হোম > সারা দেশ > বরগুনা

প্লাস্টিকের আগ্রাসনে বিপন্ন পায়রা বিষখালী বলেশ্বর

মনোতোষ হাওলাদার, বরগুনা

বরগুনার তালতলী তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকার বড় অঙ্কুজানপাড়ায় পায়রা নদীর তীরে পলিথিনসহ বর্জ্যের স্তূপ। সম্প্রতি তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

একসময় ইলিশসহ নানা প্রজাতির মাছের নিরাপদ আবাস হিসেবে পরিচিত ছিল বরগুনার বলেশ্বর, পায়রা ও বিষখালী নদী। কিন্তু এখন নিয়ন্ত্রণহীন প্লাস্টিকদূষণের ভয়াবহ থাবায় বিপর্যস্ত তিন নদ-নদী। জেলা শহর থেকে শুরু করে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের বাজারগুলো থেকে প্রতিদিন পলিথিন, থার্মোকল, কর্কশিটসহ বিভিন্ন প্লাস্টিক বর্জ্য নদী, খাল ও জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। ফলে নদীর পানি ও তলদেশ দূষিত হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে মাছের প্রাকৃতিক আবাস ও প্রজনন ক্ষেত্র। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি প্লাস্টিকদূষণও এখন মৎস্যসম্পদের জন্য অন্যতম বড় হুমকি। এর বিরূপ প্রভাব এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বরগুনার পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বরে।

জেলার তালতলী উপজেলার তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র-সংলগ্ন বড় অঙ্কুজানপাড়া এলাকায় দেখা গেছে, পলিথিনসহ বিভিন্ন প্লাস্টিক বর্জ্য নদীতীরে ফেলা হচ্ছে। সেখানে এসব বর্জ্যের বিশাল স্তূপ তৈরি হওয়ায় সেসব নদীর পানিতে মিশে সাগরে যাচ্ছে। এ ছাড়া বঙ্গোপসাগরের মোহনায় এসব প্লাস্টিক বর্জ্য আটকে গিয়ে নদীর নাব্যতায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে সাগর মোহনায় চর পড়ে জলজ প্রাণীর চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

শুধু তালতলী উপজেলার বড় অঙ্কুজানপাড়া নয়, জেলার প্রায় সব উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের বাজারেও প্রতিদিন একই চিত্র দেখা যায়। বাজারের পলিথিন, প্লাস্টিক, পচনশীল ও অপচনশীল বিভিন্ন বর্জ্য যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে পাশের নদী, খাল কিংবা জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে নদীর পানি, নষ্ট হচ্ছে জলজ পরিবেশ এবং বাড়ছে পরিবেশগত ঝুঁকি।

বরগুনা সদর পৌরসভায় বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করা হলেও এখনো সেটি পুরোপুরি চালু হয়নি। ফলে বাজার থেকে প্রতিদিন উৎপন্ন হওয়া বিপুল বর্জ্যের বড় অংশ নদীতীরে ফেলা হচ্ছে। অন্যদিকে, গত বছর পাথরঘাটা পৌরসভা নদীতীরে বর্জ্য ফেলার ঘটনায় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর কিছুদিন নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য অপসারণ করা হলেও বর্তমানে সেই পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন নেই। পৌর এলাকার বাজার ও মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন বিপুল প্লাস্টিক বর্জ্য—পলিথিন, কর্কশিট, থার্মোকল, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের থালাবাসনসহ নানা আবর্জনা বিষখালী নদী এবং আশপাশের খালে ফেলা হচ্ছে। ফলে একদিকে নদী ও খালের পানি এবং জলজ পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে মাছের প্রজনন ও স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়ে নদ-নদীর মৎস্যসম্পদ ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে।

সদর উপজেলার জেলে মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আগে মৌসুমে একবার জাল ফেললেই ভালো ইলিশ পাওয়া যেত। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীতে থেকেও সেই পরিমাণ মাছ পাওয়া যায় না। জালে মাছের চেয়ে পলিথিনই বেশি ওঠে।’

একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন পাথরঘাটার জেলে আবদুল মালেক। তিনি বলেন, ‘নদীর অনেক জায়গায় প্লাস্টিকের বর্জ্য ভাসতে দেখা যায়। এতে মাছের চলাচল ও আমাদের মাছ ধরার কাজে সমস্যা হয়। আয়ও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় এখনো খোলা জায়গায় বা নদীতীরে বর্জ্য ফেলার প্রবণতা রয়েছে। কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে প্লাস্টিক ও পলিথিনের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত নদীতে গিয়ে পড়ে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. মো. সাজেদুল হক বলেন, ‘প্লাস্টিকদূষণ বর্তমানে নদী ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য অন্যতম বড় হুমকি। নদীতে ফেলা প্লাস্টিক ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র কণায় (মাইক্রোপ্লাস্টিক) পরিণত হয়। এসব কণা প্ল্যাঙ্কটন, ছোট মাছসহ শেষ পর্যন্ত ইলিশ এবং বড় মাছের শরীরে প্রবেশ করে। এতে মাছের পরিপাকতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। দীর্ঘদিন মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে থাকলে মাছের প্রজননক্ষমতাও কমে যেতে পারে।’

সার্বিক বিষয়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) তাছলিমা আক্তার বলেন, ‘নদীতে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি শুধু নদীর পরিবেশ নয়, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্যের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি হুমকি সৃষ্টি করছে।’ তিনি বলেন, ‘পৌরসভা, উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে নদী ও খালে বর্জ্য ফেলা বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যেখানে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাবে, সেখানে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তাছলিমা আক্তার আরও বলেন, ‘নদী রক্ষা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। পরিবেশ রক্ষায় সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। সবাই সচেতন হলে নদীদূষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ এবং আমাদের মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সহজ হবে।’

চার দিনে বঙ্গোপসাগরে তিনটি ট্রলারডুবি, নিখোঁজ ১৩

১২–১৮ ফুট ঢেউয়ে উত্তাল বঙ্গোপসাগর, জেলেদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ কোস্ট গার্ডের

আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বৃদ্ধের জমির ধানের চারা তুলে ফেললেন আ.লীগ নেতা

বরগুনায় অটোরিকশার বিদ্যুৎ-সংযোগ খুলতে গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু, মেয়ে আহত

বন বিভাগের জমির গাছ কেটে স্থাপনা: ইউপি সদস্যসহ ৫ জন জেলহাজতে

পাথরঘাটায় প্রবাসীর বাড়িতে ডাকাতি, হাত-পা বেঁধে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুট

ইউনিয়ন পরিষদ, প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ চার প্রতিষ্ঠানের তালা ভেঙে ল্যাপটপ ও টাকা চুরি

বরগুনার বামনা: ইটভাটার বিষাক্ত গ্যাসে মরছে গাছ-পুকুরের মাছ

বরগুনার আমতলীতে মাদ্রাসাছাত্রের রহস্যজনক মৃত্যু, পরিবারের দাবি ‘জিনের আছর’

বরগুনার পাথরঘাটা: সাগরে গিয়ে হতাশ জেলেরা