মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনার মুখে সাধারণত বিশ্বের অন্যান্য নেতারা যেখানে সংযত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে থাকেন, সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আক্রমণ ও উসকানির জবাবে নজিরবিহীনভাবে পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছেন তিনি। এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের জের ধরে মায়ামিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যৌথ বাণিজ্য ফোরাম বাতিল করেছে ইতালি।
বিশ্লেষকদের মতে, এত দিন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ও কট্টর রক্ষণশীল মিত্র হিসেবে পরিচিত মেলোনির এই অবস্থান পরিবর্তন মার্কিন মিত্রদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণকে ওলটপালট করে দিয়েছে।
বিগত ২৪ ঘণ্টায় জর্জিয়া মেলোনি এমন কিছু মন্তব্য করেছেন যা মার্কিন মিত্র দেশগুলোর নেতারা সাধারণত জনসমক্ষে এড়িয়ে চলেন। মেলোনি অভিযোগ করেছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রমাগত অসত্য তথ্য ছড়ান, বন্ধুদের অবজ্ঞা করেন এবং শত্রুদের তোষামোদ করেন।
এখানেই শেষ নয়, যুক্তরাষ্ট্রে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছানোর বিষয়টি ইঙ্গিত করে মেলোনি তাঁকে নিজের জনমত জরিপের দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
এর আগে ইরানের যুদ্ধ নিয়ে পোপ লিও চতুর্দশের সমালোচনা করার কারণে ট্রাম্পের সঙ্গে মেলোনির এক দফা বিরোধ তৈরি হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জি-৭ জোটের নেতাদের এক বৈঠকের পর এই বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে। অথচ ফ্রান্সের সেই বৈঠকে ট্রাম্প ও ইরানের মধ্যকার বহুল আলোচিত শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারে অন্য সব নেতারা নিজেদের ক্ষোভ সরিয়ে রেখেছিলেন।
কূটনৈতিক এই বাগ্যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে। ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শেষ মুহূর্তে মায়ামিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া যৌথ বাণিজ্য ফোরামটি বাতিল ঘোষণা করেছে। ওই ফোরামে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-র উপস্থিত থাকার কথা ছিল।
এই সম্মেলনেই মার্কিন নেতৃত্বাধীন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ অংশীদারত্ব উদ্যোগ ‘প্যাক্স সিলিকা’ (Pax Silica)-তে ইতালির আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই করার কথা ছিল। বৈঠক বাতিলের ফলে এই কৌশলগত চুক্তিটি এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও বৈশ্বিক অংশীদারত্ব বিষয়ক দূত পাওলো জাম্পোলি ইতালীয় সংবাদপত্র ‘রিপাবলিকা’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পরিস্থিতিকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘চূড়ান্ত ফাটল’ বলে বর্ণনা করেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের আক্রমণাত্মক কূটনৈতিক আচরণের মুখে ইউরোপীয় ও বিশ্বনেতারা দীর্ঘদিন ধরেই রক্ষণাত্মক নীতি অবলম্বন করে আসছিলেন।
এর মধ্যে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ও ট্রাম্পের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক থাকলেও, সম্প্রতি ভার্সাই প্রাসাদে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সইয়ের সময় মাখোঁর আতিথেয়তায় ট্রাম্প বেশ সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও ট্রাম্পের সুনজরে থাকার চেষ্টা করেছিলেন। তবে ইরানের ওপর হামলার জন্য যুক্তরাজ্যের বিমানঘাঁটি ব্যবহারের মার্কিন প্রস্তাবে আপত্তি জানানো মাত্রই ট্রাম্প তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হন, যা স্টারমারকে নিজ দেশেও রাজনৈতিক চাপের মুখে ফেলেছে।
জার্মানির ফ্রেডরিখ মার্জ সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে ট্রাম্পকে একটি ফুটবল জার্সি উপহার দিয়ে ‘একই দলে’ খেলার বার্তা দিয়েছেন। অন্যদিকে, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি পার্ল হারবার নিয়ে ট্রাম্পের করা উপহাস মুখ বুঁজে সহ্য করেছেন।
এমনকি ট্রাম্পকে মাত্রাতিরিক্ত তোষামোদ করার অভিযোগে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুত্তেকে ফ্রান্সের ওই জি-৭ বৈঠকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
২০২৫ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে অনেক ইউরোপীয় নেতাই মনে করতেন যে তাঁর সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্বে জড়ানো রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হতে পারে। কিন্তু ৪৯ বছর বয়সী জর্জিয়া মেলোনি সেই ধারণা ভেঙে দিতে চাচ্ছেন।
আগামী বছর ইতালিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। রোমের লুইস ইউনিভার্সিটির গবেষক লরেঞ্জো কাস্তেলানি মনে করেন, ইতালির ভোটারদের কাছে নিজেকে ‘ইউরোপে ট্রাম্পের পুতুল’ হিসেবে প্রমাণ করতে চান না মেলোনি। বরং ট্রাম্পের আক্রমণের শক্ত জবাব দিয়ে তিনি নিজের স্বাধীন সার্বভৌম ভাবমূর্তি তুলে ধরছেন। এই ভাবমূর্তি ইতালির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মেলোনির জনপ্রিয়তা বাড়াতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।