বরগুনার বামনা উপজেলা সদরের পূর্বসফিপুর গ্রাম। এক সপ্তাহ আগেও আম, জাম, কাঁঠালসহ বিভিন্ন গাছপালা সবুজ পাতায় ভরপুর ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে এসব গাছের সবুজ পাতা শুকিয়ে ঝরে যাচ্ছে। শুধু গাছ নয়, জলাশয়ের মাছও মরে ভেসে উঠছে। মানুষের শ্বাসকষ্ট, কাশি ও চোখ জ্বালাপোড়ার মতো স্বাস্থ্যগত সমস্যাও দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গ্রামটিতে অবস্থিত মো. কবির স্টোর (এমকেএস) ব্রিকস নামের একটি ইটভাটার চিমনি পরিষ্কার করার পর আশপাশের পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। কাঠ পোড়ানোর ফলে চিমনিতে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস, কালো ধূলিকণা ও ছাই বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ক্ষতিকর উপাদান আশপাশের বসতবাড়ি, গাছপালা, কৃষিজমি ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ে। এর পর থেকে গাছের পাতা শুকিয়ে ঝরে যাচ্ছে, পুকুরে মাছ মারা যাচ্ছে এবং মানুষের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, কাশি ও চোখ জ্বালাপোড়ার মতো স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বামনা সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির হাওলাদারের মালিকানাধীন এমকেএস ব্রিকসটি বর্তমানে ভাড়া নিয়ে পরিচালনা করছেন সাইফুল্লাহ নেছার নামের এক ব্যক্তি। অবৈধভাবে ইটভাটা পরিচালনার অপরাধে সম্প্রতি এর কর্তৃপক্ষকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
সরেজমিনে পূর্বসফিপুর গ্রামের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গাছের পাতার ওপর কালচে ধূলিকণার স্তর জমে আছে। অনেক গাছের পাতা হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। ইটভাটাটির আশপাশের প্রায় সব গাছের পাতা ঝরে গেছে।
স্থানীয় কৃষক মনির হোসেন বলেন, ‘জনবসতির পাশে অবৈধভাবে ইটভাটা পরিচালনা করা হচ্ছে। এখন চিমনি পরিষ্কার করার পর ক্ষতিকর বিভিন্ন গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে এই এলাকার আম, কাঁঠাল, নারকেল, পেয়ারা ও বিভিন্ন বনজগাছের পাতায় কালো ময়লা জমে গেছে। সব পাতা শুকিয়ে ঝরে পড়ছে। আগে এমন দৃশ্য দেখিনি।’
স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের কর্মচারী নাসির উদ্দিন বলেন, ‘এভাবে কোনো ঘটনা আগে দেখিনি। শুনেছি, কয়েক দিন আগে ইটভাটার বিষাক্ত গ্যাস বাতাসে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এর পর থেকে গাছের পাতা ঝরে পড়ছে। মাছ মারা যাচ্ছে। এমনকি অনেকের শ্বাসকষ্টও অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। আমরা এর প্রতিকার চাই।’
এ বিষয়ে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মহিনুজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ইটভাটার চিমনি বা ধোঁয়া নির্গমন নলের ভেতরে দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা ছাই, কালি ও দহনজাত অবশিষ্টাংশে বিভিন্ন ধরনের সূক্ষ্ম কণা এবং রাসায়নিক উপাদান থাকতে পারে। ইট পোড়ানোর সময় সাধারণত কার্বনসমৃদ্ধ কণা, ব্ল্যাক কার্বন, সূক্ষ্ম ধূলিকণা, সালফার যৌগ, নাইট্রোজেন যৌগ এবং অন্যান্য দহনজাত পদার্থ উৎপন্ন হয়। এসব উপাদানের একটি অংশ চিমনি ও ধোঁয়া পরিবহন ব্যবস্থার ভেতরে জমা হতে পারে।’
মোহাম্মদ মহিনুজ্জামান বলেন, ‘চিমনি পরিষ্কারের সময় যদি এসব পদার্থ নিয়ন্ত্রিতভাবে অপসারণ করা না হয়, তাহলে সেগুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। গাছের পাতার ওপর ধূলিকণা জমে গেলে সূর্যালোক গ্রহণ কমে যায়। ফলে সালোকসংশ্লেষণ ব্যাহত হয়। দীর্ঘসময় এই অবস্থা চলতে থাকলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পাতা ঝরে যেতে পারে। পাতার রন্ধ্র বা স্টোমাটা ধূলিকণায় বন্ধ হয়ে গেলে গাছের গ্যাসীয় বিনিময় প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।’
বামনা উপজেলার ম্যাপ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এমকেএস ব্রিকস নামের ইটভাটাটি বামনা উপজেলা পরিষদ এলাকা থেকে প্রায় এক কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। এলাকাবাসীর দাবি, জনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত এ ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ব্যবস্থাপনা যথাযথভাবে তদারকি করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে এমকেএস ব্রিকস পরিচালনাকারী সাইফুল্লাহ নেছার এবং মালিক
হুমায়ুন কবির হাওলাদারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হয়, তবে দুজনের ফোনই নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে বামনার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোসা. নিকহাত আরা বলেন, ‘ওই ইটভাটায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছি। তাঁদের ১ লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। পরিবেশগত বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা পরিবেশ অধিদপ্তর গ্রহণ করবে।’