শেখ হাসিনা ও তাঁর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে ছাত্রদের আন্দোলন দমন করতে গিয়ে ব্যাপক সহিংসতার অভিযোগ নিয়ে দেশ ছাড়েন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই ঘটনার এক বছর পর এই নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনা শুধু দেশের ভেতরেই নয়, এতে নজর রাখছে প্রতিবেশী তিন শক্তিধর দেশ—ভারত, চীন ও পাকিস্তান।
বর্তমানে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে। চলতি মাসের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। জানুয়ারির শেষ দিক থেকেই দুই দলই আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছে।
ছাত্র আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান এবং সহিংস অভিযানের কারণে আওয়ামী লীগকে এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ওই দমন অভিযানে প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হন। দলটির সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। গত নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে (অনুপস্থিতিতে) মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। তবে ভারত এখনো তাঁকে প্রত্যর্পণে সম্মত হয়নি।
এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের গ্লোবাল স্টাডিজ অ্যান্ড গভর্ন্যান্স বিভাগের প্রভাষক খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ান বলেন, ‘শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, পাকিস্তানের সঙ্গে দূরত্ব এবং চীনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব—এই তিনটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট ছিল। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই বিন্যাস উল্টে গেছে বা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে।’
তাঁর মতে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে নিম্নমুখী হলেও পাকিস্তানের সঙ্গে উষ্ণতা বেড়েছে এবং চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।
শেখ হাসিনার পতনের আগে পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখত। এশিয়ায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারও ভারত।
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে ভারত বাংলাদেশে প্রায় ১১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। এর মধ্যে ছিল বস্ত্র, চা, কফি, বিদ্যুৎ, কৃষিপণ্য, লোহা-ইস্পাত ও প্লাস্টিক। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারত আমদানি করে প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক ও চামড়াজাত পণ্য।
তবে হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর দুই দেশই স্থল ও নৌপথে একে অপরের রপ্তানিতে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে কোন দল ক্ষমতায় রয়েছে, তার ওপর নির্ভর করেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উত্থান-পতন ঘটেছে। সেই সূত্রে শেখ হাসিনা (১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-২০২৪) বরাবরই ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।
২০২০ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ‘গত পাঁচ-ছয় বছরে ভারত ও বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি সোনালি অধ্যায় রচনা করেছে।’
তবে বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দল প্রায়শই হাসিনার সমালোচনা করে বলেছে, তিনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘অত্যন্ত দুর্বল’ অবস্থান নিয়েছিলেন।
২০২৪ সালে হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব জোরালো হয়। বিশেষ করে, ভারত হাসিনাকে ফেরত না পাঠানোয় ক্ষোভ বাড়ে।
সম্প্রতি ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও প্রকাশ্য ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী কণ্ঠ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে ভারতবিরোধী বিক্ষোভ হয়। একই সময়ে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তোলে ভারত।
গত ডিসেম্বরে ভালুকায় এক হিন্দু যুবককে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় সরানোর অনুরোধ জানালে আইসিসি বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকেই বাদ দেয়। এর প্রতিবাদে পাকিস্তান জানায়, তারা ভারতের বিপক্ষে নির্ধারিত ম্যাচ খেলবে না।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘শেখ হাসিনার পতনে ভারত বড় ধরনের কৌশলগত ক্ষতির মুখে পড়েছে। দিল্লি মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকার জামায়াতসহ ধর্মীয় শক্তির প্রভাবাধীন, যা ভারতের স্বার্থের জন্য হুমকি।’
তবে উত্তেজনার মধ্যেই গত বছর ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে নরেন্দ্র মোদি ও মুহাম্মদ ইউনূসের প্রথম বৈঠক হয়। সেখানে মোদি বলেন, ভারত একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পক্ষে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কুগেলম্যান বলেন, ‘ভারত চায় এমন একটি সরকার ক্ষমতায় আসুক, যারা ভারতের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হবে এবং ভারতের দৃষ্টিতে হুমকি সৃষ্টি করে—এমন শক্তির বলয়ে থাকবে না।’ তবে তিনি মনে করেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে ভারত গ্রহণযোগ্য মনে করবে। জামায়াত ক্ষমতায় এলে দিল্লির উদ্বেগ বাড়বে।
তবে ভারত উভয় পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছে। জানুয়ারিতে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। অন্যদিকে, জামায়াত আমির শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, গত ডিসেম্বরে এক ভারতীয় কূটনীতিক তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেন।
শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে উষ্ণ হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
২০২৪ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দুই দফা সাক্ষাৎ করেন। এসব বৈঠকে সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ঢাকা সফর করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে চলা সম্পর্ককে ‘পুনরুজ্জীবিত’ করাই ছিল এ সফরের মূল উদ্দেশ্য।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে। সে সময় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান গঠিত হয় দুটি ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন অংশ নিয়ে—পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানই পরে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারত বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেয়। ওই যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানো, শত সহস্র মানুষ হত্যার পাশাপাশি আনুমানিক দুই লাখ নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় বাংলাদেশ এখনো পাকিস্তানের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানিয়ে আসছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে আলোচনার মাধ্যমে ১৯৭১ সালের পর প্রথমবারের মতো দুই দেশ সরাসরি বাণিজ্য পুনরায় শুরু করে। গত সপ্তাহে ১৪ বছর পর ঢাকা-ইসলামাবাদ সরাসরি বিমান চলাচলও চালু হয়েছে। ২০১২ সালে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে এই ফ্লাইট বন্ধ করা হয়েছিল। গত এক বছরে দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও প্রতিরক্ষা সংলাপও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ান বলেন, ‘পাকিস্তান মূলত প্রতিরক্ষা ও সাংস্কৃতিক কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। বাস্তবতা হলো, নিজস্ব অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে দেওয়ার মতো খুব বেশি কিছু তাদের নেই। এমন পরিস্থিতেও ঢাকার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গভীর করার মাধ্যমে পাকিস্তান মূলত ভারতের পূর্ব সীমান্তে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ বাড়াতে চায়।’
রেজওয়ান আরও বলেন, ‘হাসিনার পতন নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও, বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিবর্তন থেকে সুযোগ নিতে চায় ইসলামাবাদ। এ ছাড়া ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গণহত্যার অন্ধকার ইতিহাসকে আড়াল করতে বাংলাদেশে বাড়তে থাকা ভারতবিরোধী ও ইসলামপন্থী অনুভূতিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে পাকিস্তান। আর বাংলাদেশ-চীন-পাকিস্তান—এই ত্রিপক্ষীয় আঞ্চলিক জোট গঠনের ধারণার অন্যতম প্রবক্তাও পাকিস্তান। তবে এ বিষয়ে এখনো ঢাকার স্পষ্ট আপত্তি রয়েছে।’
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, আসন্ন নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, পাকিস্তান তাতে মোটামুটি সন্তুষ্ট থাকবে। তবে জামায়াতে ইসলামীর জয় হলে সেটিই হবে তাদের সবচেয়ে পছন্দের ফল।
কুগেলম্যান বলেন, ‘আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে একমাত্র পাকিস্তানই জামায়াতের সরকারকে স্বাগত জানাবে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার হলেও পাকিস্তানের আপত্তি থাকবে না। তবে ইসলামাবাদ চাইবে, বিএনপি যেন ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের পথে না হাঁটে। এতে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
তবে কুগেলম্যান এও বলেন, ‘জামায়াত ক্ষমতায় এলে কেবল পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই। জামায়াত ইসলামাবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখলেও নিজেদের স্বার্থে নয়াদিল্লির সঙ্গেও বোঝাপড়ায় যেতে পারে।’
অন্যদিকে বিএনপির অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভিন্ন বলে মনে করেন তিনি। কুগেলম্যান বলেন, বিএনপি পাকিস্তানের সঙ্গে সব সহযোগিতার পথ খোলা রাখবে, কিন্তু ইসলামাবাদের দিকে অতিরিক্তভাবে ঝুঁকবে না। তাদের নীতি স্পষ্ট—‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। অর্থাৎ জাতীয় স্বার্থই সবার আগে, কোনো একটি বিদেশি শক্তির পেছনে অন্ধভাবে না গিয়ে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বেইজিং।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় চীন পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিলেও ১৯৭৫ সালের পর থেকে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরপর থেকে ক্ষমতায় যে দলই থাকুক না কেন, ঢাকার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে বেইজিং।
