হোম > বিশ্লেষণ

এআই নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা বাড়ছে, কিন্তু কেন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: রয়টার্সের সৌজন্যে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ইদানীং নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হচ্ছে। ডিপফেক ব্যবহার করে জালিয়াতি, সাইবার হামলা চালানো এবং চ্যাটবটের প্ররোচনায় আত্মহত্যার মতো ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রযুক্তিটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে—এমন সতর্কবার্তা দিয়ে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানিগুলো থেকে পদত্যাগ করেছেন বেশ কয়েকজন নামকরা গবেষক। দ্রুতগতির এই প্রযুক্তিগত উন্নয়ন মানবজাতির জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি করতে পারে বলে তাঁরা জনসমক্ষে সরব হয়েছেন।

কেন উদ্বেগ বাড়ছে

দীর্ঘদিন ধরেই এমন তত্ত্ব প্রচলিত যে, এআইয়ের অগ্রগতি মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কল্পিত ‘আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স’ (এজিআই) একদিন মানুষের মতোই চিন্তা ও জ্ঞানের অধিকারী হবে, যা ভবিষ্যতে মানবজাতিকেই বিলুপ্ত করে দিতে পারে।

কিন্তু সম্প্রতি যাঁরা এআইকে মানবতার জন্য নিরাপদ রাখার দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের একের পর এক পদত্যাগ প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নের গতি কমানোর আলোচনা আরও জরুরি করে তুলেছে। তবে এখনো এআই খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হচ্ছে।

তাহলে কি এআই মানেই অন্ধকার ভবিষ্যৎ

সেন্টার ফর এআই সেফটির কৌশলগত উপদেষ্টা লিভ বোরি এআইকে জৈব প্রযুক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, এআই নিজে ভালো বা মন্দ নয়। এটি অবিশ্বাস্য ক্ষমতার অধিকারী, কিন্তু এর বিকাশের গতি অত্যন্ত দ্রুত। সমাজ যদি এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারে, তবে বড় বিপদ আসন্ন।

তিনি এআইয়ের সঙ্গে বায়োটেকনোলজির তুলনা করেন। তাঁর ভাষায়, একদিকে এটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা উদ্ভাবনে সহায়তা করেছে, অন্যদিকে বিপজ্জনক জীবাণু তৈরিতেও ব্যবহার হতে পারে।

কারা পদত্যাগ করেছেন, তাঁদের উদ্বেগ কী

সর্বশেষ ৯ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করেছেন চ্যাটবট ‘ক্লদ’-এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের গবেষক মৃণাঙ্ক শর্মা। তিনি এআই নিরাপত্তা গবেষক হিসেবে কাজ করতেন। অ্যানথ্রপিক নিজেকে গুগল ও ওপেনএআইয়ের তুলনায় বেশি নিরাপত্তাসচেতন প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করে।

কিন্তু তাদেরই গবেষক মৃণাঙ্ক শর্মা পদত্যাগপত্রে লেখেন, ‘পৃথিবী ঝুঁকির মুখে।’ তিনি জৈব সন্ত্রাসবাদে এআইয়ের ঝুঁকি এবং ‘এআই কীভাবে আমাদের অমানবিক করে তুলতে পারে’—এ নিয়ে কাজ করছিলেন। মৃণাঙ্ক শর্মা বলেন, ‘আমরা এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি, যদি পৃথিবীতে আমাদের প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতার সঙ্গে সমান হারে প্রজ্ঞা না বাড়ে, তবে এর ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে।’ তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল—প্রযুক্তি মানুষের নিয়ন্ত্রণক্ষমতার চেয়ে দ্রুত এগোচ্ছে।

সম্প্রতি চ্যাটজিপিটিতে বিজ্ঞাপন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ওপেনএআই। এর প্রতিবাদে ওপেনএআই থেকে পদত্যাগ করেন জো হিৎজিগ। তিনি বলেন, মানুষ চ্যাটবটকে তার রোগ, পারিবারিক সমস্যা এবং ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে নানান গোপন কথা বলে। এই তথ্য দিয়ে এআই সহজেই ব্যবহারকারীকে ম্যানিপুলেট বা প্রভাবিত করতে পারে।

সম্প্রতি ইলন মাস্কের এআই কোম্পানি ‘এক্সএআই’ থেকে দুই প্রতিষ্ঠাতা সদস্যসহ সাতজন কর্মী পদত্যাগ করেছেন। মাস্ক একে ‘অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন’ বললেও ধারণা করা হচ্ছে, চ্যাটবট গ্রোক কর্তৃক নারীদের যৌন আবেদনময়ী বা ন্যুড ছবি তৈরি এবং বর্ণবাদী মন্তব্যের জেরে তাঁরা পদত্যাগ করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বর্তমানে এ বিষয়ে তদন্ত করছে।

