হোম > বিশ্লেষণ

বিশ্বশান্তি রক্ষায় ব্যস্ত ইসলামাবাদ: পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অন্দরে চলছে অন্য খেলা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইসলামাবাদে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট অথচ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের পাত্তা নেই। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দামামা আর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কালো মেঘের মাঝে পাকিস্তান এক অভাবনীয় কূটনৈতিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। দুই চিরশত্রু দেশের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে শান্তি স্থাপনের এক কঠিন মিশনে নেমেছে ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডি। কিন্তু আন্তর্জাতিক এই ‘শান্তির সুতা’ আঁকড়ে ধরার আড়ালে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কি তবে নিঃশব্দে মৃত্যুর পথে এগিয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্নটিই এখন পাকিস্তানের সচেতন মহলে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

বর্তমানে পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের সব মনোযোগ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতার টেবিলে। একদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের গোপন ও প্রকাশ্য আনাগোনা, অন্যদিকে তেলের অস্থিতিশীল বাজার আর নতুন নতুন আঞ্চলিক জোট গঠনের সমীকরণ—সব মিলিয়ে ঘরোয়া রাজনীতি যেন পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআই নেতা ইমরান খান এবং তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবি এখনো লোকচক্ষুর অন্তরালে কঠোর গোপনীয়তায় বন্দী। কিন্তু তাঁদের মুক্তির আন্দোলন বা আইনি লড়াই নিয়ে কথা বলার মতো ফুরসত যেন এখন কারোর নেই। এমনকি ইমরান খান কতদিন ধরে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পারছেন না, সেই মানবিক হিসাবটিও এখন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালে এসে পাকিস্তানের প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলো যেন ‘সেকেলে’ কোনো ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে, যাদের প্রাসঙ্গিকতা এখন কেবল ড্রয়িংরুমের আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ।

ইসলামাবাদের বিলাসবহুল সেরেনা হোটেলে যখন বিদেশি কূটনীতিকদের ব্যস্ত আনাগোনা, তখন স্বাগতিক হিসেবে সামনের সারিতে দাপিয়ে বেড়াতে দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, উপ-প্রধানমন্ত্রী ও প্রভাবশালী পররাষ্ট্র ব্যক্তিত্ব ইশাক দার এবং ক্ষমতাধর সামরিক নেতৃত্বকে। কিন্তু এই মহাযজ্ঞে বিস্ময়করভাবে গরহাজির জোট সরকারের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)।

সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, যখন বিশ্বের একটি পরাশক্তির ভাইস-প্রেসিডেন্ট শান্তি আলোচনার জন্য ইসলামাবাদে অবস্থান করছেন, তখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি খোদ রাজধানীতেই ছিলেন না। বিশ্বস্ত সূত্রগুলো বলছে, তিনি তখন সিন্ধু প্রদেশে নিজের রাজনৈতিক দুর্গে সময় কাটাচ্ছিলেন। অথচ মাত্র এক বছর আগেও চিত্রটি ছিল ভিন্ন। ২০২৫ সালে জর্ডানের রাজা কিংবা তুর্কি প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানাতে শাহবাজ ও জারদারিকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিমানবন্দরে দেখা গেছে। কিন্তু ২০২৬-এর এই মহাগুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মুহূর্তে জারদারি বা বিলাওয়াল ভুট্টো—কাউকেও কেন দেখা গেল না, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

পিপিপি-র এই রহস্যজনক অনুপস্থিতি কেবল প্রোটোকলগত কোনো ভুল নয়, বরং এটি বর্তমান ‘হাইব্রিড নিজাম’ বা মিশ্র শাসনব্যবস্থার গভীর সংকটেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। নেপথ্যে রয়েছে ২৮ তম সংশোধনী এবং জাতীয় অর্থ কমিশন (এনএফসি) অ্যাওয়ার্ড নিয়ে কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে চলমান তীব্র আর্থিক টানাপোড়েন। অভিযোগ উঠছে, কেন্দ্র তার আর্থিক বোঝা কমাতে প্রদেশের ভাগের অর্থ ছাঁটাই করতে চাচ্ছে, যা সিন্ধুর শাসক দল পিপিপি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না।

সিন্ধু প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ আলি শাহ অবশ্য পরিস্থিতি সামাল দিতে এক চতুর বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধানকে সাফল্যের সমান অংশীদার বলে দাবি করেছেন। তবে বাস্তব চিত্র বলছে অন্য কথা। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এখন নিজের অবস্থানে এতটাই আত্মবিশ্বাসী যে, মিত্রদের তোয়াজ করার প্রয়োজন তিনি বোধ করছেন না। ২০২৫ সালে যেখানে বিলাওয়াল ভুট্টো পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রতিনিধি দলের ‘মুখ’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাচ্ছিলেন, সেখানে ২০২৬-এ এসে শাহবাজ শরিফ একাই সমস্ত নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখেছেন।

পাকিস্তান যখন তার প্রতিবেশী দেশগুলোর হাতে ‘শান্তির মুকুট’ তুলে দেওয়ার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে, তখন নিজের ঘরের অন্দরমহলে আস্থার সংকট প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। করাচির ভঙ্গুর শাসনব্যবস্থা নিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সমালোচনা এবং এনএফসি নিয়ে প্রদেশগুলোর বিরোধ অদূর ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। আন্তর্জাতিক যুদ্ধের ডামাডোল কি সত্যিই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে চিরতরে গ্রাস করবে, নাকি শান্তির আলোচনার দ্বিতীয় রাউন্ড শেষে আবার ফিরে আসবে ঘরোয়া রাজনীতির পুরোনো উত্তাপ—সেটাই এখন দেখার বিষয়।

পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক দ্য ডন-এ প্রকাশিত সাংবাদিক আরিফা নূরের নিবন্ধ অবলম্বনে

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অনিশ্চিত, ইরানে কি ফের ‘অতর্কিত হামলা’

মধ্যপ্রাচ্যে ‘সিসিফাসের ফাঁদে’ যুক্তরাষ্ট্র, তবু ইরান যুদ্ধে কেন নেপথ্যে খেলোয়াড় চীন

রয়টার্সের বিশ্লেষণ: ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় ইরানিরা

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নীরব যুদ্ধ: ৫ বিলিয়ন ডলারের পেস্তাবাদামের বাজার দখলের লড়াই

নয়ডায় শ্রমিক বিক্ষোভ: ভারতের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হয়ে ওঠার স্বপ্ন কি চ্যালেঞ্জের মুখে

শুধু ইরান নয়, আরও বহু দিকে হারছেন ট্রাম্প

ইরানি সেনার কাঁধে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রেই থমকে যেতে পারে মার্কিন বিমান হামলা

দুপক্ষই জিতবে—যেভাবে এমন চুক্তির পথে হাঁটতে পারে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের ১০০ বিলিয়ন ডলার: কোন কোন দেশে জব্দ, অবমুক্ত হলে ফায়দা কতটা

মুইজ্জুতে মোহভঙ্গ হচ্ছে মালদ্বীপবাসীর