হোম > বিশ্লেষণ

ট্রাম্পের ‘শান্তি পরিষদ’ কি জাতিসংঘের বিকল্প হতে যাচ্ছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ফাইল ছবি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বনেতা ও অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তাঁর প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পরিষদে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানাতে শুরু করেছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক সংঘাত মোকাবিলার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের বৃহত্তর লক্ষ্য।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে গাজায় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যামূলক পানি বন্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপের অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রথম এই বোর্ডের কথা প্রকাশ করেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, এই সংস্থাটি গাজায় শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা, আঞ্চলিক সম্পর্ক উন্নয়ন, পুনর্গঠন, বিনিয়োগ আকর্ষণ, বৃহৎ তহবিল সংগ্রহ এবং মূলধন ব্যবস্থাপনা তদারকি করবে।

তবে আর্জেন্টিনার সাবেক ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ও প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনাকে পাঠানো ট্রাম্পের চিঠি—যা শনিবার ওই দুই নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন—ইঙ্গিত দেয় যে, বোর্ডটির লক্ষ্য আরও বিস্তৃত। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিঠির সঙ্গে যুক্ত একটি ‘চার্টারে’ বড় পরিসরের উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে।

মিলেইকে লেখা চিঠিতে ট্রাম্প বলেন, এই বোর্ড মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি সুসংহত করার চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে তিনি যোগ করেন, এটি বৈশ্বিক সংঘাত সমাধানে একটি সাহসী নতুন পথ অনুসরণ করবে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, চিঠির সঙ্গে থাকা চার্টারে বলা হয়েছে, বোর্ড অব পিস একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যার লক্ষ্য সংঘাতপীড়িত বা সংঘাতের ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনা, নির্ভরযোগ্য ও আইনি শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং টেকসই শান্তি নিশ্চিত করা।

চার্টারে আরও বলা হয়েছে, টেকসই শান্তির জন্য প্রয়োজন বাস্তববাদী বিচারবোধ, সাধারণ বুদ্ধিনির্ভর সমাধান এবং এমন পন্থা ও প্রতিষ্ঠান থেকে সরে আসার সাহস, যা বহুবার ব্যর্থ হয়েছে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের মতে, চার্টারে সরাসরি গাজার কোনো উল্লেখ নেই।

রয়টার্সকে দেওয়া তথ্যে দুটি কূটনৈতিক সূত্রও জানিয়েছে, আমন্ত্রণপত্রের সঙ্গে একটি চার্টার ছিল, যেখানে সংস্থাটির বিস্তৃত দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। চিঠির বিষয়ে অবগত এক কূটনীতিক রয়টার্সকে বলেন, এটি এক ধরনের ‘ট্রাম্পের জাতিসংঘ’, যা জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতিগুলো উপেক্ষা করে। অন্যদিকে, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, বোর্ড অব পিসের বিস্তৃত ভূমিকা এখনো ‘আকাঙ্ক্ষামূলক’ পর্যায়ে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টারা মনে করেন—এমন একটি ভূমিকা সম্ভব, বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্রসহ জাতিসংঘের অনেক সদস্য বারবার সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বোর্ড অব পিস জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে না। তবে আপাতত ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যে জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসের প্রাথমিক মনোযোগ থাকবে গাজার ওপর।

শুক্রবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার বোর্ডটির প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী সদস্যদের একজন হবেন। তাঁর সঙ্গে থাকবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। এ ছাড়া প্রাথমিকভাবে আরও যাদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে, তাঁরা হলেন—অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের সিইও মার্ক রোয়ান, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং মার্কিন উপ–জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট গ্যাব্রিয়েল।

এই ব্যক্তিদের অনেকেই আলাদা একটি ‘গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ডের’ সদস্য হিসেবেও মনোনীত হয়েছেন। এই বোর্ডটি ফিলিস্তিনিদের একটি টেকনোক্র্যাট কমিটি—ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা—তদারকি করবে। হামাসের পরিবর্তে গাজার দৈনন্দিন প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানোর কথা রয়েছে এই কমিটির। ১১ সদস্যের গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ডে রয়েছেন ব্লেয়ার, কুশনার ও উইটকফ ছাড়াও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান, কাতারের কূটনীতিক আলি আল সাওয়াদি, জাতিসংঘের মধ্যপ্রাচ্য শান্তি সমন্বয়কারী সিগরিড কাগ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আন্তর্জাতিক সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী রিম আল–হাশিমি এবং ইসরায়েলি-সাইপ্রাস বংশোদ্ভূত ধনকুবের ইয়াকির গ্যাবাই।

