হোম > বিশ্লেষণ

যেসব কারণে ইরানের কাছ থেকে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ কাড়া শিগগির সম্ভব হবে না

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: সংগৃহীত

বহু বছর ধরেই বিশ্ব আশঙ্কা করে আসছে যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। কিন্তু পাঁচ মাসের যুদ্ধ দেশটির শাসকদের একটি বিষয় বুঝিয়ে দিয়েছে—তাদের হাতে এরই মধ্যে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অস্ত্র রয়েছে। সেটি হলো ভৌগোলিক অবস্থান ও সামরিক শক্তি।

এই দুইয়ের কারণে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কার্যত নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। হরমুজ প্রণালির এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা ইরানের নেতাদের প্রতিপক্ষের ওপর বিপুল চাপ ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিয়েছে।

তবে ইরানের শত্রুরা মনে করছে, হরমুজ প্রণালিকে কাজে লাগানোর এই ক্ষমতা ধীরে ধীরে মূল্য হারাবে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট মে মাসে বলেছিলেন, হরমুজ বন্ধ করা হলো ‘এমন এক তাস, যা একবারই খেলা যায়।’ উপসাগরীয় দেশগুলো ইতোমধ্যে হরমুজের বিকল্প পথে তেল রপ্তানির ব্যবস্থা জোরদার করছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরাক ও সিরিয়া বিষয়ক দূত টম বারাকের ধারণা, দুই বছরের মধ্যে হরমুজ প্রণালি হয়তো ‘অপ্রাসঙ্গিক একটি বিষয়’ হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু দ্য ইকোনমিস্ট বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে এবং তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে একটি ‘হরমুজ নির্ভরতা ড্যাশবোর্ড’ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে এই দাবিগুলো যাচাই করা হয়েছে।

এই বিশ্লেষণ থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। প্রথমত, হরমুজকে কেন্দ্র করে ইরানের হুমকি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা পণ্য ও দেশভেদে ভিন্ন হবে। দ্বিতীয়ত, সময়ের সঙ্গে হরমুজ প্রণালিকে ব্যবহার করে ইরানের অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সক্ষমতা কমে আসবে। তবে এই সক্ষমতা হয়তো কখনো পুরোপুরি শেষ হবে না। তৃতীয়ত, সময়ের সঙ্গে ইরান হরমুজ ব্যবহার করে যে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করতে পারবে, তা কমে গেলেও এর কৌশলগত প্রভাব একই হারে কমবে না। বরং আঞ্চলিক প্রভাবকে ইরান যদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে, তাহলে সময়ের সঙ্গে তার কৌশলগত প্রভাব আরও গভীরও হতে পারে।

হরমুজ এড়িয়ে অন্য পথে কতটা তেল বের করা সম্ভব

প্রথমে দেখা যাক, হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল জাহাজ চলাচলের কতটা অংশ বিকল্প পথে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত। এই তেল অন্য পথে সরিয়ে নেওয়াই তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে সহজ বলে মনে হচ্ছে।

সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে দেশটির ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে লোহিত সাগরের তীরের ইয়ানবু বন্দরে গিয়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধের আগে এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন মাত্র ১০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করা হতো। বর্তমানে এটি তার পূর্ণ সক্ষমতা, অর্থাৎ প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল প্রতিদিন রপ্তানি করা হচ্ছে। বাকি ২০ লাখ ব্যারেল সৌদি আরবের উপকূলীয় শোধনাগার বা রিফাইনারিগুলোতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ইউএই-ও তার হাবশান-ফুজেইরাহ পাইপলাইনের সর্বোচ্চ সক্ষমতা ব্যবহার করছে। এই পাইপলাইন দিয়ে বর্তমানে প্রতিদিন ১৮ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছে। যুদ্ধের আগে এর সক্ষমতা ছিল প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেল।

এ ছাড়া ইরাকের একটি ছোট, একসময় প্রায় অচল থাকা পাইপলাইন দিয়েও বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ব্যারেল তেল তুরস্কে পাঠানো হচ্ছে। এসব বিকল্প পথ ব্যবহারের ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি না করতে পারার কারণে অপরিশোধিত তেলের ঘাটতি এখন কমে দাঁড়িয়েছে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ব্যারেলে।

নতুন পাইপলাইন তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও বদলাতে পারে

এর সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ভবিষ্যতে তৈরি হতে পারে এমন নতুন পাইপলাইনগুলোও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। উপসাগরীয় দেশগুলোর নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতিতে জমি অধিগ্রহণ সাধারণত বড় কোনো সমস্যা নয় বলে জানিয়েছেন এই বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন আইনজীবী।

নতুন পাইপলাইন প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি প্রকল্প। এটি বর্তমানে থাকা পাইপলাইনের সমান্তরালে নির্মাণ করা হবে। নতুন পাইপলাইনটি ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ প্রতিদিন আরও ১৮ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা যোগ করতে পারে। ইরাকও তার বিদ্যমান পাইপলাইনের সক্ষমতা এক বছরের মধ্যে প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে।

এ ছাড়া দেশটি একটি নতুন পাইপলাইন তৈরির পরিকল্পনা করছে। এর মাধ্যমে ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলোকে জর্ডান, সিরিয়া ও তুরস্কের দিকে থাকা বিদ্যমান তেল পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রিস্ট্যাড এনার্জির পরামর্শক রাহুল চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রতিদিন ২৫ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতাসম্পন্ন এই প্রকল্পের জন্য চুক্তি দেওয়া শুরু হয়েছে। এটি সম্পন্ন হতে প্রায় চার বছর সময় লাগবে।

অর্থাৎ, ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে প্রতিদিন আরও প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে অন্য পথে পাঠানো সম্ভব হতে পারে।

তবে তারপরও প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেলের জন্য কোনো বিকল্প পথ থাকবে না। আর এসব বিকল্প ব্যবস্থার কোনোটিই পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। ইরাকের নতুন পাইপলাইন প্রকল্পগুলো নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং সীমান্তসংক্রান্ত বিরোধের কারণে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অতীতেও অনেক পাইপলাইন প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলো বাস্তবায়িত হয়নি।

ইয়ানবু থেকে এশিয়ার উদ্দেশে যাওয়া তেলবাহী জাহাজগুলো সাধারণত বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে যায়। সেখানে তারা ইরানের মিত্র হুথি বিদ্রোহীদের হামলার ঝুঁকিতে থাকে। সৌদি আরব চাইলে তার তেল সুয়েজ খাল কিংবা মিসরের সুয়েজ-মেড (সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগর) বা সুমেড (SUMED) পাইপলাইন দিয়েও পাঠাতে পারে। কিন্তু সেই পথও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। ২৯ জুলাই সুয়েজের কাছাকাছি দামিয়েত্তা বন্দরে একটি তেলবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা হয়েছিল।

নতুন অবকাঠামোও ইরানের হামলার লক্ষ্য হতে পারে

ইরান অথবা ইরানের হয়ে কাজ করা আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এমন যেকোনো নতুন অবকাঠামোয় হামলা চালাতে পারে, যেগুলো তাদের মনে হবে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছে। বাইডেন প্রশাসনের সময় মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে কাজ করা বারবারা লিফের ধারণা, কোনো আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের অবসান হলে ইরান এ ধরনের অবকাঠামোয় হামলা চালানোর সম্ভাবনা কম থাকবে। তবে হামলার আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হবে না। এই ঝুঁকি থাকলে নতুন পাইপলাইন বা অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বীমা এবং অর্থায়নের খরচ বেড়ে যেতে পারে।

পরিশোধিত জ্বালানি সরিয়ে নেওয়া আরও কঠিন

অপরিশোধিত তেলের তুলনায় পরিশোধিত জ্বালানি বা রিফাইন্ড পণ্য অন্য পথে সরিয়ে নেওয়া আরও কঠিন। গত বছর উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল পেট্রল, ডিজেল এবং অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি করেছে।

এসব জ্বালানি পরিবহনের জন্য বর্তমানে কোনো স্থলভিত্তিক পাইপলাইন বিকল্প নেই। সৌদি আরব অবশ্য এমন একটি পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। এটি দেশটির ইস্ট-ওয়েস্ট করিডরের সক্ষমতা প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেল বাড়ানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। কিন্তু প্রকল্পটি এখনো একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি এটি বাস্তবায়ন করতে হলে ইয়ানবু বন্দরের সক্ষমতাও একই পরিমাণে বাড়াতে হবে।

ইরাক অবশ্য ইতোমধ্যে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ট্রাক জ্বালানি তেল সিরিয়ায় পাঠাচ্ছে। যুদ্ধের আগে এই সংখ্যা ছিল প্রতিদিন মাত্র ১০টি ট্রাক। কিন্তু ট্রাকে করে এত বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন ধীরগতির এবং ব্যয়বহুল। সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে শুধু এই জ্বালানি পরিবহন থেকেই সিরিয়া প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি ডলার ট্রানজিট ফি বা পরিবহন-শুল্ক আয় করেছে।

অন্যদিকে, উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে নতুন তেল শোধনাগার বা রিফাইনারি নির্মাণ করতে হলে আরও বেশি সময় লাগবে। পাশাপাশি এতে কয়েকশ কোটি ডলার খরচ হতে পারে। অর্থাৎ, হরমুজ প্রণালির বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হলেও সেটি দ্রুত, সস্তা বা সম্পূর্ণ নিরাপদ কোনো সমাধান নয়। হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে, কিন্তু ইরানের হাতে থাকা এই কৌশলগত অস্ত্র রাতারাতি অকার্যকর হয়ে যাবে, এমনটা মনে করার কারণ নেই।

সমস্যাটা সবচেয়ে বাজে এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে। এই গ্যাসের প্রায় পুরো রপ্তানিই করে কাতার। কিন্তু বিকল্প পথে গ্যাস সরবরাহের জন্য এখন কোনো এলএনজি পাইপলাইন নির্মাণাধীন নেই, এমনকি এ ধরনের প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইও প্রকাশিত হয়নি। তাত্ত্বিকভাবে কাতার ওমানের দিকে তুলনামূলক সহজ গ্যাস পাইপলাইন বসাতে পারে। কিন্তু সেই পাইপলাইন দিয়ে এত বিপুল পরিমাণ গ্যাস পাঠাতে হবে, যা একসময় রাশিয়ার নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইন দিয়ে ইউরোপে সরবরাহ করা গ্যাসের পরিমাণের সমান। এর চেয়েও অবাস্তব ব্যাপার হলো, কাতারের পুরো গ্যাস তরলীকরণ অবকাঠামোই আরব সাগরের উপকূলে নতুন করে তৈরি করতে হবে।

তবু কিছুটা আশার কারণ আছে। সময়ের সঙ্গে বেশিরভাগ আমদানিকারক হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে পারবে। কয়েক বছর জ্বালানির দাম বেশি থাকলে আমেরিকা ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল থেকে প্রতিদিন অতিরিক্ত ২০ থেকে ৩০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ বাজারে আসতে পারে। চীনের শোধনাগারগুলোতেও এখনো যথেষ্ট অতিরিক্ত সক্ষমতা রয়েছে। এলএনজি খাতও তার ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে এই দশক শেষ হওয়ার আগেই বৈশ্বিক জ্বালানির দামের ওপর ইরানের প্রভাব দুর্বল হয়ে যাবে।

কিন্তু পারস্য উপসাগরের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবের ক্ষেত্রে একই কথা বলা যায় না। এর কারণ শুধু এই নয় যে, এসব দেশের জ্বালানি রপ্তানির একটি বড় অংশ আগামী বহু বছর হরমুজ প্রণালি দিয়েই পাঠাতে হবে। এসব দেশ নিজেরাও আমদানির জন্য এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।

উপসাগরীয় আরব দেশগুলো তাদের মোট শস্যের ৯৫ শতাংশ বাইরের দেশ থেকে আমদানি করে। কিন্তু এসব দেশের মধ্যে কেবল সৌদি আরবেরই ভালো মানের বড় পরিমাণে পণ্য ওঠানামার টার্মিনাল রয়েছে। সেগুলোও পুরো অঞ্চলের চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

স্থলপথে বিপুল পরিমাণ শস্য, লৌহ আকরিক বা বক্সাইট পরিবহন করাও বাস্তবসম্মত নয়। একটি পানাম্যাক্স শ্রেণির জাহাজে প্রায় ৬০ হাজার টন শস্য পরিবহন করা যায়। এই পরিমাণ শস্য পরিবহনের জন্য প্রায় ২ হাজার ট্রাক লাগবে।

এর একটি সুস্পষ্ট সমাধান হতে পারে আঞ্চলিক রেলপথ বাড়ানো। কিন্তু এসব রেলপথও নির্মাণ করতে সময় লাগবে এবং খরচ হবে বিপুল। অস্ট্রেলিয়ায় একই ধরনের মরুভূমি এলাকায় খনি-রেলপথ নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত খরচ হয়েছে। সেই হিসাবে লোহিত সাগর থেকে কাতার পর্যন্ত একটি রেললাইন নির্মাণে ২৫ বিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি খরচ হতে পারে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর কৌশলগত শস্য মজুত রয়েছে, যা সাধারণত চার থেকে ছয় মাসের চাহিদা মেটাতে পারে। কিন্তু কনটেইনারে পরিবহন করা পণ্য, যেমন তাজা খাবার, ওষুধ এবং গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে এ ধরনের মজুত নেই।

এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় কনটেইনার বন্দর জেবেল আলি। বছরে প্রায় ২ কোটি ২০ ফুট সমতুল্য ইউনিট বা টিএফইউ কনটেইনার পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে এই বন্দরের। কিন্তু বন্দরটিও উপসাগরের ভেতরেই অবস্থিত। হরমুজ প্রণালির বাইরে সবচেয়ে বড় কনটেইনার বন্দর হলো জেদ্দা, যার ধারণক্ষমতা ৭৫ লাখ টিএফইউ। যুদ্ধ শুরুর আগেই বন্দরটি প্রায় সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চলছিল বলে জানিয়েছেন তথ্য-উপাত্তভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কেপলারের কর্মকর্তা অ্যালেক্সিস এলেন্ডার।

দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ বলছে, এসব কারণে ইরান আরও কিছু সময় হরমুজ প্রণালিকে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে এবং এর মাধ্যমে অর্থও উপার্জন করতে পারবে। উপসাগরীয় দেশগুলোর হরমুজ-নির্ভরতার মাত্রা একেক রকম। ফলে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার জন্য তারা কতটা চাপ বা ইরানের শর্ত মেনে নেবে, সে ব্যাপারে তাদের অবস্থানও আলাদা হতে পারে।

কাতার ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা সাময়িক ফি বা শুল্ক মেনে নিতে পারে। অন্য কয়েকটি দেশ তুলনামূলক কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তবে এখন এমনকি কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাতও কিছুটা নরম হয়েছে। তারা আবার ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য শুরু করছে এবং দুই দেশের কূটনীতিকরাও আলোচনা করছেন।

ইরান কত টাকা আয় করতে পারে?

ধরা যাক, ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারল। তাহলে এই প্রণালি থেকে ইরান কত অর্থ আয় করতে পারে? জুন মাসে ইরানের এক এমপি দাবি করেছিলেন, প্রতিটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় ইরান ১৫ লাখ থেকে ২০ লাখ ডলার আদায় করছে। যদি যুদ্ধের আগের তুলনায় জাহাজ চলাচল প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যায়ে থাকে, তাহলে এই হিসাবে ইরানের বার্ষিক আয় ৩৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হওয়ার কথা।

এই অঙ্কটি চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতো। কিন্তু বাস্তবে এটি খুবই অসম্ভব। বন্দুকের মুখে নির্ধারণ করা কোনো শুল্ক, বিশেষ করে এমন একটি বাজারে যেখানে বিকল্প পথ প্রায় নেই, এমন উচ্চ পর্যায়ে দীর্ঘদিন টিকে থাকবে না। যদি কোনো সমঝোতার মাধ্যমে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে এই ধরনের ফি টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

জুনে ইরানের পার্লামেন্টে জমা দেওয়া এক খসড়া আইনে বলা হয়েছে, ফি নির্ধারণ করা হবে পণ্যের পরিমাণ, পণ্যের মূল্য এবং জাহাজের ধরন অনুযায়ী। তবে একটি সীমা থাকবে। ফি এমন হতে পারবে না, যা বিকল্প হিসেবে থাকা পরবর্তী সেরা পথ ব্যবহার করার খরচের চেয়ে বেশি হয়।

জাহাজের মালিক বা চার্টারকারী প্রতিষ্ঠানের জাতীয়তার ওপর ভিত্তি করেও ফি আলাদা হতে পারে। সার্বভৌম-ঝুঁকি বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান জিএসএসআই-এর শাহিন ইরানিনেজাদ উল্লেখ করেছেন, আরেকটি আইন প্রস্তাবে ইরানের জলসীমায় গড়ে প্রতি টনে ৩ ইউরো এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রতি টনে ২ ইউরো ফি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থা থেকে ইরানের বার্ষিক আয় হতে পারে তুলনামূলকভাবে কম, অর্থাৎ ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার।

বিকল্প পরিবহন সক্ষমতা যত বাড়বে, এই আয়ও কমবে। তবে সব ধরনের জাহাজের ক্ষেত্রে তা একই হারে কমবে না। অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড বহনকারী ট্যাংকারগুলো হয়তো খুব দ্রুত কম ফিতে চলাচলের সুযোগ পাবে। কিন্তু তেলজাত পণ্য, এলএনজি এবং বাল্ক কার্গো বহনকারী জাহাজগুলোকে আরও বহু বছর তুলনামূলক বেশি ফি দিতে হতে পারে।

এই আয় দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে কি না, তা নির্ভর করবে জাহাজ চলাচলকারী কোম্পানিগুলো ইরানের ফি দিতে কতটা সক্ষম এবং কতটা ইচ্ছুক, তার ওপর। শিপিংবিষয়ক সাময়িকী লয়েডস লিস্টের রিচার্ড মিডের মতে, যতক্ষণ ফিগুলো পূর্বানুমানযোগ্য, সহজে পরিশোধযোগ্য এবং যুদ্ধঝুঁকির কারণে বাড়তি যে বীমা বা ঝুঁকি-খরচ দিতে হয়, তার চেয়ে কম থাকবে, ততক্ষণ অনেক জাহাজ কোম্পানিই সম্ভবত এই ফি দিতে রাজি থাকবে।

কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যাবে যদি একের পর এক জাহাজ ইরানকে ফি না দিয়েই হরমুজ প্রণালি পার হয়ে যেতে সক্ষম হয়।

এখানেই একটি বড় দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

ইরানের এই ফি আদায়ের ব্যবস্থা কার্যকর রাখতে আমেরিকার সঙ্গে শান্তি দরকার। কিন্তু একই সময়ে ফি দিতে অস্বীকার করা ট্যাংকারগুলোকে বাধ্য করতে ইরানকে হামলার হুমকি বা হামলা চালিয়ে যেতে হবে। আর সেটিই আবার আমেরিকার সঙ্গে শান্তি বজায় রাখা কঠিন করে তুলতে পারে।

তবে ইতিবাচক দিকও আছে।

ইরান হয়তো প্রয়োজনের তুলনায় আরও দ্রুত ফি কমিয়ে দিতে পারে। রিচার্ড মিডের মতে, ইরানের কৌশলগত লক্ষ্য সম্ভবত সর্বোচ্চ অর্থ উপার্জন করা নয়। বরং লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের অংশগ্রহণ বজায় রাখা এবং হরমুজ প্রণালির প্রবেশদ্বারের নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিজের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা।

তবে আরও হতাশাজনক একটি সম্ভাবনাও রয়েছে।

ইরান হয়তো আরও দীর্ঘস্থায়ী কিছু চায়। যেমন ওমানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কোনো কাঠামো, একটি সামুদ্রিক সেবা-ভিত্তিক ব্যবস্থা অথবা জাহাজ চলাচলের জন্য অনুমতিপত্র বা পারমিট ব্যবস্থা। ইরান যেভাবে এত সহজে হরমুজ প্রণালিকে নতুন একটি কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত করতে পেরেছে, তাতে তার প্রতিপক্ষরা বিস্মিত হয়েছে। যুদ্ধ শেষ হলেও হরমুজের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব শেষ হয়ে যাবে না। বরং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের এই দখল যুদ্ধের পরও দীর্ঘদিন টিকে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড় দিতে বাধ্য করতে যেভাবে চাপ বাড়াচ্ছে ইরান

ইসরায়েলি লবি: ট্রুম্যান থেকে ট্রাম্প, ওয়াশিংটনকে নাকে দড়ি দিয়ে যেভাবে ঘোরায় তেল আবিব

‘গুপ্তচরের স্বর্গরাজ্য’ জাপান বানাল কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা, ৮০ বছর পর কেন এই পরিবর্তন

ক্রিপ্টো, জুয়া আর নিষেধাজ্ঞার গোলকধাঁধায় ইরানের পকেটে ৪ বিলিয়ন ডলার

জর্ডান পিটারসনের নিবন্ধ: ‘জলবায়ু পরিবর্তন বিপর্যয়বাদ’ পুঁজিবাদকে ধ্বংস করার একটি বামপন্থী হাতিয়ার

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সীমিত সংঘাত বজায় রাখা কেন ইরানের জন্য লাভজনক

এবারই প্রথম—হামলায় বিরতি দিল যুক্তরাষ্ট্র, আর শুরু করল ইরান

ইরানকে শান্ত করতে পারবে কি চীন

মার্কিন হামলা সাময়িক বন্ধের পরও ইরান কেন নিজেই যুদ্ধ বাড়াচ্ছে

ইরান যুদ্ধে রাশিয়ার সহায়তার বিষয়ে এখনো নীরব ট্রাম্প