হোম > সারা দেশ > বগুড়া

গুগলে ‘অজ্ঞান করার ওষুধ’ খুঁজে বন্ধুকে হত্যা, লাশ বস্তায় ভরে গুম

বগুড়া প্রতিনিধি

গ্রেপ্তারকৃত নাজিম উদ্দিন। ছবি: সংগৃহীত

বন্ধুকে হত্যার আগে মোবাইল ফোনে গুগলে অজ্ঞান করার ওষুধের নাম খুঁজেছিলেন নাজিম উদ্দিন। এরপর কোমলপানীয়র সঙ্গে চেতনানাশক ও বিষাক্ত দ্রব্য মিশিয়ে তৃতীয় লিঙ্গের ব্যবসায়ী বন্ধু ওয়াহেদ হোসেন ওরফে নিঝুমকে (৩৭) হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন তিনি ও তাঁর আরেক বন্ধু মো. স্বপন (২৮)—এমনটাই জানিয়েছে পুলিশ।

হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক মাস পর বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলার পর কাহালু উপজেলার মদনাই গ্রাম থেকে নাজিম উদ্দিনকে (৩০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

নাজিম মদনাই গ্রামের বাবলু মিয়ার ছেলে। তিনি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আশায় বাবুর্চি হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর বন্ধু স্বপনও একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন।

পুলিশের জানিয়েছে, ঋণের টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে নিঝুমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন নাজিম ও স্বপন। নিহত নিঝুম বগুড়া শহরের সূত্রাপুর এলাকার ফল ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলামের ছেলে। তিনি বাবার সঙ্গে শহরের স্টেশন সড়কে ‘নিঝুম এন্টারপ্রাইজ’ নামে ফলের আড়তের ব্যবসা পরিচালনা করতেন।

পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, কিছুদিন আগে নিঝুম তাঁর মা রঞ্জনা বেগমের নামে আশা থেকে ব্যবসার জন্য সাত লাখ টাকা ঋণ নেন। এর মধ্যে তিন লাখ টাকা বাবাকে ব্যবসার কাজে দেন। বাকি চার লাখ টাকা থেকে বন্ধু স্বপনকে দুই লাখ এবং নাজিমকে এক লাখ টাকা ধার দেন। ধারের টাকা ফেরত চাওয়া ও লেনদেন নিয়ে একপর্যায়ে নিঝুমের সঙ্গে নাজিম ও স্বপনের বিরোধ তৈরি হয়। এই বিরোধের জেরেই তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ৭ আগস্ট নাজিম কৌশলে নিঝুমকে তাঁর কর্মস্থল আশা এনজিওর মালগ্রাম কার্যালয়ে নিয়ে যান। সেখানে নাজিম তাঁর মোবাঈর ফোনে গুগলে অজ্ঞান করার ওষুধের নাম খোঁজেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, পরে কোমলপানীয়র সঙ্গে চেতনানাশক ও বিষাক্ত দ্রব্য মিশিয়ে নিঝুমকে পান করানো হয়। এতে তিনি অচেতন হয়ে পড়লে তাঁকে হত্যা করা হয়।

এরপর নিঝুমের মরদেহ একটি বস্তায় ভরে মালগ্রাম মধ্যপাড়া দীঘিপাড় এলাকায় ফেলে রাখা হয়। পরদিন ৮ আগস্ট নাজিম ও স্বপন আশা কার্যালয় থেকে বের হয়ে যান। ওই দিনই তাঁরা স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে আত্মগোপনে চলে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে।

নিঝুম নিখোঁজ হওয়ার পাঁচ দিন পর, ১২ আগস্ট বগুড়া শহরের মালগ্রাম-শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ সড়কের পাশে মালগ্রাম মধ্যপাড়া দীঘিপাড় এলাকা থেকে বস্তাবন্দী অজ্ঞাতনামা একটি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে স্বজনেরা মরদেহটি নিঝুমের বলে শনাক্ত করেন।

এর আগে নিঝুম নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল। মরদেহ উদ্ধারের পরও হত্যাকাণ্ডের কোনো ক্লু পাচ্ছিল না পুলিশ। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত শুরু হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বগুড়া সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, নিঝুম নিখোঁজ হওয়ার আগে তাঁর মোবাইলে ফোনে কার কার সঙ্গে কথা হয়েছিল, তা জানতে কললিস্ট সংগ্রহ করা হয়। কললিস্ট বিশ্লেষণ করে নাজিম ও স্বপনকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। হত্যাকাণ্ডের আগে তাঁদের দুজনের সঙ্গেই নিঝুমের কথা হয়েছিল।

এসআই শরিফুল ইসলাম আরও বলেন, হত্যা মামলা হওয়ার পর অভিযান চালিয়ে কাহালুর মদনাই গ্রাম থেকে নাজিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। ঘটনায় জড়িত অন্য ব্যক্তিকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন, নাজিমকে বুধবার বিকেলে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে বগুড়ার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুল ইসলাম তাঁর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহীম আলী বলেন, অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধারের পর স্বজনেরা সেটি নিঝুমের বলে শনাক্ত করেন। এরপর হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটনে পুলিশ কাজ শুরু করে। বুধবার নিঝুমের ভাই সোহেল হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন।