নয়াদিল্লিতে গৃহকর্মীর কাজ করেন বাঙালি সীমা দাস। টানা দুই দিনের দীর্ঘ যাত্রায়, মাঝপথে ট্রেন বদলাতে বদলাতে, পশ্চিমবঙ্গে নিজ গ্রামে পৌঁছান। লক্ষ্য একটাই—প্রাদেশিক নির্বাচনে ভোট দেওয়া। আগে, ভোটার হওয়ার পর থেকেই তিনি সবসময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেসকে (টিএমসি) ভোট দিতেন। এবার দেননি।
মধ্যপন্থী এই রাজনৈতিক দল ২০১১ সাল থেকে এই রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল। সীমা জানান, এবার তাঁকে তাঁর শাশুড়ি বুঝিয়েছেন, ‘দিদি’ (মমতার জনপ্রিয় ডাকনাম, যার অর্থ বড় বোন) মুসলমানদের পক্ষপাত করেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বী সীমা দাস বলেন, ‘দিদি পথ হারিয়েছেন। তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকতে শুধু মুসলমানদের তোষণ করেন।’
এই অভিযোগ নতুন নয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দীর্ঘদিন ধরেই টিএমসির বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলে আসছে। টিএমসি ধর্মীয় বহুত্ববাদ ও সংখ্যালঘু অধিকারের সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেয় এবং দিয়েছে। কিন্তু তারপরও গত ১৫ বছর ধরে ৯ কোটির বেশি মানুষের এই রাজ্যে মমতা ও তাঁর দল শাসন করেছে। বিপরীতে এই রাজ্যে বিজেপি আগে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক থাকলেও, তারা ধীরে ধীরে প্রভাব বাড়িয়েছে।
সোমবার সেই প্রভাব বিস্তারের ফলাফলই চিরচেনা চিত্র বদলে দেয়। পশ্চিমবঙ্গে জয় পায় মোদির দল। গত এপ্রিলে দুই ধাপে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হলেও ৪মে গণনা হওয়া বিধানসভা নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, বিজেপির সুসংগঠিত নির্বাচনী যন্ত্র এই রাজ্যে তাদের প্রথম জয়ের জন্য বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে। উল্লেখ্য, বিজেপির আদর্শিক প্রতিষ্ঠাতার শিকড় এই রাজ্যে হলেও, তারা আগে কখনও এখানে জিততে পারেনি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ২০৬টি এবং তৃণমূল ৮১টি আসনে জয়লাভ করেছে।
গতকাল সোমবার আরও চারটি বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়। দক্ষিণের তামিলনাড়ুতে অভিনেতা জোসেফ বিজয় বা থালাপতি বিজয় চমক দেখিয়ে নিজের দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগামকে (টিভিকে) নিয়ে জয় ছিনিয়ে এনেছে। প্রভাবশালী দলগুলোকে হারিয়ে জয় পেলেও তাঁর দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। সরকার গঠনে তাদের কিছু আসন বাকি রয়েছে। পাশের কেরালা রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস বাম দলগুলোর জোটকে পরাজিত করেছে। সাবেক ফরাসি উপনিবেশ পুদুচেরিতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট জয়ী হয়। আর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসামে মোদির দল বড় ব্যবধানে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ফল এসেছে পশ্চিমবঙ্গ থেকেই। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ধর্মীয় মেরুকরণের পথ অনুসরণ এবং সরকারবিরোধী ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েই বিজেপি এই জয় পেয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৯৮ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস ছেড়ে টিএমসি গঠন করেন। কারণ ছিল, ১৯৭৭ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ শাসন করা কমিউনিস্ট জোটের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের অনীহা। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই রাজনীতিবিদ ২০১১ সালে কমিউনিস্টদের পরাজিত করে ক্ষমতায় আসেন। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর, তিনি বিজেপির অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে বাংলার মুসলমানদের রক্ষার প্রশ্নে তাঁর রাজনীতি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
নারীকেন্দ্রিক নানা কল্যাণমূলক কর্মসূচি চালু করেন তিনি। পাশাপাশি বড় শিল্পগোষ্ঠীর জন্য বিতর্কিত ভূমি অধিগ্রহণ প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধেও অবস্থান নেন। চেন্নাইয়ের শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি শিক্ষক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক রাহুল ভার্মা বলেন, ‘মমতার প্রতি দৃশ্যমান সমর্থন আছে, তিনি এখনও জনপ্রিয়। কিন্তু টিএমসির সাংগঠনিক কাঠামোর বিরুদ্ধে জনরোষও রয়েছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তাদের হস্তক্ষেপে অসন্তোষ ছিল।’
তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচনে বিজেপির প্রচার অনেক বেশি সুসংগঠিত ছিল। তাঁর মতে, ‘এই ফলাফল আমাকে বিস্মিত করেনি। এটি বিজেপির জন্য কঠিন নির্বাচন ছিল, কিন্তু অসম্ভব নয়।’ ভার্মার মতে, ‘পশ্চিমবঙ্গে তাদের জন্য একটি করিডর তৈরি হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত সবকিছু এমনভাবে মিলে গেছে, যা এই ফলাফল এনে দিয়েছে।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘গভীর সরকারবিরোধী মনোভাব না থাকলে এমন ফল হতো না।’
এই নির্বাচনে প্রায় ৬ কোটি ৮২ লাখ মানুষ ভোট দেন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৯২ দশমিক ৯৩ শতাংশ—রাজ্যের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অবশ্য এই নির্বাচনের কয়েক মাস আগেই প্রায় ৯১ লাখ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। যার মধ্যে ২৭ লাখ ভোটারের নাম স্থায়ীভাবে বাদ পড়েছে, এবং বাকিদের তালিকার বিষয়ে বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালে আপিল চলছে।
নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটিজের রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রবীণ রাই বলেন, টিএমসি ভোটারদের সামনে নতুন কিছু তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে এবং তীব্র সরকারবিরোধী মনোভাব মোকাবিলা করতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘দলীয় কাঠামো এমন হয়ে উঠেছিল, যা ভিন্নমতের মানুষের জন্য প্রতিকূল ছিল। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও আকাঙ্ক্ষার ক্রমবর্ধমান চাপ তারা বুঝতে পারেনি।’ রাই আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গে এই পরাজয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জাতীয় পর্যায়ে নরেন্দ্র মোদির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসার সম্ভাবনাকেও দুর্বল করে দিয়েছে।
তবে এর প্রভাব শুধু মমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিজেপির এই জয় এবং টিএমসির বড় পরাজয় মোদিবিরোধী অন্যান্য দলগুলোর রাজনৈতিক পুঁজি কমিয়ে দেবে। মাত্র দুই বছর আগেও চিত্র ভিন্ন ছিল। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে মোদির দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, ফলে জোটসঙ্গীদের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। কিন্তু সোমবারের এই জয়গুলো সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছে।
প্রবীণ রাই বলেন, ‘এটি মোদির নেতৃত্বের জাতীয় অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে এবং ভারতে শাসনের ক্ষেত্রে বিজেপির প্রভাবশালী ক্ষমতাকে বিস্তৃত করবে।’
নয়াদিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের সিনিয়র ফেলো নীলাঞ্জন সরকার নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে ভ্রমণ করেন। তিনি জানান, তাঁর দল ভোটারদের পছন্দে ‘বড় ধরনের শহর-গ্রাম বিভাজন’ শনাক্ত করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দেখেছি শহুরে পুরুষরা অত্যন্ত মেরুকৃত। বাংলায় মুসলিম জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করে এবং এই মেরুকরণের মাত্রা বিবেচনায় ফলাফল বিজেপির পক্ষে বড় পার্থক্য তৈরি করেছে।’
নির্বাচন বিশ্লেষকেরা যুক্তি দিয়েছেন, ঐতিহাসিকভাবে বিজেপির হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতির কারণে দলটির পশ্চিমবঙ্গে জয়ের কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। রাজ্যের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি মানুষ মুসলিম। তবে সরকার বলেন, ‘কিন্তু সেটি যে সত্যি হয়নি, সেটি আমরা আমাদের গবেষণার সময়ই বুঝতে পেরেছিলাম।’
বিজেপি নিজেকে হিন্দু ভোটারদের দল হিসেবে তুলে ধরতে কোনো দ্বিধা করেনি। রাজ্য বিজেপির নেতা এবং সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘হিন্দু ভোটের একটি সংহতি তৈরি হয়েছে।’ তবে তিনি দাবি করেন, অনেক মুসলিমও আগের মতো তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দেননি, বরং বিজেপির দিকে ঝুঁকেছেন। তবে এই দাবি যাচাই করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে, যতক্ষণ না ভারতের নির্বাচন কমিশন ভোটের বিস্তারিত ফলাফল প্রকাশ করছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ফলাফল ও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে।
শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আমি প্রত্যেক হিন্দু সনাতনীকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, যারা বিজেপির পক্ষে ভোট দিয়েছেন।’ তিনি মমতার টিএমসিকে ‘মুসলিমপন্থী দল’ বলে উল্লেখ করেন। পশ্চিমবঙ্গে এই জয় বিজেপির জন্য গভীর প্রতীকী গুরুত্বও বহন করে। ১৯৫১ সালে ভারতীয় জনসংঘ (বিজেপির পূর্বসূরি) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গেরই সন্তান শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের আগে, ভারতের নির্বাচন কমিশন তথাকথিত বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন–এসআইআর) মাধ্যমে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে। এই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে এক ডজনের বেশি রাজ্যে পরিচালিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এই প্রক্রিয়ায় বিতর্কিতভাবে প্রায় ৯১ লাখ মানুষ—যা রাজ্যের ৭ কোটি ৬০ লাখ ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ—ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েন, ফলে তারা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার হারান।
তাদের মধ্যে প্রায় ৬০ লাখকে অনুপস্থিত বা মৃত হিসেবে ঘোষণা করা হয়, আর বাকি ৩০ লাখ সময় স্বল্পতার কারণে কোনো বিশেষ ট্রাইব্যুনালে নিজেদের মামলা উপস্থাপন করতে না পারায় ভোট দিতে পারেননি। মমতার দল এবং বিভিন্ন রাজ্যের অন্যান্য বিরোধী দল ভোটার তালিকা সংশোধনে অসংগতি তুলে ধরে অভিযোগ করে, নির্বাচন কমিশন মোদির বিজেপির পক্ষ নিচ্ছে। রাজনৈতিক অধিকারকর্মী ও পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, এই প্রক্রিয়ায় মুসলিমরা অসমভাবে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
মমতা ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও হাজির হয়ে এই ‘অস্বচ্ছ, তড়িঘড়ি এবং অসাংবিধানিক’ সংশোধন প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করেন। তবে শীর্ষ আদালত ক্ষতিগ্রস্ত লাখো মানুষের ভোটাধিকার পুনর্বহাল করেনি, বরং নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত ভোটারদের তালিকা প্রকাশের নির্দেশ দেয়।
নীলাঞ্জন সরকার বলেন, ‘যখন ‘আমি ভোটার তালিকায় থাকা উচিত কি না’—এই প্রশ্নটাই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রধান প্রশ্ন হয়ে ওঠে, তখন সেটি আর স্বাভাবিক রাজনীতি থাকে না। এই সংশোধন যে মাত্রার মেরুকরণ তৈরি করেছে, রাজ্যের বাইরের মানুষ তা পুরোপুরি বোঝে না।’
নির্বাচনের সময় মোদি সরকার পশ্চিমবঙ্গে ২ হাজার ৪০০ কোম্পানি আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করে। ভারতের ইতিহাসে প্রাদেশিক নির্বাচনের সময় এটি বিশাল রেকর্ড। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কা ছাড়াই নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তার জন্যই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু টিএমসি ও অন্যান্য বিরোধী দলের দাবি, এই বাহিনী ভোটারদের ভয় দেখাতে বা প্রভাবিত করতে ব্যবহৃত হয়েছে।
শিব নাদার ইউনিভার্সির গবেষক ভার্মা বলেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি বিজেপির পক্ষে অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করে থাকতে পারে। যারা দ্বিধায় ছিলেন এবং মাঠপর্যায়ে টিএমসির প্রভাব নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন, তারা এতে প্রভাবিত হয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভারতে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের আস্থার সম্পর্ক খুবই দুর্বল।’
তবে নীলাঞ্জন সরকার ও রাহুল ভার্মাসহ বিশ্লেষকেরা একমত যে, শুধুমাত্র ভোটার তালিকা সংশোধনই বিজেপির এত বড় জয় নিশ্চিত করতে পারেনি। এর পেছনে আরও নানা কারণ রয়েছে, যেমন সরকারবিরোধী মনোভাব (অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি) এবং ধর্মীয় মেরুকরণ। তবুও বিশ্লেষকেরা মনে করেন, মমতা এত সহজে হাল ছাড়বেন না।
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান