হোম > বিশ্লেষণ

দুধের মাছি রাশিয়াকে নিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত ইরান, কী হবে এখন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

২০২৫ সালের ১৭ জানুয়ারি মস্কোর ক্রেমলিনে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন-ইরান উত্তেজনার চক্র একটি পরিচিত পথ অনুসরণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাগাড়ম্বর, পারস্য উপসাগরে ইরানের সামরিক সংকেত, ওমানের মাধ্যমে পরোক্ষ কূটনীতি এবং ইসরায়েলের সতর্কবার্তা। তবে এই নাটুকেপনার আড়ালে তেহরানের ভেতরে আরও তাৎপর্যপূর্ণ একটি পরিবর্তন ঘটছে। বর্তমান সংকট ইরানের রাজনৈতিক মহলকে গত দশকের প্রধান পররাষ্ট্রনীতিকে পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করছে। সেই নীতি ছিল রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখা, যা পশ্চিমা চাপ ও নিগ্রহের বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত সুরক্ষা প্রদান করবে।

বছরের পর বছর ধরে ইরানের ‘পূর্বমুখী নীতি’ (Look East Doctrine) অভ্যন্তরীণভাবে নিষেধাজ্ঞা, বিচ্ছিন্নতা এবং সামরিক চাপের একটি কাঠামোগত সমাধান হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) এবং ব্রিকসে অন্তর্ভুক্তি, রাশিয়া-চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ও কৌশলগত চুক্তি—এসবই ছিল সেই নীতির অংশ। প্রতিরক্ষা-শিল্প সহযোগিতাকে কেবল অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ হিসেবে নয়, বরং ভূরাজনৈতিক বিমা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। এই বয়ান অনুযায়ী, উদীয়মান বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে হ্রাস করবে এবং ওয়াশিংটনের জন্য সংঘাতের পথকে ব্যয়বহুল করে তুলবে।

তবে বর্তমান সংঘাত এই তত্ত্বকে একটি কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। আর এ ধরনের পরীক্ষা মূলত কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাগুলোকেই উন্মোচিত করেছে। উত্তেজনার এই পর্যায়টি ইরানের ‘পূর্বমুখী’ অবস্থানের পতন ঘটায়নি ঠিকই, তবে অংশীদারত্ব ও সুরক্ষার মধ্যে এবং কূটনৈতিক সংহতি ও কৌশলগত অঙ্গীকারের মধ্যে যে সূক্ষ্ম ব্যবধান রয়েছে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। সার্বভৌমত্ব, প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিতর্কের কেন্দ্রে এখন এই পার্থক্যটিই অবস্থান করছে; আর এটি এমন একসময়ে ঘটছে যখন দেশটির নেতৃত্বের উত্তরাধিকার পরিবর্তনের রাজনীতি ঘনিয়ে আসছে।

তেহরানের এই পুনর্মূল্যায়নের টার্নিং পয়েন্ট বা সন্ধিক্ষণটি এসেছে ২০২৫ সালের বসন্তে। এটি কোনো মার্কিন সামরিক বাহিনী মোতায়েন বা ইসরায়েলি বিবৃতির মাধ্যমে নয়, বরং মস্কোর এক শীতল নীরবতার মাধ্যমে শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার সময় যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেন, ইরান পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে ‘বোমাবর্ষণ’ হতে পারে, তখন ইরানের নজর পূর্ব দিকে যায়। রাশিয়া ইরানের সঙ্গে একটি ব্যাপক কৌশলগত চুক্তি অনুমোদন করে। এরপর ইরানি কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন, দুই দেশের সম্পর্ক একটি নতুন ও উচ্চতর ধাপে প্রবেশ করছে। এটি সাময়িক সুবিধার ঊর্ধ্বে চলে গেছে।

তবে ২০২৫ সালের এপ্রিলে রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই রুদেনকো স্টেট ডুমায় (রুশ পার্লামেন্ট) ভাষণ দেওয়ার সময় চুক্তির প্রকৃতি স্পষ্ট করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি কোনো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়। যদি ইরান যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা আক্রান্ত হয়, তবে রাশিয়া সামরিক সহায়তা দিতে বাধ্য থাকবে না। চুক্তিটি উভয় পক্ষকে সাধারণ হুমকির বিরুদ্ধে সহযোগিতা করতে এবং কোনো আক্রমণকারীকে সমর্থন করা থেকে বিরত থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করে, কিন্তু এটি সামষ্টিক প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে না। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি কূটনৈতিকভাবে সুনির্দিষ্ট এবং কৌশলগতভাবে ছিল চূড়ান্ত। মস্কো সংকেত দিচ্ছিল, অংশীদারত্ব মানেই এই নয় যে তারা ইরানের দ্বন্দ্বে সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়বে।

এ অবস্থানটি রাশিয়ার বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য কৌশলের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, যা কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে যোগ দেওয়ার বদলে বহুমুখী সম্পৃক্ততাকে প্রাধান্য দেয়। মস্কো কেবল তেহরানের সঙ্গেই নয়, বরং ইসরায়েল, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গেও কার্যকরী সম্পর্ক বজায় রাখে। তারা এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে আগ্রহী নয়, যা এই সম্পর্কগুলোর নমনীয়তাকে বিপন্ন করতে পারে। অন্য কথায়, রাশিয়ার আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গি লেনদেনভিত্তিক, জোটভিত্তিক নয়।

ইরানি নীতিনির্ধারকেরা পূর্বমুখী জোটকে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধক হিসেবে দেখেছিলেন, তাঁদের জন্য এই বার্তাটি ছিল অত্যন্ত অপ্রীতিকর। রাশিয়া সামরিক উত্তেজনার নিন্দা জানাবে, জাতিসংঘে কূটনৈতিক সমর্থন দেবে এবং প্রয়োজনে নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করবে; কিন্তু তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সংঘাতকে রাশিয়ার সংঘাতে পরিণত করবে না।

গত জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধ সেই উপলব্ধিকে আরও প্রখর করে তোলে। সেই সংঘাতে মার্কিন বাহিনী ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা করেছিল। মস্কো বাগাড়ম্বরপূর্ণ নিন্দা জানালেও সরাসরি কোনো সামরিক সহায়তা দেয়নি। রুশ কর্মকর্তারা পরে উল্লেখ করেন, ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো সহায়তার অনুরোধ করেনি এবং তাঁরা মনে করিয়ে দেন যে ইরান এর আগে যৌথ বিমান প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় গভীরতর সংহতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবুও বাস্তবতা এড়ানো যায়নি, ইরান একাই সেই হামলা মোকাবিলা করেছে।

সাবেক এবং বর্তমান ইরানি কর্মকর্তারা এর পর থেকে আরও স্পষ্টভাবে কথা বলতে শুরু করেছেন। ইরানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ রেজা জাফরকান্দি মন্তব্য করেছেন, সংকটের সময় দেশটিকে ‘সব সময় একাই থাকতে হয়েছে’। অন্যরা মস্কোর সমালোচনা করে বলেছেন, রাশিয়া ইরানকে উন্নত সু-৩৫ ফাইটার জেট এবং এস-৪০০ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে, অথচ ভারতের মতো দেশকে তারা একই রকম বা তার চেয়েও উন্নত প্রযুক্তি দিচ্ছে, যাদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

এই সমালোচনাগুলো কেবল রুশ সেনারা ইরানের হয়ে যুদ্ধ করবে—এমন প্রত্যাশা থেকে আসেনি। বরং এটি কৌশলগত অংশীদারত্বের বুলি এবং রাশিয়ার সমর্থনের বাস্তব সীমাবদ্ধতার মধ্যবর্তী ব্যবধান নিয়ে ক্রমবর্ধমান অস্বস্তি প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র সংঘাতের এই মুহূর্তে সেই ব্যবধানটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, চলতি বছরের জানুয়ারির বিক্ষোভের সময় মস্কো ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীকে নিরবচ্ছিন্ন সহায়তা দিয়ে গেছে। ডিজিটাল মনিটরিং টুলস, ইন্টারসেপশন টেকনোলজি থেকে শুরু করে গণজমায়েত ভন্ডুলের উন্নত নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। তবে তারা এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে, যা রাশিয়াকে সরাসরি কোনো ঝুঁকি বা সংঘাতের মুখে ফেলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরবর্তী উত্তেজনা কেবল প্রতিরোধের সক্ষমতা যাচাই করেনি; এটি একটি অভ্যন্তরীণ বিতর্ককেও পুনরুজ্জীবিত করেছে। পূর্বমুখী সংহতির যৌক্তিকতা বা গভীরতা নিয়ে ইরানের রাজনৈতিক মহলে ঐকমত্যের অভাব রয়েছে। পশ্চিমবিরোধী কট্টরপন্থী শিবির মস্কো ও বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ার আদর্শের সংশোধন এবং কৌশলগত প্রয়োজন হিসেবে চিত্রায়িত করে আসছে। তাঁদের যুক্তি হলো, পশ্চিমা শত্রুতা কাঠামোগত এবং একটি অপশ্চিমা অক্ষের সঙ্গে একীভূত হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হতে পারে। তাঁদের দৃষ্টিতে, রাশিয়ার কূটনৈতিক সমর্থন এবং চীনের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততাই প্রমাণ করে বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা এখন বাস্তব এবং সময় তেহরানের অনুকূলে। তবে বর্তমান সংকট সমালোচকদের হাতে নতুন রসদ তুলে দিয়েছে।

ইরানি পার্লামেন্টের সাবেক ডেপুটি স্পিকার এবং স্বাধীনচেতা হিসেবে পরিচিত রক্ষণশীল নেতা আলী মোতাহারি কোনো বিদেশি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। তাঁর সমালোচনাটি রাশিয়ার সরাসরি বিরোধী নয়, তবে এর ইঙ্গিত স্পষ্ট: কৌশলগত স্বাধীনতা এবং কাঠামোগত নির্ভরতা একসঙ্গে চলতে পারে না। তাঁর মতে, স্বায়ত্তশাসনের জন্য প্রয়োজন বহুমুখীকরণ, এক শক্তির বদলে অন্য শক্তিকে স্থলাভিষিক্ত করা নয়।

ইরানি পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান হেশমতুল্লাহ ফালাহাতপিশে আরও এক ধাপ এগিয়ে দাবি করেছেন, রাশিয়ার আঞ্চলিক আচরণ প্রমাণ করে যে মস্কো শেষ পর্যন্ত ইরানের নিরাপত্তা উদ্বেগের চেয়ে নিজ স্বার্থ রক্ষাকেই প্রাধান্য দেয়। তাঁর মতে, ইরানের স্বার্থে রাশিয়া কখনোই বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাব বলয় বা ইউক্রেন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষিকে বিপন্ন করবে না।

এই মন্তব্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে নয় যে তারা কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে (কট্টরপন্থীদের এখনো ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব রয়েছে), বরং এগুলো একটি দীর্ঘদিনের উপলব্ধিকে জাগিয়ে তুলেছে যে রাশিয়ার হিসাব-নিকাশ নিজ স্বার্থ পরিচালিত। এই বিতর্ক এখন আর তাত্ত্বিক পর্যায়ে নেই; এটি এখন বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

ফলস্বরূপ, রাশিয়া ইরানের পররাষ্ট্রনীতি থেকে অভ্যন্তরীণ বিভাজনের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কট্টরপন্থীরা যুক্তি দিচ্ছেন, পশ্চিমা চাপই প্রমাণ করে কেন পূর্বের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়া উচিত। এই শিবির রাশিয়াকে কেবল একজন অংশীদার হিসেবে নয়, বরং একটি অপশ্চিমা পরিচয়ের গ্যারান্টি ও ইসলামিক রিপাবলিকের টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে দেখছে। তাঁদের কাছে পশ্চিমের সঙ্গে পুনরায় ভারসাম্য রক্ষা মানে কেবল কূটনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষয় এবং ১৯৭৯ সাল থেকে গড়ে তোলা আদর্শিক কাঠামোর পতন। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, মস্কোর এই স্বার্থান্বেষী আচরণ নিরাপত্তার বিভ্রমকে উন্মোচিত করে। উভয় পক্ষই ‘রিয়ালিজম’ বা বাস্তববাদের কথা বললেও, তাদের সংজ্ঞা ভিন্ন।

এই বিতর্কটি সরাসরি ইরানের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক গতিপথের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ঐতিহাসিক স্মৃতি ঘাঁটলে দেখা যায়, ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের ইতিহাস জবরদস্তিতে ভরা: ১৯ শতকে ভূখণ্ড হারানো, ১৯০৭ সালে ব্রিটেন ও রাশিয়ার মধ্যে ইরানকে প্রভাব বলয়ে ভাগ করে নেওয়া, ইরানের সাংবিধানিক বিপ্লবে (১৯০৫—১৯১১) মস্কোর হস্তক্ষেপ, আজারবাইজান ও কুর্দিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন এবং ১৯৪০-এর দশকে উত্তর ইরান দখল। সাম্প্রতিক ক্ষোভগুলোর দিকে তাকালে: ২০১০ সাল থেকে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার ভোট দেওয়া, সিরিয়ায় ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের গোপন বোঝাপড়া এবং পশ্চিমের সঙ্গে দর-কষাকষিতে ইরানকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা জাজ্বল্যমান। এগুলো সমালোচকদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।

বর্তমানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র এমন এক নেতৃত্ব পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান হবে বৈধতা ও দক্ষতার মাপকাঠি। সেই পরিবেশে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের’ গুরুত্ব হবে অপরিসীম। সেই স্বায়ত্তশাসন কি অপশ্চিমা শক্তির সঙ্গে হবে, নাকি কোনো নমনীয় ও বৈচিত্র্যময় কূটনীতির মাধ্যমে হবে? যা কোনো একক অংশীদারের ওপর কাঠামোগত নির্ভরতা এড়িয়ে চলবে। বর্তমান সংঘাত এই প্রশ্নটিকে আরও তীক্ষ্ণ করে তুলেছে।

মার্কিন-ইরান সংকট শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার অনির্ভরযোগ্যতার চেয়ে বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার প্রকৃতিকেই উন্মোচন করেছে। সামরিক গ্যারান্টি দিতে মস্কোর অনীহা কোনো বিশ্বাসঘাতকতা নয়; এটি তাদের কৌশলগত মডেলেরই একটি অংশ। রাশিয়া কোনো ঝামেলায় না জড়িয়েই প্রভাব বিস্তার করতে চায়, কোনো দায়বদ্ধতা ছাড়াই সুবিধা নিতে চায়। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সম্পর্কগুলো বিভিন্ন স্তরে বিন্যস্ত এবং একটির ওপর অন্যটি ওভারল্যাপ করে, যা ব্লকের স্থায়িত্বের চেয়ে নমনীয়তাকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, তবে অনেকগুলোর মধ্যে একজন মাত্র।

চীনের দৃষ্টিভঙ্গিও অনেকটা একই রকম: উত্তেজনার সময় মৌখিক বিরোধিতা, স্থিতিশীল অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং ইরানের হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলা। মস্কো বা বেইজিং কেউই এই অঞ্চলে ‘জোটের যুক্তি’ মেনে কাজ করে না। তারা উভয়েই একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে পছন্দ করে।

তেহরানের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চলবে, জ্বালানি সমন্বয় এগোবে এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা হয়তো ধীরে আরও গভীর হবে। চীনও ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে থাকবে। মূল কথাটি এই নয় যে ‘পূর্বমুখী নীতি’ ব্যর্থ হয়েছে; বরং এর সীমাবদ্ধতাগুলো এই সংকটে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

ওয়াশিংটনের কাছে এই পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি রাশিয়ার সমর্থন কেবল কূটনীতি ও মধ্যস্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা মস্কোর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ভয় ছাড়াই তেহরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারবেন। জোটবদ্ধ অঙ্গীকারের অভাব ব্লকের মেরুকরণের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়, এমনকি বাগাড়ম্বর তীব্র হলেও।

ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বর্তমান অবস্থা সরাসরি যুদ্ধ বা শান্তি না আনলেও অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী। ইরানকে এখন ঠিক করতে হবে একটি বাস্তববাদী বিশ্বে কীভাবে নিজের বাস্তববাদকে সংজ্ঞায়িত করা যায়, যেখানে অংশীদারেরা হবে বাস্তববাদী কিন্তু সুরক্ষাকারী নয়। মোতাহারি ও ফালাহাতপিশের মতো ব্যক্তিদের যুক্তিতে এবং তেহরানের রাজনৈতিক মহলে প্রতিধ্বনিত এই সংজ্ঞার লড়াই কেবল বর্তমান সংকটে ইরানের প্রতিক্রিয়াই নির্ধারণ করবে না, বরং খামেনি-পরবর্তী যুগে দেশটির কৌশলগত অবস্থানকেও রূপ দেবে।

ফরেন পলিসি থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

তালেবানের পৃষ্ঠপোষক থেকে কেন প্রতিপক্ষ হয়ে উঠল পাকিস্তান

ভারতের ডি-হাইফেনেশন নীতি, মোদির ইসরায়েল সফরের ৫ দিক

ফের কেন আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল পাকিস্তান

নেপালে জেন-জি বিক্ষোভে নির্বিচার হত্যার নেপথ্যে পুলিশ, দায় এড়ানোর নোংরা খেলায় প্রশাসন

মার্কিন হামলা ঠেকাতে ইরানকে যেভাবে শক্তিশালী করছে চীন

মোদির ইসরায়েল সফর পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

‘কৌশলগত অনুপ্রবেশের’ অন্ধকার গলিতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের প্রগতিশীলেরা

কেন এত ঘনিষ্ঠ ইসরায়েল–ভারত, আসন্ন সফর থেকে কী ফায়দা চান মোদি

বন্ধু ইরান দুর্বল হবে, সেই আশায় ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ ভারত

নয়া কৌশলগত আতঙ্কে ইসরায়েল, তুরস্ক কি পরবর্তী ‘ইরান’