কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে লেখা গল্প কি সাহিত্য পুরস্কার জিততে পারে? এমন প্রশ্ন এখন জোরালোভাবে উঠেছে ‘কমনওয়েলথ শর্ট স্টোরি প্রাইজ ২০২৬ ’–কে ঘিরে। মর্যাদাপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কারের ক্যারিবীয় অঞ্চলের বিজয়ী গল্প ‘দ্য সার্পেন্ট ইন দ্য গ্রোভ’ নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। অভিযোগ উঠেছে, গল্পটি আংশিক বা পুরোপুরি এআই দিয়ে তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
বুধবার (২০ মে) যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইনডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর লেখক জামির নাজিরের লেখা ওই গল্পটি গত সপ্তাহে কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন আয়োজিত প্রতিযোগিতার আঞ্চলিক বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরে সাহিত্য সাময়িকী ‘গ্র্যান্টা’ গল্পটি অনলাইনে প্রকাশ করে। গল্পটি গ্রামীণ ত্রিনিদাদের প্রেক্ষাপটে লেখা, যেখানে এক কৃষক, এক নীরব তরুণী স্ত্রী এবং রহস্যময় এক বাগানের গল্প উঠে এসেছে।
বিচারকদের ভাষায়, গল্পটির ভাষা ছিল ‘নির্ভুল অথচ গভীরভাবে আবেগময়’ এবং এতে ছিল ‘সংযত অথচ শক্তিশালী কথা’। কিন্তু প্রকাশের পরপরই অনলাইনে পাঠকদের একাংশ দাবি করতে শুরু করেন, লেখাটিতে এআই–নির্ভর লেখার কিছু পরিচিত বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হোয়ারটন স্কুলের অধ্যাপক ইথান মলিক গল্পটিকে ‘এক ধরনের টুরিং টেস্ট’ বলে উল্লেখ করেন। এআই গবেষক নাবিল এস কুরেশিসহ আরও অনেকে লেখাটির বাক্যগঠন, শব্দচয়ন এবং পুনরাবৃত্তিকে ‘এআই টেল’ বা এআই–লেখার চিহ্ন হিসেবে দেখান। বিশেষ করে গল্পটিতে ‘hum’ শব্দটির বারবার ব্যবহার এবং ‘এক্স নয়, ওয়াই নয়, কিন্তু জেড’ ধরনের বাক্যরীতি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয় হয়।
বিতর্ক আরও বাড়ে যখন অনেকে লেখক জামির নাজিরের অনলাইন উপস্থিতি খুঁজতে শুরু করেন। সামাজিক মাধ্যমে কেউ কেউ দাবি করেন, লেখকের সম্পর্কে খুব কম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে এবং তাঁর প্রোফাইল ছবিটিও নাকি এআই দিয়ে তৈরি। যদিও ‘ওয়্যার্ড’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে ২০১৮ সালের একটি সংবাদপত্রের ছবি উদ্ধৃত করে বলা হয়, নাজির একজন বাস্তব ব্যক্তি। এর আগে তিনি কবিতার বইও প্রকাশ করেছেন।
এদিকে বিভিন্ন এআই শনাক্তকরণ সফটওয়্যার গল্পটি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ফল দিয়েছে। এর মধ্যে ‘প্যানগ্রাম’ ও ‘গ্রামারলি’ গল্পটিকে শতভাগ এআই–নির্ভর বলে চিহ্নিত করেছে। অন্যদিকে ‘জিপিটিজিরো’ একে পুরোপুরি মানুষের রচিত বলেছে। ‘কুইলবট’ও জানিয়েছে, গল্পটিতে যন্ত্রনির্ভর লেখার সম্ভাবনা ‘শূন্য শতাংশ’।
‘গ্র্যান্টা’-এর প্রকাশক সিগরিড রাউজিং এক বিবৃতিতে জানান, এই ম্যাগাজিনটি গল্প নির্বাচন প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিল না। তবে তারা এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক-এর ক্লাউড সফটওয়্যার দিয়ে গল্পটি বিশ্লেষণ করিয়েছে। সেই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গল্পটি ‘সম্ভবত পুরোপুরি এআই–নির্ভর নয়, তবে কিছু অংশে এআই ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে।
কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, তাঁরা এখন পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছ ও বিস্তারিত পর্যালোচনা চালাচ্ছে। সংস্থাটির মহাপরিচালক রাজমি ফারুক বলেছেন, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের কাজ মৌলিক বলে ঘোষণা দেন, তাই এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ‘বিশ্বাসের নীতি’ অনুসরণ করেই কাজ করছে।
শুধু জামির নাজির নন, এই বছরের আরও কয়েকজন বিজয়ীর গল্প নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। ফলে সাহিত্য, প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার সীমারেখা কোথায়—তা নিয়ে নতুন করে বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।