বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের তীব্র অস্থিরতার কারণে চলতি বছর ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুততম গতিতে বাজার থেকে তারল্য বা বিনিয়োগ সংকুচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ সংক্রান্ত একের পর এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের কারণে বাজার এখন এক প্রকার ‘জিম্মি’ হয়ে পড়েছে। ফলে তেলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে দীর্ঘ মেয়াদে পুঁজি ধরে রাখতে ভয় পাচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
বাজারের তারল্য মূলত ক্রেতা ও বিক্রেতার সংখ্যার ভারসাম্য এবং লেনদেনের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। এলএসইজি-এর তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীদের কাছে থাকা ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারস চুক্তির সংখ্যা (যা ‘ওপেন ইন্টারেস্ট’ নামে পরিচিত) চলতি বছর প্রায় ১৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০০৯ সালের পর তেলের বাজারে এত দ্রুত ওপেন ইন্টারেস্ট কমার রেকর্ড আর নেই।
লন্ডন ও নিউইয়র্কের তেল ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইরান ইস্যুতে কখনো কঠোর হুমকি দেওয়া, আবার তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ‘শান্তি চুক্তি আসন্ন’ বলে ট্রাম্পের দাবি করার যে প্রবণতা—তাতে বিনিয়োগকারীরা ক্লান্ত ও বিভ্রান্ত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি শীর্ষস্থানীয় ট্রেডিং ডেস্কের নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘মানুষ এই বিশৃঙ্খলায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তারা এর অবসান চায়। প্রতি ঘণ্টায় যখন বার্তার ধরন বদলে যায়, তখন লোকসান না খেয়ে ফিউচার মার্কেটে টিকে থাকা অসম্ভব।’
গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ট্রাম্প ইরানের ওপর নতুন হামলার সিদ্ধান্ত স্থগিত করার এবং একটি চুক্তি খুব কাছাকাছি রয়েছে বলে দাবি করার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ কমে দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে আসে।
চলতি মাসের শুরুতে আগস্টের ব্রেন্ট ফিউচারস চুক্তির সক্রিয় লেনদেন শুরু হওয়ার পর ওপেন ইন্টারেস্টের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৫ লাখ ৩৪ হাজার ২২৭ লটে, যা গত বছরের জুলাইয়ের পর সর্বনিম্ন।
বাজারে তারল্য বা ক্রেতা-বিক্রেতার সংখ্যা কমে গেলে দামের ওঠানামা অনেক বেশি উগ্র রূপ নেয়। কারণ পর্যাপ্ত কাউন্টারপার্টি বা বিপরীত পক্ষ না থাকায় ক্রেতা-বিক্রেতাদের বাধ্য হয়ে অনেক বেশি বা কম মূল্যে লেনদেন করতে হয়। এতে একদিকে যেমন বড় মুনাফার সম্ভাবনা থাকে, ঠিক তেমনি ভারী লোকসানের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়।
গোল্ডম্যান স্যাকসের সাবেক কমোডিটি প্রধান জেফরি কারি গত ১০ জুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে লেখেন, ‘নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে তেলের বাজার এখন এতই অস্থির যে এখানে বিনিয়োগ ধরে রাখা কঠিন।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ থাকার পরেও তেলের দাম যে প্রত্যাশিতভাবে ১০০ ডলারের ওপরে ওঠেনি, তার কারণ সরবরাহের প্রাচুর্য নয়, বরং বাজারে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি খাটাতে তীব্র অনীহা বা ‘ক্যাপিটাল অ্যাভারশন’।
ডব্লিউটিআই: প্রতি ব্যারেল ৮৪.৯৯ মার্কিন ডলার (পতন ৩.১০ শতাংশ)
ব্রেন্ট ক্রুড: প্রতি ব্যারেল ৮৭.৭০ মার্কিন ডলার (পতন ২.৯৭ শতাংশ)
মুরবান ক্রুড: প্রতি ব্যারেল ৮৩.৯৯ মার্কিন ডলার (পতন ৩.৭৪ শতাংশ)
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দামের এই আকস্মিক পতনের নেপথ্যে কয়েকটি মূল কারণ কাজ করছে:
১. ভৌত সরবরাহে বড় বিঘ্ন না ঘটা: বিশ্ব বাজারের বড় ভীতি ছিল যে ইরান হয়তো হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে, যা দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয়। তবে সামরিক উত্তেজনা সত্ত্বেও তেলবাহী ট্যাংকারগুলো এখনো প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করছে এবং সৌদি আরব বা আমিরাতের মতো বড় উৎপাদকদের রপ্তানিতে কোনো বড় ধরনের বাধা দেখা যায়নি।
২. ওপেক প্লাসের বড় উৎপাদন সক্ষমতা: সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর হাতে এখনো বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত তেল উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। ফলে ইরানের আংশিক তেল সরবরাহ ব্যাহত হলেও অন্য দেশগুলো তা পূরণ করতে পারবে—এই আশ্বাসে ফিউচার মার্কেটে আতঙ্কজনিত কেনাকাটা কমেছে।
৩. বৈশ্বিক চাহিদার মন্দা ভাব: ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা থিতিয়ে আসতেই বিনিয়োগকারীদের নজর আবারও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ফিরেছে। ইউরোপে উৎপাদন খাতের ধীর গতি, চীনে মন্থর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং বিভিন্ন দেশে উচ্চ সুদের হারের কারণে তেলের সামগ্রিক চাহিদা কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
৪. মুনাফা তুলে নেওয়ার তাগিদ: অনেক হেজ ফান্ড ও কমোডিটি ব্যবসায়ী সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটের সময় তেলের দাম বৃদ্ধির পক্ষে বড় বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু দাম যখন ৯০ থেকে ৯৫ ডলারের ওপরে স্থায়ী হতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা লোকসান এড়াতে তড়িঘড়ি করে মুনাফা তুলে নিতে শুরু করেন, যা দামের পতনকে ত্বরান্বিত করেছে।
বাজারে দামের পরবর্তী বড় পরিবর্তনগুলো মূলত কথার লড়াইয়ের চেয়ে বাস্তবে তেলের ভৌত সরবরাহ কতটা সচল থাকে তার ওপর নির্ভর করবে। বিশ্লেষকেরা সামনের দিনগুলোর জন্য তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি দেখছেন:
যদি হরমুজ প্রণালির সংকট কেটে যায় এবং শান্তি আলোচনা সফল হয়, তবে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮০ থেকে ৮৫ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ৭৫ থেকে ৮২ ডলারে নেমে আসতে পারে। এতে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে।
যদি কোনো কারণে হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়, তবে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দ্রুত ১০০ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ৯৫ থেকে ১০৫ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
যদি বড় ধরনের কোনো সামরিক সংঘাত না ঘটে, কিন্তু চাপা উত্তেজনা বজায় থাকে, তবে ব্রেন্ট ক্রুড ৮৫ থেকে ৯৫ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ৮০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে।