হোম > বিশ্লেষণ

১০ দিনে ৪ মহাদেশে ৪ নির্বাচন, বড় পরীক্ষার মুখে গণতন্ত্র

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

আগামী ১০ দিনের ব্যবধানে চার মহাদেশে অনুষ্ঠিত হবে চারটি নির্বাচন। ধারণা করা হচ্ছে, এই চার নির্বাচন বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এসব নির্বাচনের ফল বিশ্বকে আরও কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ঠেলে দেবে, নাকি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনরুত্থান ঘটাবে—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। চার দেশেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মৌলিক বিষয়গুলোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সুইডেনভিত্তিক ভি-ডেম ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে একজন ব্যক্তি (গড়ে) যে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ভোগ করছেন, তা ১৯৯১ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতন এবং ইউরোপে কমিউনিজম বা সাম্যবাদ পতনের বহু আগের অবস্থায়, অর্থাৎ ১৯৭৮ সালের স্তরে নেমে গেছে। চার মহাদেশের চারটি নির্বাচন এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে নয়তো আরও খারাপ করতে পারে। প্রতিটি দেশেই গণতন্ত্রপন্থী দল বা আন্দোলনের সঙ্গে বর্তমান অথবা সম্ভাব্য কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। তাই একটি দেশের নির্বাচনের ফল অন্য দেশ ও অঞ্চলের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এসব দেশের মধ্যে প্রথমেই আছে দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল। আজ রোববার ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ চলছে। নির্বাচনে ডানপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো এগিয়ে আছেন। নির্বাচনে জয়ী হলে সংবিধান পরিবর্তন, তাঁর বাবা জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মামলায় ক্ষমা এবং আমাজন বনাঞ্চল রক্ষার পরিবেশগত বিধিনিষেধ শিথিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ২০২৩ সালের শুরুতে ক্ষমতায় আসার পর ব্রাজিলে গণতন্ত্রের পুনরুত্থান ঘটে। এর আগে ২০২২ সালের নির্বাচনে পরাজিত সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো ফল উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এর দায়ে তাঁকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এখন তাঁর ছেলে ফ্লাভিও দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে লুলার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাবাকে মুক্ত করার পাশাপাশি তাঁর বিচারের সঙ্গে যুক্ত বিচারকদের শাস্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। নির্বাচনে জয়ী হলে ডানপন্থী সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে সংবিধান পরিবর্তনের কথা বলেছেন ফ্লাভিও।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য কঠোর নীতির কথাও বলেছেন তিনি। এর মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সীদের করা অপরাধের দায়ে শাস্তির বয়সসীমা কমানো এবং বিচারব্যবস্থায় সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে। তবে অনেকের আশঙ্কা, তাঁর এসব পদক্ষেপ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হানতে পারে।

ইউরোপের দেশ সার্বিয়ায় আজ রোববার ভোটগ্রহণ চলছে। সার্বিয়ায় প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচের ১২ বছরের শাসন এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এবারের নির্বাচনে তাঁর বিরুদ্ধে লড়ছে ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন একটি দল। ‘সার্বিয়া না মাফিয়া?’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে কিছু শিক্ষাবিদ ও প্রযুক্তিবিদদের নিয়ে প্রার্থী দিয়েছে ছাত্ররা।

ভুচিচের শাসনামলে দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি বা এসএনএস রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয়গুলোকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করছে বলে সমালোচনা রয়েছে। দেশটির সম্প্রচারমাধ্যমের প্রায় সবগুলো চ্যানেলই ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

দুই বছর আগে নোভি সাদের একটি রেলস্টেশনে কংক্রিটের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দেয়। এরপরই ছাত্রদের নেতৃত্বে বড় আন্দোলন গড়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় চাপের মধ্যেও আন্দোলনটি টিকে আছে এবং এবার ক্ষমতাসীন এসএনএসের বিরুদ্ধে সেই ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন দল থেকে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনের সময় এই প্রার্থীরা কিছু বিষয়ে একমত না হলেও দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তাদের জোরালো অবস্থান রয়েছে।

নির্বাচনে ছাত্রদের প্রার্থীরা এগিয়ে গেলে উত্তেজনা ও সহিংসতার আশঙ্কাও রয়েছে। ভুচিচের সমর্থকেরা ইতিমধ্যে লোক ভাড়া করে বিরোধীদের সমাবেশে বাধা দিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

আগামী মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত হবে ইসরায়েলের নির্বাচন। গত ৩০ বছরের মধ্যে প্রায় ১৯ বছর ধরে দেশটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইতিমধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকার চরম ডানপন্থী ও ফিলিস্তিনি বসতি স্থাপনকারীদের সমর্থনপুষ্ট দলগুলোর সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় রয়েছে। সর্বশেষ চার বছরের মেয়াদে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সীমিত করা, স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ এবং পুলিশ, সেনাবাহিনী ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতকে রাজনীতিকরণের অভিযোগ উঠেছে।

এবারের নির্বাচনে সাবেক জেনারেল গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট নেতানিয়াহুর সরকারের চেয়ে বেশি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তাদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে দীর্ঘদিন উপেক্ষিত ফিলিস্তিনি সংখ্যালঘুদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হতে পারে বিরোধীদের।

তবে নেতানিয়াহু গাজা যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে যে অবস্থান নিয়েছেন, বিরোধী জোটের অনেকের অবস্থানও তা–ই। তবে নেতানিয়াহু সরকারের দুর্নীতি ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান চান তাঁরা।

এই সম্ভাব্য ঐতিহাসিক ১০ দিনের শেষ দিকে (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের দুই বছর পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে কংগ্রেসের অন্তত একটি কক্ষ এবং সম্ভবত উভয় কক্ষই ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে কিছু বিতর্কিত নির্বাহী আদেশ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার এবং বিচার বিভাগ ও এফবিআইসহ নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, স্বাধীন কৌঁসুলি ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে।

অভিবাসন ও শুল্কনীতিসহ সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিইকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং অবৈধ অভিবাসী সন্দেহে লাতিনো জনগোষ্ঠীর মানুষের নাগরিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে এবং সিনেট দখলের সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করা সহজ হবে না। প্রেসিডেন্ট ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন এবং তা অতিক্রম করার মতো ভোট ডেমোক্র্যাটদের থাকবে না। সিনেটে রিপাবলিকান ফিলিবাস্টার ঠেকানোর মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতাও তাদের থাকবে না।

উল্লেখ্য, ফিলিবাস্টার হলো আইনসভায় কোনো বিল বা প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি বিলম্বিত বা পুরোপুরি বন্ধ করার কৌশল। এর মাধ্যমে একটি দল দীর্ঘ আলোচনা করে বা সময়ক্ষেপণ করে ভোটাভুটিতে বাধা দেয়।

কংগ্রেসের হাতে সরকারের অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অর্থ বরাদ্দে সংস্কারের শর্ত আরোপ করতে পারে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের দুর্নীতি ও অন্যান্য অনিয়ম নিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারে। তবে প্রশাসন কংগ্রেসের সঙ্গে সহযোগিতা না করলে নতুন করে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।

কেন এই চার নির্বাচন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত

চারটি নির্বাচন ভিন্ন ভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় হলেও তাদের মধ্যে পারস্পরিক যোগসূত্র রয়েছে। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ বা মাগা আন্দোলন নেতানিয়াহু, ভুচিচ ও বলসোনারোর প্রতি প্রকাশ্য রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছে। অন্যদিকে সার্বিয়ার ছাত্র ও গণতন্ত্রপন্থী কর্মীদের ফোনে ইসরায়েলের তৈরি পেগাসাস স্পাইওয়্যার পাওয়ার তথ্যও রয়েছে।

বলসোনারো ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সমর্থক এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনুসরণে ব্রাজিলের দূতাবাস জেরুজালেমে সরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নেতানিয়াহুর যুদ্ধের জন্য বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সরবরাহ করেছে। সার্বিয়াও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ২০০ কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে এবং দুই দেশ নজরদারি ও হামলার সরঞ্জাম তৈরির যৌথ কারখানাও চালু করেছে।

ফলে একটি দেশে কর্তৃত্ববাদী ডানপন্থার জয়, অন্য দেশের একই ধরনের শক্তিকে উৎসাহিত করতে পারে। বিপরীতে চার দেশের কোনো একটিতে গণতন্ত্রপন্থী শক্তির জয় বিশ্বের অন্য প্রান্তের সমমনা আন্দোলনগুলোকে নতুন করে উৎসাহ দিতে পারে।

দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত

ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে জাতিসংঘ: প্রথম নারী মহাসচিবের সম্ভাবনা, প্রার্থী যাঁরা

দেশে দেশে কেন বিদ্রোহ করছে জেন-জি

নিরাপত্তা-সমৃদ্ধি ও সংস্কার: তিন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় সৌদি যুবরাজ

ভারতে ব্যবসা ও বিনিয়োগে জ্যোতিষশাস্ত্রের বাজার এখন ৭০ হাজার কোটি টাকা, কীভাবে হলো

নির্বাচনে এবার নেতানিয়াহুর ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই সহজ নাকি কঠিন

ট্রাম্পকে ‘শায়েস্তা’ করতে চায় ইরান, নিয়েছে যে কৌশল

কিম জং-উনের মৃত্যুর গুজব কেন বারবার ফিরে আসে

ইয়েমেন সংকট ও হুতিদের উত্থান: সৌদির শত বছরের ভুল নীতি যেভাবে বুমেরাং হলো

সৌদি আরবে কোন কোন অপরাধে মৃত্যুদণ্ড হয়—কেন

কলকাতায় পদদলিত হয়ে ১৯ প্রাণহানি: এ ধরনের দুর্ঘটনা কীভাবে ঘটে, প্রতিরোধের উপায় কী