চাঁদপুরের মতলব উত্তরে সাড়ে তিন মাসে ২৫টি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় মামলা রুজুর আবেদন পাওয়ার পরও এফআইআর না করায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কামরুল হাসানকে ‘অযোগ্য ও অদক্ষ’ বলেছেন আদালত। তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ও চাঁদপুরের পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার চাঁদপুরের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. নসরুল্লাহ এ আদেশ দেন। আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ওসি কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে তা তাঁর সার্ভিস বুকে সংরক্ষণ এবং আদালতকে জানাতে বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে মামলা হিসেবে নথিভুক্ত না হওয়া ২৩টি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে এফআইআর রুজুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চাঁদপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নাজির ফখরুদ্দিন স্বপন বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার মতলব উত্তর থানায় ২৫টি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় পৃথকভাবে মামলা রুজুর আবেদন করেন। ২৩টি আবেদন এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত না করায় ওসি মোহাম্মদ কামরুল হাসানকে ব্যক্তিগতভাবে আদালতে হাজির হয়ে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
ওসি মোহাম্মদ কামরুল হাসান পরে আদালতে হাজির হয়ে লিখিত জবাব দেন এবং অব্যাহতি চান।
আদালতের আদেশে বলা হয়, লিখিত জবাবে ওসি স্বীকার করেছেন যে তিনি এফআইআর রুজুর আবেদনগুলো পেয়েছিলেন। তবে বাদীর পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা, মুঠোফোন নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর না থাকায় মামলা রুজু করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
তবে আদালত নথি পর্যালোচনা করে দেখতে পান, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর প্রতিটি আবেদনে ঘটনার স্থান, তারিখ এবং চুরি হওয়া ট্রান্সফরমারের সিরিয়াল নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য ছিল। ঘটনাস্থল ও সময় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি বলে ওসি যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটিও সঠিক নয়।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, গত ১ মে থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত ২৫টি স্মারকের মাধ্যমে ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় মামলা রুজুর আবেদন করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২। গত ৪ আগস্ট আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে দুটি ঘটনায় আদেশ দিয়ে প্রতিবেদন চাওয়া পর্যন্ত কোনো মামলা রুজু করেননি ওসি।
আদালত কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়ার আগ পর্যন্ত অবশিষ্ট ২৩টি আবেদনের ভিত্তিতেও কোনো মামলা হয়নি বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়।
আদালত মন্তব্য করেন, ট্রান্সফরমার চুরির মতো আমলযোগ্য অপরাধের অভিযোগ পাওয়ার পরও ওসি কোনো এফআইআর করেননি। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা করা হয়নি। ওসির এ নিষ্ক্রিয়তা পল্লী বিদ্যুতের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ চুরির পুনরাবৃত্তিকে উৎসাহিত করেছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়ে সরকারের প্রতি জনরোষ সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করেছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আমলযোগ্য অপরাধের সংবাদ পাওয়ার পরও এফআইআর না করে ওসি পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গলের ২৪৩ ও ২৪৪ বিধি এবং ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৫৪ ধারার বিধান লঙ্ঘন করেছেন, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
আদেশে বলা হয়, ‘নিষ্ক্রিয়, উদাসীন ও দায়িত্বে অবহেলাকারী’ ব্যক্তি থানার ওসির মতো গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল পদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অযোগ্য ও অদক্ষ—বিষয়টি আদালতের কাছে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয়েছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশাসন) নাজিমুল হক বলেন, আদালতের আদেশ এখনো তাঁদের হাতে পৌঁছায়নি। আদেশ হাতে পাওয়ার পর আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।