম্ভব হবে না।
গোবিন্দপুর গ্রামের এক কৃষক বলেন, ‘ধান তো পাই নাই, এখন খড় কাটলেও লোকসান। কাটার মজুরি দেওয়ার সামর্থ্যও নাই।’
কৃষকদের অভিযোগ, বীজ বিক্রির সময় তাঁদের কাছে উচ্চ ফলনের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। ফলন বিপর্যয়ের পর এখন তাঁরা দিশেহারা। কৃষির ওপর নির্ভরশীল অনেক পরিবারের সারা বছরের জীবিকায় এ ক্ষতির প্রভাব পড়বে বলেও আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং কর্মকর্তা ওবায়দুর রহমান বলেন, ‘আমরা ক্ষতিগ্রস্ত জমিগুলো পরিদর্শন করেছি। বিষয়টি নিয়ে কোম্পানি অবগত আছে। মতলবে যেসব জমিতে সমস্যা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোতে আলু উত্তোলনের পর ধানের চারা রোপণ করা হয়েছিল। কেন এমন হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কৃষকদের সঙ্গে আমরা কাজ করি। তাই তাঁদের সহযোগিতার বিষয়ে কোম্পানি অবশ্যই বিবেচনা করবে।’
মতলব দক্ষিণ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চৈতন্য পাল বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত। কৃষকদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা অপূরণীয়। কোম্পানির কর্মকর্তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। সমস্যার কারণ নির্ণয়ে নমুনা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন। কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে কতটুকু ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’
ফলনহীন মাঠের দিকে তাকিয়ে হতাশ কৃষকেরা দ্রুত তদন্ত, ক্ষতির কারণ নির্ণয় এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, অন্যথায় এ ক্ষতি সামাল দেওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব হবে না।