আর্জেন্টিনার মিলেই ও প্যারাগুয়ের পেনার বাইরে তুরস্ক ও মিসর নিশ্চিত করেছে, তাদের নেতারা—রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও আবদেল ফাত্তাহ আল–সিসি—বোর্ড অব পিসে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক কর্মকর্তা জানান, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়নকেও ইইউর প্রতিনিধিত্ব করতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। রয়টার্সকে চারটি সূত্র জানিয়েছে, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার নেতাদেরও বোর্ডে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আরও সদস্যের নাম ঘোষণা করা হবে। তবে বোর্ডের প্রাথমিক সদস্যদের ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যের অনেক জায়গায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। কারণ, এতে কোনো ফিলিস্তিনিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, বরং ইসরায়েলের কট্টর সমর্থকদের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শনিবার গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ডের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, বোর্ডটির গঠন ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় না করেই করা হয়েছে এবং এটি তাদের নীতির পরিপন্থী। নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বোর্ডের গঠনের কোন দিকটির বিরোধিতা করা হয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি।

নিয়োগ নিয়ে সমালোচনার মধ্যেই জানা গেছে, হোয়াইট হাউস ভবিষ্যতে ‘বোর্ড অব পিস’–এর আওতায় ইউক্রেন যুদ্ধ ও ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো অন্যান্য বৈশ্বিক ইস্যুতেও কাজ করতে চায়। ইসরায়েলি দৈনিক পত্রিকা হারেৎজ যে নথিটি পেয়েছে, তাতে বলা হয়েছে—একটি আরও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক শান্তি–নির্মাণ সংস্থার প্রয়োজন রয়েছে। নথিতে দাবি করা হয়েছে, টেকসই শান্তির জন্য এমন প্রতিষ্ঠান দরকার, যা অতীতে ব্যর্থ হয়েছে—এমন কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার সাহস রাখবে।

নথিতে আরও বলা হয়, অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার পরিবর্তে বোর্ড অব পিস সংঘাত–আক্রান্ত অঞ্চলে আইনসম্মত ও স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করবে। সনদে উল্লেখ করা হয়, টেকসই শান্তির জন্য বাস্তবভিত্তিক বিচারবুদ্ধি, সাধারণ বোধ এবং ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান ও পদ্ধতি থেকে সরে আসার সাহস প্রয়োজন। পত্রিকাটিকে মার্কিন জ্যেষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, কর্মকর্তারা এই বোর্ডকে এক ধরনের নতুন জাতিসংঘ হিসেবে দেখছেন। এতে নির্বাচিত কয়েকটি দেশ থাকবে, যারা বিশ্বজুড়ে প্রভাব ফেলা সিদ্ধান্ত নেবে।

ইউরোপের কয়েকটি দেশকে এই বোর্ডে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে খসড়া সনদ নিয়ে একাধিক দেশ সমালোচনা করেছে। কারণ এতে ট্রাম্পের হাতেই বিনিয়োগ করা পানির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে বলে উল্লেখ রয়েছে। খসড়া সনদ অনুযায়ী, ‘বোর্ড অব পিস’ বছরে একবার ভোটাভুটি–ভিত্তিক বৈঠক করবে। বৈঠকের এজেন্ডা অনুমোদন করবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি যেকোনো অতিরিক্ত সময় ও স্থানে বৈঠক ডাকতে পারবেন। এক্সিকিউটিভ বোর্ডের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক হবে প্রতি তিন মাসে একবার। এসব বৈঠকে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ভোটের প্রয়োজন হবে না।

সমালোচকদের মতে, বিদেশি একটি ভূখণ্ডের শাসনব্যবস্থা তদারকির যে পরিকল্পনা ট্রাম্প করছেন, তা অনেকটা ঔপনিবেশিক কাঠামোর মতো। এ ছাড়া স্যার টনি ব্লেয়ারের যুক্ত হওয়া নিয়ে ও সমালোচনা রয়েছে। গত বছরই তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনা ওঠে ইরাক যুদ্ধে ভূমিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসের কারণে।

মুসলিম বিশ্বের ন্যাটো: আরব দুনিয়ায় সামরিক প্রভাব কতটা বাড়াতে পারবে পাকিস্তান

ইরানে খামেনির পতন যে কারণে ভারতের জন্য ক্ষতিকর

কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন অনিবার্য, কিন্তু ইরান কেন আলাদা

বাহ্যিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার পরও ইরানের বর্তমান রেজিম যেভাবে টিকে আছে

ট্রাম্পের বেপরোয়া ক্ষমতায় ওলট-পালট বিশ্ব, বন্ধু থেকে শত্রু আতঙ্কিত সবাই

যেভাবে এবং যেসব কারণে আন্দোলনকে পুঁজি করে ইরানকে ভাঙতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল

ইরানের বিক্ষোভে কোন পক্ষে তুরস্ক, কী চায় তারা

যুক্তরাষ্ট্রকে ভয় পাওয়ার ক্লাস নিচ্ছেন ট্রাম্প

ইরানে ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট ও চোরাচালান রুট— দুটোই বিপ্লবী গার্ডের নিয়ন্ত্রণে

প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে দুর্বল পাকিস্তান কীভাবে আধুনিক যুদ্ধবিমান বানাল