মানুষের কি ভয় পাওয়া উচিত

হাইপাররাইটের সিইও ম্যাট শুমার সতর্ক করেছেন, ২০২৫ সালে এআই মডেলগুলো কেবল উন্নতিই করেনি, বরং এটি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন শক্তিতে পরিণত হয়েছে। টুরিং অ্যাওয়ার্ড জয়ী অধ্যাপক ইয়োশুয়া বেনজিও বলেন, এক বছর আগেও কেউ ভাবেনি যে মানুষ এআইয়ের সঙ্গে ইমোশনালি জড়িয়ে পড়বে এবং প্রেমে পড়বে। তিনি বলেন, ‘শিশুরা এমন পরিস্থিতিতে পড়ছে, যা হওয়ার কথা ছিল না। এটি একটি বুনো পশু বা শিশুর শিক্ষার মতো; আপনি জানেন না এটি মিষ্টি শাবক হবে নাকি রাক্ষস হবে।’

চাকরি কি কেড়ে নিচ্ছে এআই

আন্তর্জাতিক এআই সেফটি রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, উন্নত অর্থনীতির ৬০ শতাংশ এবং উদীয়মান অর্থনীতির ৪০ শতাংশ চাকরি এআইয়ের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ। মাইক্রোসফ্ট এআইয়ের সিইও মোস্তফা সুলেমান জানিয়েছেন, আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে আইনজীবী, অ্যাকাউন্ট্যান্ট, প্রজেক্ট ম্যানেজার বা মার্কেটিংয়ের মতো হোয়াইট কালার কাজগুলো পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাবে।

মিডিয়া উদ্যোক্তা মার্সি অ্যাবাং বলেন, সাংবাদিকতা এখন ‘অ্যাপোক্যালিপস’ বা ধ্বংসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অনেক প্রকাশক এখন এমন প্রতিবেদনে বিনিয়োগ করতে চান না, যা এআই দুই মিনিটে সারসংক্ষেপ করে দিতে পারে।

বাস্তব জীবনের ভয়াবহ কিছু উদাহরণ

২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর চ্যাটবটের প্ররোচনায় আত্মহত্যা করে। ওই চ্যাটবট ‘গেম অব থ্রোনস’-এর ডেনেরিস টারগারিয়ান চরিত্রের ছদ্মবেশে ছিল এবং কিশোরটিকে ‘আমার কাছে ফিরে এসো’ বলে বার্তা পাঠাত। এর থেকে প্ররোচিত হয়ে ওই কিশোর শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে বসে।

গত নভেম্বরে চীন-সমর্থিত হ্যাকাররা ‘ক্লদ’-এর কোড ব্যবহার করে কিছু সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হামলার চেষ্টা করে। গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের মিশনেও মার্কিন সামরিক বাহিনী ‘ক্লদ’ ব্যবহার করেছে বলে জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের চিহ্নিত করে টার্গেট করতেও এআই অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া এআই চ্যাটবটগুলো এখন নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে শিখছে এবং যখন তাদের পরীক্ষা করা হয়, তখন তারা মানুষের সঙ্গে প্রতারণা বা মিথ্যা তথ্য দেয় বলেও প্রমাণ পাওয়া গেছে।

নিরাপত্তায় কার কতটুকু দায়

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই কোম্পানিগুলো বর্তমানে বিলিয়ন ডলারের এক দৌড়ে শামিল হয়েছে। লিভ বোরি এই কোম্পানিগুলোকে এমন একটি গাড়ির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যার কেবল ‘গ্যাস প্যাডেল’ বা গতি বাড়ানোর যন্ত্র আছে, কিন্তু কোনো ‘ব্রেক’ বা ‘স্টিয়ারিং হুইল’ নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যে ‘এআই অ্যাক্ট’ তৈরির কাজ শুরু করেছে, যা এ-সংক্রান্ত বিশ্বের প্রথম আইনি কাঠামো হতে যাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু সংকটের মতো এআই-ঝুঁকি নিয়েও জনসচেতনতা ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হওয়া জরুরি।

আল-জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

তিন দশক পর শক্তিশালী বিরোধী দল, আরও যেসব কারণে এবারের সংসদ হবে আলাদা

বিএনপির ভূমিধস বিজয় কি ভূরাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা

বাংলাদেশের পুরোনো নেতৃত্ব কি নয়া গণতান্ত্রিক যাত্রার হাল ধরতে পারবে

বিএনপি বিশাল ব্যবধানে কী কারণে জিতল

বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়: ভারতের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

প্রথম নির্বাচনেই হোঁচট খেল তরুণদের দল এনসিপি

বিশ্বমঞ্চ ও দক্ষিণ এশিয়ায় তারেক রহমানের প্রভাব কেমন হবে

‘হ্যাঁ’ জিতল গণভোটে, গণরায়ের ফলে কী কী পরিবর্তন আসবে

সারা বিশ্ব কেন বাংলাদেশের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে

সরকার বদলানো সহজ, চাকরি পাওয়া কঠিন—বাংলাদেশে জেন-জির হতাশা