পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর ফল ঘোষণার পর একটি বিশেষ গাণিতিক সমীকরণ রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) বা বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় প্রায় ২৭ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়া কি রাজ্যের নির্বাচনী মানচিত্র বদলে দিয়েছে? সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণে সেই ইঙ্গিতই মিলছে।
যে ২০টি আসনে সর্বাধিক সংখ্যক নাম বাদ পড়েছে, তার মধ্যে তৃণমূল ১৩টিতে, বিজেপি ৬টিতে এবং কংগ্রেস একটিতে জিতেছে। আর যে ১৮৭টি আসন থেকে ৫ হাজারের বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে বিজেপি ১১৯টিতে জিতেছে।
গত বছর জুন মাসে কমিশন দেশজুড়ে এসআইআর শুরু করে। সাধারণ ভোটার তালিকা সংশোধনে মূলত মৃত বা স্থানান্তরিত ভোটারদের বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রতিটি ভোটারকে নতুন করে এনুমেরেশন ফর্ম পূরণ করতে হয়েছে এবং নাগরিকত্বের সপক্ষে নথি জমা দিতে হয়েছে। বাংলায় এই প্রক্রিয়াটি নজিরবিহীন মোড় নেয় যখন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বিচার বিভাগীয় অফিসার বা বিচারপতিদের এই কাজে নিয়োগ করা হয়।
রাজ্যে মোট ৬০ দশমিক ০৬ লাখ (মোট ভোটারের ৮.৫%) নাম আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। প্রায় ৭০০ বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তার পর্যবেক্ষণে ২৭ দশমিক ১৬ লাখ ভোটারের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত ১০টি ট্রাইব্যুনালে লাখ লাখ আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
২৯৩টি আসনের মধ্যে ১৮৭টি আসনে যেগুলোর প্রত্যেকটিতে ৫ হাজারের বেশি ভোটারের নাম কাটা গেছে, এই আসনগুলোর প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করলে নিচের চিত্র উঠে আসে:
বিজেপির জয় ও লিড: এই ১৮৭টি আসনের মধ্যে বিজেপি ১১৯টিতে জয়ী হয়েছে। এই ১১৯টি আসনের মধ্যে ২৮টি আসনে বিজেপির জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বেশি। উল্লেখ্য, এই ২৮টি আসনের মধ্যে ২৬টি আসনই ২০২১ সালে জিতেছিল তৃণমূল কংগ্রেস।
তৃণমূলের জয়: তৃণমূল কংগ্রেস ওই ১৮৭টি আসনের মধ্যে ৬৫ টিতে জয়ী হয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি আসনে তাদের জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বেশি।
অন্যান্য: বাকি আসনগুলোর মধ্যে ২টি কংগ্রেস এবং ১টি আম জনতা উন্নয়ন পার্টি জিতেছে।
নিচে সেই ২০টি আসনের তালিকা দেওয়া হলো যেখানে ভোটার ছাঁটাই সবচেয়ে বেশি হয়েছে (বন্ধনীতে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ও বিজয়ীর নাম) :
শামশেরগঞ্জ: ৭৪,৭৭৫ (জয়ী: তৃণমূল)
লালগোলা: ৫৫,৪২০ (জয়ী: তৃণমূল)
ভগবানগোলা: ৪৭,৪৯৩ (জয়ী: তৃণমূল)
রঘুনাথগঞ্জ: ৪৬,১০০ (জয়ী: তৃণমূল)
মেটিয়াবুরুজ: ৩৯,৫৭৯ (জয়ী: তৃণমূল)
ফারাক্কা: ৩৮,২২২ (জয়ী: কংগ্রেস)
সুতি: ৩৭,৯৬৫ (জয়ী: তৃণমূল)
মোথাবাড়ি: ৩৭,২৫৫ (জয়ী: তৃণমূল)
জঙ্গিপুর: ৩৬,৫৮১ (জয়ী: বিজেপি)
রতুয়া: ৩৫,৫৭৩ (জয়ী: বিজেপি)
করণদীঘি: ৩১,৫৬২ (জয়ী: বিজেপি)
গোয়ালপোখর: ৩১,৩৮৪ (জয়ী: তৃণমূল)
মালতিপুর: ২৯,৪৮৯ (জয়ী: তৃণমূল)
চোপড়া: ২৭,৮৯৮ (জয়ী: তৃণমূল)
সুজাপুর: ২৬,৮২৯ (জয়ী: তৃণমূল)
কেতুগ্রাম: ২৬,৭৮০ (জয়ী: বিজেপি)
রাজারহাট নিউ টাউন: ২৪,১৩২ (জয়ী: তৃণমূল)
বসিরহাট উত্তর: ২৩,৯০০ (জয়ী: তৃণমূল)
মানিকচক: ২৩,৭২৬ (জয়ী: বিজেপি)
মন্টেশ্বর: ২৩,৪২৩ (জয়ী: বিজেপি)
রাজ্যের মোট ৪৭টি আসনে একটি অভূতপূর্ব গাণিতিক অমিল দেখা গেছে। এই আসনগুলোতে জয়ী প্রার্থীর প্রাপ্ত লিড বা মার্জিনের চেয়ে ওই কেন্দ্র থেকে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা অনেক বেশি। অর্থাৎ, তাত্ত্বিকভাবে এই বাদ পড়া ভোটাররা যদি ভোট দেওয়ার সুযোগ পেতেন এবং তাদের ভোট অন্য প্রার্থীর পক্ষে যেত, তবে ফলাফল পুরোপুরি বদলে যেতে পারত।
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়াটি সাধারণ সংশোধন থেকে আলাদা ছিল। এখানে নাগরিকদের ফর্ম পূরণ করে সশরীরে প্রমাণ দাখিল করতে হয়েছিল। যারা এটি করতে পারেননি বা যাদের নথি অসম্পূর্ণ ছিল, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা তাঁদের নাম বাদ দিয়েছেন। বর্তমানে ফল প্রকাশের পর ২৯৩টি আসনের মধ্যে এই ২৭ দশমিক ১৬ লাখ ভোটারের অভাব প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ভোট শতাংশে বড়সড় প্রভাব ফেলেছে।
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ভারতের নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত নির্বাচনী তথ্য