সারা দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট যখন তুঙ্গে, তখন সারা দেশে আলোচনায় বগুড়ার শেরপুরের পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি। ‘জ্বালানি ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদন, আর প্রতি ইউনিটের খরচ মাত্র দেড় টাকা’, এমন শিরোনামে খবর এসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। আরডিএ বলছে, দীর্ঘদিনের গবেষণার পর তারা পরীক্ষামূলকভাবে এ প্রযুক্তির কার্যকারিতা দেখাতে পেরেছে।
আরডিএর তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ সদস্যের একটি গবেষক দল ২০১৪ থেকে এই গবেষণা পরিচালনা করেছেন। এই দলের প্রধান আরডিএর উপপরিচালক ড. মনিরুল ইসলাম। স্বয়ং আরডিএর মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুল মজিদ প্রামাণিকও এই দলের সদস্য। তাঁদের সঙ্গে আরডিএর একজন পরিচালক মো. ফেরদৌস হোসেন খান এই দলের সদস্য।
এ ছাড়া বগুড়ার সদর উপজেলার এরুলিয়া ইউনিয়নের বানদীঘি গ্রামের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘বিগ চিক ইনকিউবেটর অ্যান্ড এগ্রো. ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর স্বত্বাধিকারী মতিয়ার রহমান সরকার ও মিজানুর রহমানকে সদস্য হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাঁদের ১২ বছরের কথিত গবেষণা সফল হওয়ায় ইতিমধ্যে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘জলবায়ু-সংকটাপন্ন অঞ্চলে টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহে সাশ্রয়ী ফ্লাইহুইল প্রযুক্তির উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে আলোচিত এই গবেষণার শুরু, কৃতিত্ব ও মালিকানা নিয়ে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন। মতিয়ার রহমান সরকার ও মিজানুর রহমানের দাবি, এই উদ্ভাবনের সঙ্গে আরডিএর কোনো সম্পর্ক নেই। গবেষণার ফল হিসেবে আলোচিত এই প্রযুক্তির কাজটি শুরু হয়েছিল বহু আগে, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে। আরডিএর সঙ্গে তাঁদের কোনো লিখিত চুক্তিও নেই।
মতিয়ার রহমান সরকার বলেন, পোলট্রি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় তিনি ইনকিউবেটর তৈরি করেন। বড় আকারের ইনকিউবেটরে হাজার হাজার ডিম অল্প বিদ্যুৎ খরচে ঘুরতে দেখে তাঁর মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল—বড় ভরকে তুলনামূলক কম শক্তিতে ঘোরানো বা গতিশক্তি সঞ্চয় করে পরে অন্য কাজে ব্যবহার করা যায় কি না। এর পরে ২০০৪ সালে তিনি ফ্লাইহুইলের একটি ছোট প্রোটোটাইপ তৈরির কাজ শুরু করেন। পরে মিজানুর রহমান এ কাজে যুক্ত হন। মিজানুর রহমান বিদ্যুৎ কৌশলে ডিপ্লোমাধারী এবং মোটর ও জেনারেটর তৈরির অভিজ্ঞতাও রয়েছে। দুজনের যৌথ প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে গবেষণাটি এগোতে থাকে।
আরডিএর সঙ্গে যৌথ গবেষণার বিষয়ে মতিয়ার রহমান বলেন, ‘মনির সাহেবের (আরডিএর উপপরিচালক) সঙ্গে পরিচয় হলেও ফ্লাইহুইল নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। এই বছরের মে মাসের ১৮ তারিখে আমি তাঁর অফিসে গিয়ে ফ্লাইহুইল গবেষণায় সরকারি সহায়তার জন্য প্রোফাইল তৈরি করে দিতে বলি। এরপর আরডিএর কর্মকর্তারা কয়েকবার তাঁদের গবেষণাগার পরিদর্শন করেন। প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয় এবং বড় পরিসরে একটি প্রকল্প নেওয়ার কথাও ওঠে।’
উদ্যোক্তাদের দাবি, গবেষণার কারিগরি উন্নয়ন বা যন্ত্রপাতি কেনার জন্য আরডিএ এখন পর্যন্ত কোনো আর্থিক সহায়তা দেয়নি। বর্তমানে বড় পরিসরে প্রযুক্তিটির পরীক্ষা ও ১ মেগাওয়াটের একটি পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের সরকারি অর্থায়নের জন্য আরডিএ চেষ্টা করছে।
উদ্ভাবনের কাজে সম্পৃক্ততার বিষয়ে একই কথা বলেছেন আরেক উদ্যোক্তা মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ২২ বছর ধরে আমরা এই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এতে প্রায় দেড় কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এখন আরডিএর কৃতিত্ব দাবি করা দুঃখজনক।’
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান বলেন, মতিয়ার ও মিজান ২০০৪ সাল থেকে গবেষণার কাজ করে আসছেন। এর আগে তিনি কম খরচে মুরগির ইনকিউবেটর তৈরি করেছেন, দই তৈরির একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন। অল্প খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন কৌশল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। সময়, শ্রম, অর্থ এবং ব্যক্তিগত সম্পদ ব্যয় করে বছরের পর বছর গবেষণা চালিয়ে গেছেন। যত দূর আমি জানি, এই গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারি কোনো আর্থিক সহযোগিতা ছিল না। পরবর্তীকালে প্রকল্পটিকে কারিগরি ও বাণিজ্যিকভাবে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমির সহযোগিতা চেয়েছেন।
তবে আরডিএর উপপরিচালক ড. মনিরুল ইসলাম দাবি করেন, ২০১৪ সাল থেকেই তাঁরা যৌথ উদ্যোগে গবেষণা পরিচালনা করছেন। উদ্যোক্তাদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কোনো লিখিত চুক্তি নেই। গবেষণা পরিচালনা, অর্থায়ন কিংবা প্রযুক্তির মালিকানা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক দলিলও করা হয়নি। তাঁরা মতিয়ার ও মিজানুরকে মৌখিক নির্দেশনার মাধ্যমে গবেষণা পরিচালনা করেছেন। তাই তাঁদের কাছে গবেষণার কোনো নথি নেই। যেহেতু গবেষণা সফল হয়েছে, এখন তাঁরা গবেষণাপত্র তৈরির কাজ করছেন।
তবে উভয় পক্ষই গবেষণাকে সফল দাবি করেছেন। গবেষকদের দেওয়া কারিগরি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান পরীক্ষামূলক ব্যবস্থায় ৫২ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি প্রাইম মুভার দিয়ে ৬০০ ও ১ হাজার কেজি ওজনের দুটি ফ্লাইহুইল প্রায় ১ হাজার ৪০০ আরপিএম গতিতে ঘোরানো হয়। এরপর গিয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে গতি কমিয়ে প্রায় ২৫০ আরপিএমে আনা হয়। এই যান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে একটি ২৪-পোল বিশিষ্ট স্থায়ী চুম্বক জেনারেটর যুক্ত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।
গবেষকদের দাবি, পরীক্ষায় প্রায় ৬০০ ভোল্ট ও ৫০ হার্জের বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে এবং ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে ৪০০ ভোল্টে রূপান্তর করে প্রায় ১১৯ কিলোওয়াট বাস্তব লোড সরবরাহ করা গেছে। মাত্র ৫২ কিলোওয়াট ইনপুট দিয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে এটা আরও বহুগুণে বৃদ্ধি করা যাবে।
গত ১৬ আগস্ট বগুড়ার এরুলিয়ার বানদীঘি এলাকায় পরীক্ষামূলক প্ল্যান্টে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা প্রদর্শন করা হয়। সেখানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে দুটি পাম্প ও একটি ওয়েল্ডিং মেশিন চালিয়ে দেখানো হয়। এরপরই বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। দাবি করা হয়, এই প্ল্যান্টের মাধ্যমে মাত্র দেড় টাকা ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
কথিত গবেষণার সাফল্যের বিষয়ে আরডিএর উপপরিচালক ড. মনিরুল ইসলাম জানান, তাঁদের এই বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রযুক্তি পদার্থ বিজ্ঞানের স্বীকৃত শক্তির নিত্যতা সূত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও তাঁরা বাস্তবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, আয়ারল্যান্ড, জাপান-সহ অনেক দেশ এই প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করছে বলে তিনি দাবি করেন।
গবেষক দলের আরেক সদস্য আরডিএর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. আব্দুল মজিদ বলেন, ‘১২ বছর ধরে চলা এই গবেষণায় সরকারের কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি। দুই উদ্যোক্তা ব্যক্তিগতভাবে খরচ করেছেন। আমাদের গবেষক দল তাদের সার্বিক সহযোগিতা করেছে। আমরা স্বল্পব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলেছি। তবে কোনো কোনো মিডিয়া ভুলভাবে জ্বালানি ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলেছে। বিষয়টা তেমন নয়। তবে প্রস্তাবিত প্রকল্প অনুমোদন হলে দেশের জ্বালানি খাতে আমরা অবদান রাখতে পারব।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারসিম মান্নান মোহাম্মদী বলেন, ‘যেকোনো যান্ত্রিক ব্যবস্থায় মোট আউটপুট শক্তি কখনো মোট ইনপুট শক্তির চেয়ে বেশি হতে পারে না—কোথাওই নয়। তাই এ ধরনের প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করতে হলে ইনপুট ও আউটপুট উভয় দিকের ভোল্টেজ, কারেন্ট, পাওয়ার এবং সময় হিসাব করে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরীক্ষা ও পরিমাপ করা প্রয়োজন। আর উদ্যোক্তারা যদি মনে করেন যে প্রযুক্তিটি বাস্তবেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ সাশ্রয় করছে, তাহলে প্রথমে গ্রামপর্যায়ে ছোট পরিসরে এটি প্রয়োগ করে দেখা যেতে পারে। কমিউনিটি পর্যায়ে বাস্তব ব্যবহারে এর অর্থনৈতিক ও কারিগরি সুবিধা প্রমাণিত হলে পর্যায়ক্রমে বড় পরিসরে বা স্কেল আপ করা সম্ভব। শুরুতেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রয়োজন কেন—সেই প্রশ্নেরও একটি বাস্তবসম্মত উত্তর থাকা দরকার।’