গত বছরের নভেম্বর মাসে দক্ষিণ পাঞ্জাবের বাহাওয়ালপুর শহরে জুবাইদা বিবির বাড়িতে অভিযান চালায় পাঞ্জাব পুলিশের ক্রাইম কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্ট (সিসিডি)। জুবাইদা বিবির অভিযোগ, অভিযানের সময় সিসিডি তাঁদের মোবাইল ফোন, নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার, মেয়ের বিয়ের যৌতুকের টাকাসহ সবকিছু নিয়ে যায়। সঙ্গে তুলে নিয়ে যায় তাঁর তিন ছেলে ও দুই জামাতাকে।
এর ২৪ ঘণ্টা পর জুবাইদা বিবিকে জানানো হয়, তাঁর পরিবারের পাঁচ সদস্য পৃথক পৃথক ‘পুলিশ এনকাউন্টারে’ নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন জুবাইদার তিন ছেলে—ইমরান (২৫), ইরফান (২৩) ও আদনান (১৮) এবং দুই জামাতা।
গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র আট মাসে এভাবেই পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ৯২৪ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তান (এইচআরসিপি)।
এইচআরসিপির ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনকে জুবাইদা বিবি বলেন, ‘বাহাওয়ালপুরে আমাদের বাড়িতে ঢুকে তারা সব নিয়ে যায়। আমরা লাহোর পর্যন্ত গিয়ে ছেলেদের ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করি। পরদিন সকালে পাঁচজনকেই মৃত পাই।’
পরে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ হুমকি দেয় বলেও অভিযোগ করেন জুবাইদা। তাঁর স্বামী আবদুল জব্বার দাবি করেন, তাঁদের ছেলেদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড ছিল না।
এইচআরসিপির দাবি, গুরুতর অপরাধ দমনের নামে গঠিত ‘ক্রাইম কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্ট’ (সিসিডি) কার্যত একটি সমান্তরাল বাহিনী হিসেবে এসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত এইচআরসিপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঞ্জাবের ক্রাইম কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্ট ‘আইন ও সংবিধান লঙ্ঘন করে বিচারবহির্ভূত হত্যার একটি প্রাতিষ্ঠানিক নীতি’ অনুসরণ করছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ইউনিটটি গঠনের পর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৬৭০টি এনকাউন্টারে ৯২৪ জন সন্দেহভাজন নিহত হন।
আনুষ্ঠানিকভাবে গত বছরের এপ্রিল মাসে সিসিডি গঠিত হয়, যার দায়িত্ব ছিল গুরুতর ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন। তবে এইচআরসিপি একে কার্যত ‘সমান্তরাল পুলিশ বাহিনী’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যারা প্রায় দায়মুক্তির মধ্যেই কাজ করছে।
পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ শরিফের আমলে ‘সেফ পাঞ্জাব’ ভিশন বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে সিসিডি গঠন করা হয়েছিল। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের কন্যা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের ভাতিজি।
সিসিডি গঠনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পাঞ্জাবজুড়ে এনকাউন্টারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আট মাসে ৯০০-এর বেশি সন্দেহভাজন নিহত হন। একই সময়ে দুই পুলিশ সদস্য নিহত ও ৩৬ জন আহত হন।
তুলনামূলকভাবে, এইচআরসিপির ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, পুরো বছরে পাঞ্জাব ও সিন্ধ মিলিয়ে ৩৪১ জন সন্দেহভাজন এনকাউন্টারে নিহত হন। সেখানে এককভাবে পাঞ্জাবে আট মাসেই সেই সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি ছাড়িয়ে যায়।
সবচেয়ে বেশি হত্যার ঘটনা ঘটে—লাহোরে (১৩৯টি এনকাউন্টার), এরপর ফয়সালাবাদ (৫৫) ও শেখুপুরায় (৪৭)। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ডাকাতির অভিযোগে ৩৬৬ জন, মাদকসংক্রান্ত অভিযোগে ১১৪ জন, ছিনতাইয়ে ১৩৮ জন এবং খুনের মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন ৯৯ জন।
এইচআরসিপির দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুলিশের বর্ণনা একই রকম। সন্দেহভাজনেরা মোটরসাইকেলে ‘সন্দেহজনকভাবে’ চলাফেরা করছিলেন, রাতের বেলা বা চেকপোস্টে পুলিশ তাঁদের থামায়, তাঁরা আগে গুলি চালান, আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়।
অনেক এফআইআরে প্রায় হুবহু একই ভাষা ব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরে কমিশন বলেছে, এগুলো ‘কপি-পেস্ট কাঠামো’র ইঙ্গিত দেয়। এমনকি কোথাও কোথাও দাবি করা হয়েছে, গুলিবিদ্ধ সন্দেহভাজন মৃত্যুর আগে নিজের পূর্ণ নাম-পরিচয় ও অপরাধের কথা বলে গেছেন।
লাহোরভিত্তিক মানবাধিকার আইনজীবী আসাদ জামাল বলেন, অপরাধ দমনের সাফল্য দেখাতে গিয়ে সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকে নীরবে প্রশ্রয় দিচ্ছে। অপরাধ কমানোর নামে তদন্তে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও বিচারপ্রক্রিয়া উন্নত করার বদলে এই ‘শর্টকাট’ নেওয়া হচ্ছে।
এইচআরসিপির তথ্যমতে, আদালতে দাখিল করা নথিতে সিসিডি দাবি করেছে, তাদের অভিযানে সাত মাসে সম্পত্তিসংক্রান্ত অপরাধ ৬০ শতাংশের বেশি কমেছে এবং ডাকাতিসংক্রান্ত হত্যাও একই হারে কমেছে। বিভাগটি বলছে, তারা গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক পুলিশিং মডেল অনুসরণ করছে এবং কুখ্যাত সংঘবদ্ধ চক্র ভেঙে দিয়েছে।
তবে এইচআরসিপির বক্তব্য, অপরাধ কমলেও পদ্ধতিটি গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বেগের। যথাযথ আইনি তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধ দমন হবে নাকি সংক্ষিপ্ত প্রক্রিয়ায় ‘মৃত্যুদণ্ড’ কার্যকর করা হবে—এটি রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করে।
কমিশনের অভিযোগ, নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে দ্রুত দাফন করতেও বলা হয়েছে, যাতে স্বাধীনভাবে ময়নাতদন্ত সম্ভব না হয়। পুলিশ ও প্রাদেশিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুরোধও নাকি উপেক্ষিত হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে আল-জাজিরা পাঞ্জাব পুলিশ, সিসিডির কর্মকর্তা, তথ্যমন্ত্রী আজমা বোখারি ও সিনিয়র মন্ত্রী মরিয়ম আওরঙ্গজেবের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, কিন্তু তারা কথা বলতে রাজি হয়নি।
২০১০ সালে অবসরে যাওয়া পাঞ্জাব পুলিশের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আল-জাজিরাকে বলেন, বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতির কারণে পুলিশ এ পদ্ধতি বেছে নেয়। বিষয়গুলো যখন জনগণ ও পুলিশের মধ্যে হতাশা তৈরি করে, তখন তারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে শুরু করে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সরকার যথাযথ আইনিপ্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে হলেও তাদের নিরাপত্তা বাহিনীকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে দেখাতে চায়। এই পদ্ধতি পুলিশকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে প্রশ্রয় দেয়, কারণ তারা জানে যে, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো জবাবদিহি নেই।
এইচআরসিপির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে প্রায় ৫ হাজার এনকাউন্টার হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২ হাজারই পাঞ্জাবে। ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বছরে ৪০০-এর নিচে থাকলেও ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮-এ।
লাহোরভিত্তিক মানবাধিকার আইনজীবী আসাদ জামাল আল-জাজিরাকে বলেন, রাজনৈতিক উচ্চপর্যায় থেকে অপরাধ দমনের যে চাপ রয়েছে, তারই প্রতিফলন এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।
আইনজীবী রিদা হোসেন বলেন, এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঔপনিবেশিক শাসন ও সামরিক একনায়কতন্ত্রের উত্তরাধিকার, যেখানে নাগরিককে অধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তি নয়, শাসনের অধীন প্রজা হিসেবে দেখা হতো। সরকার দাবি করতে পারে, নিহত ব্যক্তিরা অপরাধী, কিন্তু অপরাধ প্রমাণের একমাত্র পথ হলো ন্যায়বিচার ও আইনিপ্রক্রিয়া। বিচারবহির্ভূত হত্যাকে স্বাভাবিক করে তুললে আগামীকাল ভিন্নমতাবলম্বী বা নির্দোষ মানুষও লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন।
আল-জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা