হোম > সারা দেশ > বাগেরহাট

এক উপজেলাতেই ১০ মাসে ২৫৪ আত্মহত্যা চেষ্টা, মৃত্যু ৩১

ফকিরহাট (বাগেরহাট) প্রতিনিধি

ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ছবি: সংগৃহীত

বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলায় আত্মহত্যা ও আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১০ মাসে বিষপান, গলায় ফাঁসসহ বিভিন্ন উপায়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে অন্তত ২৫৪ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। একই সময়ে আত্মহত্যা করেছেন আরও ৩১ জন। আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তিদের মধ্যে ১২ বছরের কম বয়সী ১৩ শিশুও রয়েছে।

ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, মডেল থানা ও বিভিন্ন ক্লিনিকের তথ্য সমন্বয় করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। তথ্য অনুযায়ী, আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তিদের বয়স ৯ থেকে ৭০ বছর। তাঁদের মধ্যে ৮৭ শতাংশই নারী। আর ৭০ শতাংশের বয়স ১৪ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রাপ্ত হিসাবের চেয়ে বাস্তবে আত্মহত্যার চেষ্টা ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। গুরুতর অবস্থায় অনেক রোগীকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। এসব ঘটনার সব কটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নথিতে থাকে না। আবার সামাজিক লজ্জা ও পারিবারিক সংকোচের কারণে অনেক ঘটনাই গোপন রাখা হয়।

এত বিপুলসংখ্যক আত্মহত্যার চেষ্টা ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও ফকিরহাটে কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর কর্মরত নেই। ফলে আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তিরা শারীরিক চিকিৎসা পেলেও ঘটনার পেছনে থাকা মানসিক সংকটের যথাযথ চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিসংখ্যানবিদ সুকুমার ভট্টাচার্য বলেন, আত্মহত্যার চেষ্টা করা ১২ বছরের কম বয়সী ১৩ শিশুর মধ্যে গলায় ফাঁস দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক, ঘুমের ওষুধ, মাল্টিড্রাগ, হারপিক, স্যাভলন ও কেরোসিন পান করার ঘটনাও রয়েছে।

ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান সাগর বলেন, ‘এখানে ২৩৪টি বিষপানের ঘটনায় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এসব রোগীর মধ্যে নারী বেশি। বিশেষ করে ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ ও অল্প বয়সে বিয়ের কারণে বিষপানের প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। পুরুষদের ক্ষেত্রে পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও বেকারত্ব অন্যতম কারণ।’

তিনি বলেন, ‘বিষপানের ঘটনা কমাতে পারিবারিক সচেতনতা, কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা প্রয়োজন। কিন্তু এ উপজেলায় কোনো মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসক নেই, এমনকি কাউন্সেলিংয়ের জন্য প্রশিক্ষিত লোকও নেই। ফলে শারীরিক চিকিৎসা মিললেও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।’

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানসিক চাপ, হতাশা, মোবাইল ও ডিজিটাল স্ক্রিনে অতিরিক্ত আসক্তি, পারিবারিক কলহ, অপরিণত প্রেমের সম্পর্ক, যৌন নিপীড়ন, বেকারত্ব ও আর্থসামাজিক সংকট আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। দ্রুত নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা প্রতিকূলতাও মানুষের মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, উপজেলার আটটি ইউনিয়নের মধ্যে বাহিরদিয়া-মানসা, নলধা-মৌভোগ, লখপুর ও ফকিরহাট সদর ইউনিয়নে আত্মহত্যার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।

এর একটি উদাহরণ গত ২৭ আগস্টের ঘটনা। বাহিরদিয়া এলাকায় মোবাইল ফোন ব্যবহারকে কেন্দ্র করে পারিবারিক কলহের জেরে নবম শ্রেণির ১৪ বছর বয়সী এক ছাত্রী আত্মহত্যার চেষ্টা করে। স্বজনেরা দ্রুত তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসায় সে সুস্থ হয়ে ওঠে। চিকিৎসকদের মতে, সাময়িক মানসিক চাপ ও হতাশা থেকেই ওই কিশোরী এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রোকনুজ জামান বলেন, ‘কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য, মানসিক চাপ, হতাশা ও বিষণ্নতার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সপ্তম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সভা করছি। এসব কর্মসূচিতে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, মহিলা ও শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা ও চিকিৎসকেরাও থাকছেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদেরও সহানুভূতিশীল হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’