নরসিংদী মাধবদীতে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় কিশোরীকে বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যার মামলায় গ্রেপ্তার প্রধান আসামি নুরুল ইসলাম ওরফে নুরাসহ সাত আসামির আট দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
আজ রোববার (১ মার্চ) নরসিংদীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মেহেদী হাসান এই আদেশ দেন।
নরসিংদী আদালতের কোর্ট পুলিশ পরিদর্শক সফি উদ্দিন এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি আরও জানান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গত শুক্র ও শনিবার দুই দিনে সাত আসামির ১০ দিন করে রিমান্ড আবেদন করেছিলেন। বিজ্ঞ আদালত আজ রোববার শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারণ করেন। আদালতে রিমান্ড আবেদনের শুনানি শেষে বিজ্ঞ আদালত মামলার তদন্তের প্রয়োজনে আসামিদের প্রত্যেককে আট দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করে আদেশ দেন।
আজ আদালতে রিমান্ড শুনানির সময় প্রধান আসামি নুরুল ইসলাম ওরফে নুরাসহ গ্রেপ্তার সাত আসামি আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। আদালতে উপস্থিত আসামিরা হচ্ছে ধর্ষণ ও হত্যার মূল হোতা নুরুল ইসলাম ওরফে নুরা (২৮), এবাদুল্লাহ (৪০), হযরত আলী (৪০), মো. গাফফার (৩৭), আহাম্মদ আলী দেওয়ান (৬৫), ইমরান দেওয়ান (৩২) ও মো. আইয়ুব (৩০), মহিষাশুড়া ইউপির সাবেক সদস্য ও বহিষ্কৃত ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ান।
কোর্ট পুলিশ পরিদর্শক জানান, বাদীপক্ষের জন্য কয়েকজন আইনজীবী স্বপ্রণোদিত হয়ে আদালতে শুনানিতে অংশ নেন। কিন্তু আদালতে রিমান্ড শুনানির সময় আসামিদের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিল না।
নরসিংদী জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া সাংবাদিকদের জানান, আইনজীবী সমিতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বারের কোনো আইনজীবী আসামিপক্ষকে আইনি সহায়তা দেবে না। আইনজীবীরা রাষ্ট্রপক্ষকে সর্বোচ্চ সহায়তা করবেন যাতে দ্রুত চার্জশিট দাখিল ও আসামিদের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত হয়।
এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মাধবদী থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ওমর কাইয়ুম সাংবাদিকদের জানান, মামলার এজাহারের ধর্ষণের সঙ্গে সরাসরি জড়িত চারজন এবং মীমাংসার নামে সালিসকারী সাবেক মেম্বারসহ সাত আসামিকে গ্রেপ্তারের পর ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। শুনানি শেষে বিচারক আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আরও জানান, প্রধান আসামি নুরাকে দিনাজপুর বর্ডার দিয়ে ভারতে পালানোর চেষ্টাকালে গাজীপুরের মাওনা চৌরাস্তা থেকে এবং হযরত আলীকে ময়মনসিংহের গৌরীপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এজাহারভুক্ত ও পলাতক আসামি ইছহাক ওরফে ইছা (৪০) ও আবু তাহেরকে (৫০) গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এ বিষয়ে মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন জানান, গ্রেপ্তার সাত আসামির প্রত্যেকের আট দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। আসামিদের পর্যায়ক্রমে পুলিশ রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আজ থেকে কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যায় অভিযুক্ত চারজনকে প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য পুলিশ হেফাজতে আনা হবে। বাকিদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
পরিবারের দাবি, কিশোরীর সঙ্গে স্থানীয় যুবক নুরুল ইসলাম ওরফে নুরার প্রায় চার মাস ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলে নুরা তাতে অস্বীকৃতি জানান। পরে প্রায় ১৫ দিন আগে নুরার নেতৃত্বে পাঁচ-ছয়জনের একটি দল স্থানীয় কাপড়ের কারখানা থেকে ফেরার পথে কিশোরীকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেন। এ ঘটনা স্থানীয়ভাবে মহিষাশুড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল আহমেদের মধ্যস্থতায় মীমাংসা করা হয় বলে দাবি পরিবারটির।
নিহত কিশোরীর বাবার অভিযোগ, গত বুধবার রাত ১০টার দিকে তিনি মেয়েকে নিয়ে মহিষাশুড়া ইউনিয়নের দড়িকান্দি এলাকা থেকে খালার বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছিলেন। পথে নুরার নেতৃত্বে পাঁচ-ছয়জন যুবক তাঁর মেয়েকে পথে জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিয়ে যান। অনেক খোঁজাখুঁজির পর রাতে মেয়ের সন্ধান না পেয়ে তিনি বাড়ি ফিরে ইউপি সদস্যকে বিষয়টি জানান।
পরদিন সকালে স্থানীয় বাসিন্দারা একই এলাকার একটি সরিষাখেতে মেয়েটির মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
নিহত কিশোরীর মা অভিযোগ করেন, ‘আমার মেয়ের সঙ্গে নুরার সম্পর্ক ছিল। নুরাকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে সে অস্বীকৃতি জানায়। ১৫ দিন আগে নুরা ও তার সহযোগীরা জোর করে আমার মেয়েকে ধর্ষণ করে। এর পর থেকে তারা হুমকি দিচ্ছিল। মেয়েকে খালার বাড়িতে পাঠাতে গেলে রাস্তা থেকে মেয়েকে তুলে নিয়ে যায়। সকালে লাশ পাওয়া গেছে। আমি মেয়ের হত্যার বিচার চাই।’