হোম > সারা দেশ > চাঁদপুর

কচুরিপানার দখলে অস্তিত্ব সংকটে ডাকাতিয়া নদী, বিপর্যস্ত জীবিকা ও জীববৈচিত্র্য

ফরিদগঞ্জ (চাঁদপুর) প্রতিনিধি 

কচুরিপানাজটে আক্রান্ত চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে ডাকাতিয়া নদীতে নৌযান থেকে মালামাল নামাচ্ছেন শ্রমিকেরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

একসময় নদী মানেই ছিল জীবন। আর সেই জীবনের অন্যতম প্রতীক ছিল চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ডাকাতিয়া নদী। এই নদীকে কেন্দ্র করেই জীবিকা নির্বাহ করত উপজেলার হাজারো পরিবার। প্রমত্তা স্রোত, লঞ্চ, ট্রলার, নৌকার চলাচল, জেলেদের মাছ ধরার ব্যস্ততা, নদীকেন্দ্রিক হাট-বাজার, শিশু-কিশোরদের জলকেলি—সব মিলিয়ে নদীটি ছিল এই ফরিদগঞ্জের প্রাণ।

আজ সেই ডাকাতিয়া যেন নীরব দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের শেষ পরিণতির অপেক্ষায়। কচুরিপানার দখল, পলি জমা এবং নানা প্রতিবন্ধকতায় নদীটি হারিয়েছে তার স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রাণচাঞ্চল্য।

বছরের পর বছর নদীতে পলি জমেছে। কোথাও কচুরিপানার দখল, কোথাও অবৈধ স্থাপনা, আবার কোথাও অপরিকল্পিত বাঁধ ও সংযোগ সড়কের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বর্ষাকাল ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময় নদীর অনেক অংশে পানি থাকে না। কোথাও কোথাও নদীর তলদেশ এতটাই ভরাট হয়ে গেছে যে সহজেই হেঁটে পার হওয়া যায়।

দখলে-দূষণে আক্রান্ত চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে ডাকাতিয়া নদীতে পানি অদৃশ্য। ছবি: আজকের পত্রিকা

ডাকাতিয়া নদীকে ঘিরেই একসময় ফরিদগঞ্জের বহু জনপদ গড়ে উঠেছিল। কৃষকেরা নদীর পানি দিয়ে জমিতে সেচ দিতেন। জেলেরা দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ব্যবসায়ীরা নৌপথে পণ্য পরিবহন করতেন। সন্ধ্যা হলে নদীর ঘাটে জমে উঠত মানুষের আড্ডা। আজ সেই চিত্র আর দেখা যায় না।

নদীতে পানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। দেশীয় প্রজাতির মাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অনেক জেলে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। কৃষকেরা সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন—যা পরিবেশের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় জেলে হরলাল চন্দ্র দাস ও বরমন চন্দ্র দাস বলেন, ‘একসময় এই নদীতে মাছ ধরেই আমাদের সংসার চলত। এখন বর্ষা ছাড়া নদীতে তেমন পানি থাকে না, মাছও পাওয়া যায় না। তাই অনেক বছর আগে বাধ্য হয়ে অন্য পেশা বেছে নিয়েছি।’

ডাকাতিয়া নদীর সংকট শুধু একটি নদীর সংকট নয়; এটি পুরো একটি পরিবেশব্যবস্থার সংকট। নদীতে পানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর সংখ্যা কমছে। আগের মতো দেখা যায় না বিভিন্ন জলচর পাখিও। নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খাল-বিলও শুকিয়ে যাচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর। নদী বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচবে, আর নদী হারিয়ে গেলে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো ফরিদগঞ্জ।

ভরপুর কচুরিপানার মধ্যে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে ডাকাতিয়া নদীতে মাছ শিকার করার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছেন স্থানীয় জেলেরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

চান্দ্রা-গাজীপুর এলাকার সিরাজ মিয়া, আব্দুর রহমানসহ কয়েকজন বলেন, ‘একসময় এই ডাকাতিয়া নদীপথে আমরা পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতাম। সড়কপথের তুলনায় নদীপথে পরিবহন ব্যয় কম ছিল। কিন্তু এখন কচুরিপানার কারণে নৌযান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় কচুরিপানার জট সরিয়ে নৌযান চালাতে হয়। কচুরিপানা অপসারণ করা গেলে নৌপথ আবার ব্যবহার উপযোগী হবে। এতে জেলে সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপকৃত হবে।

নদীপাড়ের বাসিন্দা আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘এই ডাকাতিয়া নদী দিয়ে একসময় লঞ্চে করে আমি ঢাকায় যাতায়াত করেছি। এখন সেই নদী দখল ও দূষণে বিলুপ্তির পথে। বিষয়টি ভাবলেও অবাক লাগে।’

ফরিদগঞ্জের প্রবীণ বাসিন্দা মো. নুরু জামান বলেন, ‘কয়েক দশক আগেও ডাকাতিয়া নদীতে বড় বড় নৌকা, ট্রলার, এমনকি যাত্রীবাহী লঞ্চও চলাচল করত। নদীর গভীরতা ছিল অনেক বেশি। বর্ষাকালে নদী ভরে যেত পানিতে। মানুষ দূরদূরান্ত থেকে নদীর সৌন্দর্য দেখতে আসত। জেলেরা নৌকায় করে মাছ ধরতেন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই নদী আজ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে সেই সময়ের কথা যেন রূপকথার গল্প।’

মো. মামুনুর রশিদ পাঠান ও নুরুন্নবী নোমান বলেন, নদীর এই সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিন নিয়মিত খননের অভাব, অবৈধ দখল ও স্থাপনা নির্মাণ, নদীতে বর্জ্য ফেলা, স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি এবং নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব। এসব কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সংকুচিত হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে নদীটি অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু মৌসুমি উদ্যোগে ডাকাতিয়া নদী রক্ষা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা। নদীর অবৈধ দখল দ্রুত উচ্ছেদ, নিয়মিত খনন, নদীতে বর্জ্য ফেলা সম্পূর্ণ বন্ধ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেটু কুমার বড়ুয়া বলেন, ডাকাতিয়া নদীর কচুরিপানা অপসারণ, নদী খনন এবং উপজেলার ৯২টি খাল পুনঃখননের বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে কাজ শুরু হবে। তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা যদি ডাকাতিয়া নদী থেকে কচুরিপানা অপসারণে উদ্যোগ নেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।’

চাঁদপুরে ৬ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে বাড়ির কেয়ারটেকার আটক

চাঁদপুরে একযোগে বদলি ৩১ ইউপি প্রশাসনিক কর্মকর্তা

চাঁদপুরে প্রবাসীকে হত্যার অভিযোগ, চার যুবকের বিরুদ্ধে মামলা

জিলাপিতে হাইড্রোজ, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি: চাঁদপুরে ৩ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা

আদালতে মামলা পরিচালনা করতে করতেই মারা গেলেন সাবেক বার সভাপতি রুহুল আমিন

জ্বালানি-গ্যাস সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে চাঁদপুরে ১১ দলের স্মারকলিপি

চাঁদপুরে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়া যুবকদের হামলায় প্রবাসীর মৃত্যু

চাঁদপুরে বাস ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত

চাঁদপুরের ৩১ শহীদ পরিবারের আকুতি: স্বজন হত্যার বিচার চাই

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষ উপলক্ষে চাঁদপুরে শিবিরের ‘বিজয়ের দৌড়’