ভারতের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল রাজ্য হওয়া সত্ত্বেও ২০২৬ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে ক্ষমতাসীন ডিএমকে। রাজ্যের দুই অঙ্কের বিশিষ্ট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি-র উল্লম্ফনও এমকে স্ট্যালিনের সরকারকে রক্ষা করতে পারেনি। এই হারের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, পরিসংখ্যানের প্রবৃদ্ধি সবসময় সাধারণ মানুষের পকেট বা ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হয় না।
নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন অত্যন্ত সংযতভাবে পরাজয় স্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর দল জনগণের রায় মাথা পেতে নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে একটি ‘আদর্শ বিরোধী দল’ হিসেবে তাদের রাজনৈতিক যাত্রা অব্যাহত রাখবে।
সবচেয়ে বড় চমক ছিল খোদ স্ট্যালিনের নিজের কেন্দ্র কোলাথুর-এ। দীর্ঘদিনের এই ডিএমকে দুর্গে স্ট্যালিনকে ৮ হাজার ৭৯৫ ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছেন অভিনেতা বিজয়-এর নতুন দল টিভিকের প্রার্থী ভিএস বাবু।
এই নির্বাচনের মূল আকর্ষণ ছিলেন তামিল মহাতারকা থালাপতি বিজয়। তাঁর মাত্র দুই বছরের পুরোনো দল তামিলনাগা ভেতরি কাজাগাম (টিভিকে) একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ২৩৪টি আসনের মধ্যে ১০৮ টিতে জয়ী হয়েছে টিভিকে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন ডিএমকে নেমে এসেছে মাত্র ৫৯টি আসনে এবং এআইএডিএমকে পেয়েছে ৪৭টি আসন। বিজয়ের এই উত্থান তামিলনাড়ুর দীর্ঘদিনের দ্বিমুখী দ্রাবিড় রাজনীতিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
অর্থনৈতিকভাবে তামিলনাড়ু গত এক দশকে অন্যতম সেরা সময় পার করছিল। পরিসংখ্যান বলছে: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজ্যের জিএসডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ১৯ শতাংশ, যা জাতীয় গড় ৬ দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি। উৎপাদন খাতে ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং পরিষেবা খাতে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেড় লাখ কোটি রুপিরও বেশি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এখানেই লুকিয়ে আছে আসল রহস্য। তাঁদের দাবি, জিডিপি বা জিএসডিপির প্রবৃদ্ধি একটি পরিসংখ্যান মাত্র, কিন্তু ভোটাররা ভোট দেয় তাদের জীবনের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে। যখন রাজ্যের অর্থনীতি ৮ শতাংশ হারে বেড়েছে, তখন অসংগঠিত খাতের শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি বেড়েছে মাত্র ২-৩ শতাংশ। বিপরীতে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ৬-৭ শতাংশ। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। অর্থাৎ, সরকারের ড্যাশবোর্ডে প্রবৃদ্ধি থাকলেও মানুষের মানিব্যাগে টান ছিল।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, তামিলনাড়ুর দীর্ঘদিনের জনকল্যাণমূলক মডেল এবার আর কাজ করেনি। যখন কোনো সুযোগ-সুবিধা বা ভাতা নিয়মিত হয়ে যায়, তখন ভোটাররা সেটিকে অধিকার হিসেবে ধরে নেয় এবং সেটির জন্য আলাদা করে ভোট দিতে চায় না। এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং পারিবারিক রাজনীতির প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান বিরক্তি এই পতনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
বিজয় তাঁর প্রচারণায় তরুণ প্রজন্ম এবং প্রথমবারের ভোটারদের লক্ষ্য করেছিলেন। তিনি এই লড়াইকে ‘পরিবর্তন বনাম স্থবিরতা’ হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিএমকে-র কাছে হয়তো উন্নয়নের পরিসংখ্যান ছিল, কিন্তু বিজয়ের কাছে ছিল পরিবর্তনের এক শক্তিশালী গল্প (ন্যারেটিভ)। সেই গল্পের কাছেই শেষ পর্যন্ত হেরে গেল স্ট্যালিন সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের মজবুত প্রশাসনিক ভিত্তি।
এই ফলাফল ভারতের রাজনীতিতে একটি বড় বার্তা দিচ্ছে—কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব নয়। প্রবৃদ্ধির সুফল যতক্ষণ না সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের হাতে পৌঁছাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ব্যালট বক্সের অনিশ্চয়তা কাটবে না।
তথ্যসূত্র: বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড