হোম > সারা দেশ > বগুড়া

বগুড়া পুলিশে কোটি টাকার জালিয়াতি, ৮ জনের সম্পৃক্ততা

গনেশ দাস, বগুড়া 

ফাইল ছবি

বগুড়া জেলা পুলিশের বিভিন্ন বিল-ভাউচারে জালিয়াতি করে কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে এ ঘটনায় জেলা পুলিশের ছয় সদস্য, একজন সিভিল কর্মচারী ও জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের এক কর্মকর্তাসহ আটজনের সম্পৃক্ততা পেয়েছে জেলা পুলিশ।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁরা হলেন বগুড়া পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের অফিস সহকারী রাজিবুল ইসলাম, কনস্টেবল আসাদুজ্জামান আরিফ, আমিরুল ইসলাম, নাসির উদ্দীন, রাজু আহম্মেদ, সোলাইমান হোসেন, জেলা বিশেষ শাখায় কর্মরত এএসআই কমল হোসেন এবং জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের অডিটর ফিরোজ আলম।

ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর গত ২৬ আগস্ট অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আসাদুজ্জামানকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন বগুড়ার পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ। কমিটি ইতিমধ্যে অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তাঁদের ব্যাংক হিসাবের লেনদেনসহ বিভিন্ন নথিপত্র যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

তদন্ত কমিটির প্রাথমিক তথ্যে উঠে এসেছে, জেলা পুলিশের বিভিন্ন টিএ-ডিএসহ অন্যান্য বিল-ভাউচার তৈরি করে অনলাইনে দাখিল করা হতো। পরে জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট অডিটর সেসব বিল যাচাই করে অনুমোদন দিতেন। অনুমোদনের পর বিলের টাকা সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের ব্যাংক হিসাবে জমা হতো। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া বা অতিরিক্ত বিলের মাধ্যমে পাওয়া অর্থ পরে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির সূত্র বলছে, এই প্রক্রিয়ায় গত এক বছরে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। তবে এর আগে থেকেই কয়েকজনের ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য রয়েছে।

তদন্ত কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে বগুড়া পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক মানিকুর রহমান পুলিশ সদস্যদের বিভিন্ন বিল-ভাউচার যাচাই করার সময় অসংগতি দেখতে পান। বিষয়টি তিনি তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ সুপারকে জানান।

এরপর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের অফিস সহকারী রাজিবুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্ত কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন এবং এ ঘটনায় জড়িত আরও সাতজনের নাম জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

তদন্ত কমিটির ওই সদস্য বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ কোটি টাকার বেশি। তবে পুরো হিসাব বের করতে ব্যাংক লেনদেন, বিল-ভাউচার ও সরকারি নথি যাচাই করা হচ্ছে।’

তদন্ত কমিটির একজন সদস্যের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কমিউনিটি ব্যাংকের বগুড়া শাখায় কনস্টেবল আসাদুজ্জামান আরিফের হিসাবে ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্ত কমিটির দাবি, গত এক বছরে জেলা পুলিশের বিভিন্ন বিল-ভাউচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের ব্যাংক হিসাবেও বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে।

অভিযুক্ত এএসআই কমল হোসেনের হিসাবে গত এক বছরে প্রায় ৩২ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে তদন্ত কমিটি। অন্য কয়েকজন পুলিশ সদস্যের হিসাবেও ২০-৩০ লাখ টাকা করে লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তবে এসব লেনদেনের মধ্যে তাঁদের বেতন ও টিএ বিল কী পরিমাণ রয়েছে, তা জানতে তদন্ত কমিটি ব্যাংক হিসাবের লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিল-ভাউচার ও সরকারি নথির মিল খুঁজে দেখছে।

তদন্ত কমিটির আরেক সদস্য জানান, অভিযুক্ত অফিস সহকারী রাজিবুল ইসলাম ও জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের অডিটর ফিরোজ আলমের ব্যাংক হিসাবে এসব টাকা সরাসরি জমা হয়নি।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে ওই সদস্য বলেন, রাজিবুল ও ফিরোজ যৌথভাবে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি ও অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতেন। পরে ছয় পুলিশ সদস্যের ব্যাংক হিসাবে টাকা স্থানান্তর করা হতো। সেই অর্থ পরবর্তী সময়ে ভাগ-বাঁটোয়ারা করা হয়েছে বলে অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আত্মসাৎ করা টাকার পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিটি।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত একজন পুলিশ সদস্য বলেন, তাঁর ব্যাংক হিসাবে আড়াই লাখ টাকা পাঠানোর পর সেই টাকা থেকে ৫০ হাজার তিনি পেয়েছেন। দুই লাখ টাকা ব্যাংক থেকে তুলে অফিস সহকারী রাজিবুলকে দিতে হয়েছে।

এএসআই কমল হোসেনও তাঁর ব্যাংক হিসাবে ৩২ লাখ টাকা লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে এসব টাকার উৎস সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।

কমল হোসেন বলেন, ‘বিভিন্ন সময় আমার হিসাবে টাকা ঢুকত। কোথা থেকে আসত, সেটা খোঁজ নিইনি। এখন তদন্ত কমিটি হয়েছে। বিষয়টি তারা তদন্ত করে দেখবে।’

অভিযুক্ত কনস্টেবল আসাদুজ্জামান আরিফের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে তাঁর মোবাইল ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। তার কর্মস্থল আদমদীঘির চাপাপুর পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

অফিস সহকারী রাজিবুল ইসলাম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে দুই দিন গিয়ে অডিটর ফিরোজ আলমকে পাওয়া যায়নি। ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ডাক্তার দেখাতে এসেছি, পরে কথা বলব।’ এরপর একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি।

চার সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা তদন্ত শুরু করেছি। জড়িতদের শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাঁদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।’

এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যে আত্মসাৎ করা টাকার পরিমাণ কোটি টাকার ওপরে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আত্মসাৎ করা টাকার পরিমাণ নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না।’ তিনি জানান, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বের করতে অভিযুক্তদের ব্যাংক হিসাব, বিল-ভাউচার, অনলাইন দাখিলের তথ্য এবং জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের অনুমোদনসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা হচ্ছে।