মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন বারুদের গন্ধ আর অনিশ্চয়তার কালো মেঘ। আজ শনিবার সকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি বাহিনী যৌথভাবে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করেছে। এটি ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দেওয়ার এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ চেষ্টা। আটলান্টিক কাউন্সিলের শীর্ষস্থানীয় বিশ্লেষক ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, এটি শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং তেহরানের ৪৭ বছরের শাসনব্যবস্থা উপড়ে ফেলার এক বিশাল ‘জুয়া’।
নিচে আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষকদের মতামতের ভিত্তিতে এই যুদ্ধের বহুমুখী পরিণতি ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হলো:
আটলান্টিক কাউন্সিলের ইরান স্ট্র্যাটেজি প্রজেক্টের পরিচালক নেট সোয়ানসন বিষয়টি বর্ণনা করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জীবনের বৃহত্তম ‘পলিটিক্যাল গ্যাম্বল’ বা রাজনৈতিক জুয়া হিসেবে। অতীতে ট্রাম্পের প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপের একটি ‘অফ-র্যাম্প’ বা আলোচনার মাধ্যমে বেরিয়ে আসার পথ থাকত। কিন্তু এবার তিনি সরাসরি ইরানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মূল স্তম্ভগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছেন।
ট্রাম্পের এই অভিযানের মূল ভিত্তি হলো ইরানের অভ্যন্তরীণ জন-অসন্তোষ। তিনি মনে করছেন, আকাশপথের প্রচণ্ড হামলায় যদি আইআরজিসির চেইন অব কমান্ড ভেঙে দেওয়া যায়, তাহলে সাধারণ ইরানিরা রাজপথে নেমে আসবে এবং সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোনো শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বিরোধী দল বা বিদেশি স্থলবাহিনী ছাড়া শুধু দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন দিয়ে কি একটি সুসংগঠিত শাসনব্যবস্থা উপড়ে ফেলা সম্ভব?
সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন পানিকফ এক গভীরতর সংকটের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন, বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন মানেই যে ইরানে পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র আসবে, তা নিশ্চিত নয়; বরং ক্ষমতার শূন্যতায় জন্ম নিতে পারে ‘আইআরজিসিস্তান’। এটি এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে রেভল্যুশনারি গার্ডস সরাসরি সামরিক শাসন জারি করবে।
এর ফলে আইআরজিসি টিকে থাকতে আরও উগ্র রূপ ধারণ করতে পারে, যা আঞ্চলিক সংঘাতকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে। অথবা তারা নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে আমেরিকার সঙ্গে গোপন চুক্তিতে গিয়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চেষ্টা করতে পারে। অথবা লিবিয়া বা সিরিয়ার মতো ক্ষমতার বহুবিধ কেন্দ্র তৈরি হলে ইরান এক দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের কবলে পড়তে পারে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাথু ক্রোনিগ মনে করেন, এই যুদ্ধ অনিবার্য ছিল। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করেছিলেন, যেন তারা বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন না চালায়। কিন্তু তেহরান সেই ‘রেডলাইন’ বা চরম সীমা অতিক্রম করে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের মতে, ওবামা আমলের সিরিয়া সংকটের মতো এবারও যদি আমেরিকা পিছু হটত, তবে বিশ্বে মার্কিন সামরিক শক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা চিরতরে ধুলোয় মিশে যেত।
মিডল ইস্ট সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভের সাবেক সহকারী স্টেট সেক্রেটারি জেনিফার গ্যাভিটো এবং প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স প্লিটাস মনে করেন, ইরান এবার ‘ডি-এস্কেলেশন’ বা উত্তেজনা কমানোর কোনো সুযোগই পাবে না। কারণ, এটি তাদের জন্য এক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
ইরানের হাতে ২,০০০ থেকে ৩,০০০ মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাজার হাজার কামিকাজে ড্রোন রয়েছে। আইআরজিসি ইতিমধ্যে কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা শুরু করেছে। প্লিটাস পর্যবেক্ষণ করেছেন, ইরান এখনো তাদের পূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি ব্যবহার করেনি। সম্ভবত তারা মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা পরীক্ষা করছে অথবা চূড়ান্ত আঘাতের জন্য কিছু মজুত রাখছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় পরিণতি ভোগ করতে হবে সাধারণ মানুষকে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়। প্রধান তেল কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যে সেখানে জাহাজ চলাচল স্থগিত করেছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের মতে, ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে, যা উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতিকেও মন্দার মুখে ঠেলে দেবে। স্বর্ণের দাম ইতিমধ্যে ২০২৬ সালে ২২ শতাংশ বেড়েছে, ফলে বিনিয়োগকারীরা চরম আতঙ্কে আছেন।
সাবেক ডেপুটি সেক্রেটারি থমাস এস ওয়ারিক মনে করেন, এই যুদ্ধের একটি ফ্রন্ট হবে আমেরিকার ভেতরে। ইরান তার ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ কৌশলের অংশ হিসেবে আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে সাইবার হামলা এবং কর্মকর্তাদের ওপর গুপ্তহত্যার চেষ্টা চালাতে পারে। এ ছাড়া আমেরিকানরা একটি দূরবর্তী যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক সেনার মৃত্যু মেনে নেবে কি না, তা নিয়ে ট্রাম্পের ওপর প্রবল চাপ তৈরি হবে।
সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত রব ম্যাকায়ার ইউরোপের অস্বস্তির কথা জানিয়েছেন। জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য এই হামলায় সরাসরি অংশ না নিলেও তারা ‘ইরানি জনগণের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের’ কথা বলে পরোক্ষভাবে ট্রাম্পকে সমর্থন দিচ্ছে। তবে স্পেনের মতো দেশগুলো এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ইউরোপের ভয় হলো, ইরান যদি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তবে ইউরোপের দিকে নতুন করে অভিবাসীদের স্রোত শুরু হতে পারে।
ইসরায়েলি বিশ্লেষক মাইকেল রোজেনব্ল্যাট অত্যন্ত সরাসরিভাবে বলেছেন, ইসলামি বিপ্লবের পরীক্ষা এখন শেষ। তাঁর মতে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তাঁর সামরিক সহযোগীদের সফলভাবে সরিয়ে দিতে পারলে ইরানের জন্য এক নতুন ভোরের সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে এর জন্য ইরানের অভ্যন্তরীণ এবং নির্বাসিত বিরোধী দলগুলোকে (যেমন রেজা পাহলভি বা অন্যান্য গোষ্ঠী) এখনই একটি সুনির্দিষ্ট বিকল্প নেতৃত্ব নিয়ে সামনে আসতে হবে।
বিশ্লেষকদের এই দীর্ঘ ও বহুমুখী আলোচনা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ কোনো ছোটখাটো সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ। যদি ট্রাম্পের পরিকল্পনা সফল হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কয়েক দশকের অস্থিরতার মূল উৎপাটন সম্ভব হবে। কিন্তু যদি ইরান তার প্রক্সি বাহিনী (হিজবুল্লাহ, হুতি, শিয়া, মিলিশিয়া) নিয়ে পূর্ণ মাত্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে, তবে এটি একুশ শতকের বৃহত্তম মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে।
আটলান্টিক কাউন্সিল থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