বগুড়ায় অনলাইন জুয়ার নামে প্রতিদিন অন্তত দুই কোটি টাকা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে বলে জানিয়েছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায়সহ বিভিন্ন এমএফএস ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন জুয়াসংক্রান্ত বিরোধে গত এক বছরে দুজন খুন হয়েছেন এবং তিনজন মাস্টার এজেন্টকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল বাহার বলেন, অনলাইন জুয়ার নামে প্রতিদিন অন্তত দুই কোটি টাকা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে। লেনদেনের বড় অংশ ছোট ছোট অঙ্কে বিভিন্ন নম্বর ও হিসাবে ঘোরানো হয়। ফলে একটি হিসাব দেখে পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা কঠিন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এমএফএসের মাধ্যমে দেশে বিভিন্ন ধরনের লেনদেনের অনুমতি রয়েছে। তবে এই সেবার মাধ্যমে সীমান্তপারের অর্থ স্থানান্তর অনুমোদিত নয়।
শিবগঞ্জের ৩৫ বছর বয়সী এক যুবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিদেশ থেকে পরিচালিত কয়েকটি বেটিং সাইটের সঙ্গে তিনি যুক্ত। দুবাই, রাশিয়া, ভারত, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে কাজ আসে বলে তাঁর দাবি। শুধু শিবগঞ্জেই এ ধরনের ১২ জন এজেন্ট রয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
ওই যুবক একসময় বিকাশের দোকানে চাকরি করতেন। ২০২৩ সালে চাকরি ছেড়ে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেন। প্রথমে ডলার কেনাবেচা ও পরে বেটিং সাইটের সঙ্গে যুক্ত হন।
ওই যুবকের দাবি, প্রায় এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এজেন্ট হওয়ার পর এখন মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা আয় করেন। শহরে প্রায় ২৫ লাখ টাকা মূল্যের ছয় শতক জমিতে বাড়ি করেছেন। ২৭ লাখ টাকা চড়া সুদে ঋণ দিয়েছেন। বাবা, ছোট ভাইসহ ১৫ থেকে ২০ জনকে বেতন দিয়ে কাজ করান।
ওই যুবকের ভাষ্য, বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও বেটিং প্ল্যাটফর্মের প্রচারের জন্য অনলাইন অ্যাকাউন্ট তৈরি করা হয়। স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের দিয়ে প্রচারণা চালানো হয়। অর্থ লেনদেনে ব্যবহার করা হয় এমএফএস এজেন্টদের।
বগুড়ার ব্যাংকিং ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনলাইন বেটিংয়ের অর্থ স্থানীয়ভাবে গ্রহণ ও পরিশোধে এমএফএস নম্বর ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। কয়েকটি বিদেশি বেটিং সাইটে বাংলাদেশি ব্যবহারকারীদের জন্য বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থার তথ্যও পাওয়া গেছে।
ডিবির একজন উপপরিদর্শক বলেন, অনলাইনভিত্তিক অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের বড় সমস্যা হলো অর্থের প্রকৃত উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত করা কঠিন। একাধিক হিসাব, মোবাইল নম্বর ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের কারণে তদন্তও জটিল হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক বগুড়া শাখার তথ্য কর্মকর্তা বিশ্বদেব রায় জানান, এসব বিষয় দেখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে শাখা রয়েছে। তাঁদের কাছে এ বিষয়ে বেশি তথ্য নেই।
এবি ব্যাংক বগুড়া শাখার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কিছু ব্যক্তির লেনদেন হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার পর তাঁরা করসংক্রান্ত বিষয় সামলাতে কর নথি খুলেছেন। কেউ কেউ এ জন্য আইনজীবীর সহায়তাও নিচ্ছেন।
ডিবি, সিআইডি ও পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অনলাইনভিত্তিক অর্থ লেনদেনে ক্রিপ্টোকারেন্সি অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে। এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় অর্থের উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত করা কঠিন। ফলে জুয়া, প্রতারণা কিংবা অর্থ পাচারের সঙ্গে অর্থের যোগসূত্র থাকলে অনুসন্ধানও জটিল হয়ে পড়ে।