গত সপ্তাহে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চার দিনের সফরে চীন যান। সফরের শুরুতে তিনি মালয়েশিয়ায় সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি করেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল তাঁর প্রথম বিদেশ সফর।
প্রথম দেখায় তারেক রহমানের এই সফরকে খুব বড় কোনো ঘটনা বলে মনে না-ও হতে পারে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অংশীদার ও উন্নয়ন সহযোগী। এক দশকের বেশি সময় ধরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর হয়েছে। তবে সফরটি কেবল আরেকটি উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সফর নয়। এর এমন কিছু সম্ভাব্য তাৎপর্য রয়েছে, যা চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে।
এর আগে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেইজিং সফর করেন। গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঠিক আগে সেই সফরের পর থেকেই ঢাকা ও বেইজিং তাদের সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ হিসেবে অভিহিত করে আসছে। তবে তারেক রহমানের এবারের সফরের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও উন্নীত করে ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি’ গড়ে তোলা হবে।
সফরে ঘোষিত একগুচ্ছ চুক্তি ও সমঝোতা থেকে বোঝা যায়, এই অংশীদারত্ব এখন আরও বিস্তৃত সহযোগিতার দিকে এগোচ্ছে। দুই দেশ যোগাযোগ অবকাঠামো, বন্দর আধুনিকীকরণ এবং পানি ব্যবস্থাপনা খাতে যৌথভাবে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের দুর্বল বেসরকারি খাতকে চাঙা করতে চীনা কারখানা বাংলাদেশে স্থানান্তরের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
দুই দেশ প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ‘২ + ২ সংলাপ’ চালুর ঘোষণা দিয়েছে। সাধারণত অত্যন্ত গভীর কৌশলগত সম্পর্ক থাকা দেশগুলোর ক্ষেত্রেই এ ধরনের কাঠামো গড়ে তোলা হয়। এমনকি একটি সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মান্দারিন ভাষা শিক্ষার বিষয়েও অঙ্গীকার করা হয়েছে, যা চীনের সফট পাওয়ার বা নরম প্রভাব বিস্তারের কৌশলের ইঙ্গিত বহন করে। পাশাপাশি বেইজিং বাংলাদেশকে ব্রিকস এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় (এসসিও) যোগদানের প্রচেষ্টায় সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এসব পদক্ষেপ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, অনেকের প্রত্যাশা ছিল তারেক রহমানের সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবে। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। তবে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কয়েকজন নেতা সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। সম্পর্ক উন্নত হলে বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং সীমান্ত নিরাপত্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে দুই দেশের সহযোগিতা সহজ হবে।
তবে তারেক রহমান যে মেয়াদের শুরুতেই চীনকে এত গুরুত্ব দিয়ে এই সফর করেছেন, তারও বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে। একসময় দক্ষিণ এশিয়ার সফল অর্থনৈতিক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন গতি হারিয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে চীনা বিনিয়োগ ও মূলধন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আরও বিস্তৃত অর্থে বলতে গেলে বাংলাদেশের গভীর ও বহুমাত্রিক কৌশলগত অংশীদার খুব বেশি নেই। সেই দিক থেকে বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে চীন একটি ব্যতিক্রমী ও কার্যকর অংশীদার।
এ ছাড়া বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে চীনপ্রীতি উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী, আর ভারতবিরোধী মনোভাবও প্রবল। এই বাস্তবতায় তারেক রহমানের চীন সফর নতুন সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে ইতিবাচক বার্তা বহন করে। বিপরীতে এই সময়ে ভারত সফর করলে, তা সরকারের জন্য উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারত।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে তারেক রহমানের এই সফর একটি কৌশলগত হতাশা। কারণ, নয়াদিল্লি সম্ভবত নীরবে বিএনপির নির্বাচনী বিজয়কে স্বাগত জানিয়েছিল। ভারতের কাছে বিএনপি তাদের সাবেক মিত্র, পরে প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হওয়া ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর তুলনায় অধিক গ্রহণযোগ্য অংশীদার। ভারত তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের আগ্রহও দেখিয়েছে। কিন্তু চীন সফরটি আবারও মনে করিয়ে দিল, সেই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।
তবে এই সফর ঢাকার জন্য কিছু ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। নতুন সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা ঘোষণা করেছে। মূলত এটি এক ধরনের জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি, যার উদ্দেশ্য বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং কোনো একটি দেশের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়া। কিন্তু যদি এমন ধারণা তৈরি হয় যে ঢাকা বেইজিংয়ের খুব কাছাকাছি চলে যাচ্ছে, তাহলে সেই নীতির বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের নেতারা জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির কথা বলে এসেছেন, যদিও শেখ হাসিনার শাসনামলে ঢাকা প্রকাশ্যভাবেই নয়াদিল্লিমুখী অবস্থান নিয়েছিল। এখন বাংলাদেশের সামনে আবারও সেই নীতি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠার একটি সুযোগ রয়েছে, যদি দেশটি তার সব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে।