হোম > বিশ্লেষণ

ভ্যাটিকানের দ্বারস্থ সিলিকন ভ্যালি, ধর্ম ও বিজ্ঞানের বিরোধ কি মিটে যাচ্ছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

এআই নৈতিকতা নিয়ে ধর্মতত্ত্বের শরণাপন্ন হচ্ছে টেক জায়ান্টরা। ছবি: সংগৃহীত

১৬৩৩ সালে গ্যালিলিও গ্যালিলি যখন পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে—এই বৈজ্ঞানিক সত্য প্রচারের জন্য রোমের ক্যাথলিক চার্চের হাতে নির্যাতিত হয়েছিলেন, তখন বিজ্ঞান ও ধর্মের সংঘাত চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল। প্রায় চার শতাব্দী পর প্রেক্ষাপট নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। আজ খোদ সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তিবিদেরা তাঁদের তৈরি ‘ঈশ্বরসম’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের নৈতিকতা ও অস্তিত্বের সংকট বুঝতে ভ্যাটিকানের দ্বারস্থ হচ্ছেন।

২০১৬ সাল থেকে রোমের ‘সান্তা মারিয়া সোপ্রা মিনার্ভা’ চার্চে শুরু হওয়া ‘মিনার্ভা ডায়ালগ’ এখন সিলিকন ভ্যালি ও ক্যাথলিক চার্চের বার্ষিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। যেখানে একসময় গ্যালিলিওকে দণ্ড দেওয়া হয়েছিল, আজ সেখানেই গুগল, মাইক্রোসফট এবং ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা যাজক ও ধর্মতত্ত্ববিদদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসছেন। ভেনচার ক্যাপিটালিস্ট রিড হফম্যানের মতে, চার্চের এই গম্ভীর পরিবেশ প্রযুক্তিবিদদের তাঁদের প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বাইরে গিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য করে।

কেন এই অদ্ভুত জোট?

সিলিকন ভ্যালির স্বার্থ: এআই নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক প্রবল—৭১ শতাংশ মার্কিন চাকরি হারানো এবং ৬৬ শতাংশ মানুষ মানবিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন। বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তাদের হারানো জন-আস্থা পুনরুদ্ধারে চার্চের ‘নৈতিক সিলমোহর’ বা নৈতিক সমর্থনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।

ভ্যাটিকানের স্বার্থ: আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বে চার্চ তার নৈতিক কর্তৃত্ব হারাচ্ছে। এআইয়ের মতো অস্তিত্বের সংকট নিয়ে কাজ করার মাধ্যমে চার্চ প্রমাণ করতে চায়, আধুনিক সমস্যার সমাধানে আজও ধর্মতত্ত্বের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। বর্তমান পোপ লিও চতুর্দশ এআই বিপ্লবকে ১৯ শতকের শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করে এটিকে ‘মানবিক মর্যাদার নতুন চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

গণিত বনাম নৈতিকতা

সিলিকন ভ্যালি এবং ভ্যাটিকান সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করে। সিলিকন ভ্যালির নৈতিকতা সাধারণত ‘কনসিকুয়েন্সিয়ালিজম’ বা ফলাফল-নির্ভর। অর্থাৎ, কোনো কাজের ফলাফল ভালো হলে সেটি নৈতিক। অন্যদিকে, ক্যাথলিক চার্চ মনে করে নৈতিকতা কেবল একটি গাণিতিক সমীকরণ নয়। আর্চবিশপ কার্ডিনাল ব্লেজ কিউপিচের মতে, ‘মানুষের একটি অনন্য মর্যাদা ও মূল্য আছে—যা কোনো অ্যালগরিদম দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়।’ সিলিকন ভ্যালির অনেক প্রযুক্তিবিদ (যেমন—স্যাম অল্টম্যান বা ইলন মাস্ক) মানুষকে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’-এর পথে একটি অন্তর্বর্তী ধাপ মনে করলেও চার্চ মনে করে শরীর ও আত্মা অবিচ্ছেদ্য এবং মানবীয়।

সবচেয়ে চমকপ্রদ উদাহরণ তৈরি করেছে এআই স্টার্টআপ ‘অ্যানথ্রোপিক’। তাদের এআই মডেল ‘ক্লডে’র নৈতিক চরিত্র বা ‘সোল ডকুমেন্ট’ তৈরিতে তারা তিনজন ক্যাথলিক চিন্তাবিদের (যাজক, বিশপ ও ধর্মতত্ত্ববিদ) সাহায্য নিয়েছে।

কোম্পানিটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ক্রিস ওলাহ লক্ষ করেছেন, এআই যখন কোনো ভুল বা প্রতারণা করে, তখন সেটি একধরনের ‘অপরাধবোধ’ থেকে আরও আক্রমণাত্মক আচরণ করতে শুরু করে। এ সমস্যার সমাধানে যাজক ব্রেন্ডন ম্যাকগুয়ার এআইকে ক্যাথলিক ‘ক্ষমা’ বা ‘মার্সি’র ধারণা শেখানোর পরামর্শ দিয়েছেন। এর মূল কথা হলো—ভুল করলেই কেউ চিরস্থায়ীভাবে ‘খারাপ’ হয়ে যায় না। ক্ষমা পাওয়ার আশা থাকলে মানুষের (বা এআইয়ের) আচরণ ভালো হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

বিরোধ ও চ্যালেঞ্জ

এই জোট নিয়ে প্রযুক্তি বিশ্বে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। ভেনচার ক্যাপিটালিস্ট মার্ক অ্যান্ড্রিসেন পোপের নৈতিক হস্তক্ষেপকে ‘প্রগতিবিরোধী’ বলে উপহাস করেছেন। আবার পিটার থিয়েলের মতো টেক-টাইটানরা প্রযুক্তি নিয়ে সংশয়বাদীদের ‘শয়তানের অনুসারী’ মনে করেন। অন্যদিকে, মাইকেল হ্যানবির মতো ক্যাথলিক পণ্ডিতেরা মনে করেন, চ্যাটবটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা মানুষের চিন্তাশক্তি ও সামাজিক যোগাযোগকে যান্ত্রিক করে তুলবে, যা প্রকারান্তরে মানুষকে ‘অমানুষ’ বা ডিহিউম্যানাইজড করে ফেলবে।

উনিশ শতকের পোপ লিও ত্রয়োদশ শিল্পবিপ্লবের সময় শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে ইতিহাস গড়েছিলেন। বর্তমান পোপ লিও চতুর্দশও তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করছেন। তিনি এআইকে ‘একটি হাতিয়ার’ হিসেবে দেখলেও সতর্ক করেছেন যে এটি যেন মানুষের ‘মানবিকতা’ এবং ‘সম্পর্ক’ দখল না করে নেয়। শিগগিরই এআইয়ের ওপর পোপের প্রথম শিক্ষা-সংক্রান্ত নথি বা ‘এনসাইক্লিক্যাল’ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

সিলিকন ভ্যালি ও ভ্যাটিকানের এই অংশীদারত্ব শেষ পর্যন্ত কতটুকু প্রভাব ফেলবে তা সময় বলবে। তবে এটি স্পষ্ট, এআইয়ের মতো প্রযুক্তি তৈরির লড়াইতে এখন কেবল কোডিং জ্ঞান যথেষ্ট নয়। সহস্র বছরের পুরোনো নৈতিক ও দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আজ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তির ‘সিটি অব ম্যান’ এখন আস্থার খোঁজে ধর্মতত্ত্বের ‘সিটি অব গডে’র দরজায় কড়া নাড়ছে।

দ্য আটলান্টিকের নিবন্ধ অবলম্বনে

আমিরাতের ওপেক ত্যাগ তেলের বাজারে কতটা প্রভাব ফেলবে

ফ্রান্সের কবলমুক্ত মালি এখন রাশিয়ার হাতে, ঠেকাতে এককাট্টা আল-কায়েদা ও বিচ্ছিন্নতাবাদীরা

মার্কিন অবরোধের মুখে ইরানি অর্থনীতির লাইফলাইন হতে পারবে কি রাশিয়া

আমিরাতের ‘ওপেক’ ত্যাগ একটি বড় ঘটনা: বিবিসি

স্যাটেলাইট সেবায় যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্য কেড়ে নিল ইরান যুদ্ধ

পাকিস্তানের কাছে কেন হঠাৎ ৩.৫ বিলিয়ন ডলার ফেরত চাইল আমিরাত

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন: এসআইআর আতঙ্ক, বাঙালি অহং এবং পরিচয়ের তালগোল পাকানো রাজনীতি

ঢাকায় নতুন হাইকমিশনার পেশাদার কূটনীতিক নন রাজনীতিক, কেন প্রথা ভাঙল ভারত

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন: বিজেপি কি পারবে ১০০ আসনের গণ্ডি পার করতে

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন: বিজেপি কেন আর বাংলাদেশবিরোধী বয়ান দিচ্ছে না