শেখ হাসিনার শাসনামলে দুই দেশ একাধিক অর্থনৈতিক চুক্তি সই করে। সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন চীন থেকে প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদান নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন থেকে আরও বিনিয়োগ আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের চাপ সামলাতে কক্সবাজার এলাকায় সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে চীন। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা কয়েক লাখ রোহিঙ্গার কারণে ওই অঞ্চলের অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।
গত বছর চীন সফরের সময় ড. ইউনূস যুদ্ধবিমান কেনা নিয়ে আলোচনা করেছেন বলেও জানান। যদিও এখনো এ বিষয়ে কোনো চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি।
তাহমিদ রেজওয়ান বলেন, ‘শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতিকে চীন বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর বেইজিং উষ্ণভাবে তাদের স্বাগত জানায় এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রথম দিকেই সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।’
তিনি আরও বলেন, চীনের এই ‘চার্ম অফেনসিভ’-এর ফলে ঢাকার অন্তর্বর্তী সরকার বেইজিংয়ের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও জোরদার করেছে।
‘হাসিনার আমলে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক শক্তিশালী ছিল, আর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তা আরও গভীর হয়েছে। নির্বাচনের পর যে-ই ক্ষমতায় আসুক না কেন, এই সম্পর্ক দৃঢ়ই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, ’ যোগ করেন তিনি।
বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে চীন বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছে। গত এক বছরে চীনা নেতারা বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন।
গত বছরের এপ্রিলে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। একই বছরের জুনে চীনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সুন ওয়েইডং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বৈঠক করেন। উভয় বৈঠকেই আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়।
মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদার হিসেবে দেখে চীন। তাই তারা নির্বাচন পরিস্থিতি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করবে।’
তাঁর মতে, বেইজিংয়ের কাছে ঢাকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশে চীনের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে।
‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা নিরাপত্তাজনিত কোনো সমস্যা যেন চীনা স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে—এটাই চীনের মূল লক্ষ্য, ’ বলেন তিনি।
রেজওয়ান বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের দিক থেকেও বাংলাদেশের নির্বাচন চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে ভারতের প্রভাববলয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
তিনি বলেন, ‘ভারতের মতো চীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। বরং হাসিনার শাসনের সময়েও বিএনপি ও জামায়াতের মতো দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে বেইজিং।’
তবে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে চীনের কোনো নির্দিষ্ট পছন্দ নেই বলে মনে করেন তিনি। রেজওয়ান বলেন, ‘যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করবে, চীন তাদের পূর্ণ সমর্থন দেবে। পাশাপাশি অন্যান্য প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রাখবে। চীন অন্তর্ভুক্তিমূলক সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘চীনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে—নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের ওপর যেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তার না ঘটে।’
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, বাংলাদেশের আঞ্চলিক কূটনীতির দিকনির্দেশও নির্ধারণ করবে। ভারত চায় সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে, পাকিস্তান সুযোগ নিতে চায়, আর চীন চায় স্থিতিশীলতা বজায় রেখে প্রভাব বিস্তার অব্যাহত রাখতে।
ফলে ঢাকার পরবর্তী সরকারকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি এই তিন শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করেই এগোতে হবে—এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আল জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা