হোম > বিশ্লেষণ

‘লিবিয়া মডেল’ কাজ করছে না ইরানে, বুমেরাং হলো খামেনি হত্যা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মুয়াম্মার গাদ্দাফি, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু একটি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে: খামেনির অনুপস্থিতি কি ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাবে? পশ্চিমা শক্তিগুলোর কৌশল দেখে মনে হচ্ছে, তারা লিবিয়ার গাদ্দাফি বা সিরিয়ার আসাদ মডেলের পুনরাবৃত্তি আশা করছে, যেখানে নেতার পতন মানেই রাষ্ট্রের পতন। কিন্তু ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের গবেষক আলি হাশেমের বিশ্লেষণ এবং ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ইরানের ইসলামিক রিপাবলিক কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত ‘প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা’, যা যেকোনো আকস্মিক ধাক্কা সামলে টিকে থাকার জন্য নির্মিত।

ইরানের শাসনব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতার হাতে প্রভূত ক্ষমতা থাকলেও এটি পুরোপুরি এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়। এই ক্ষমতা একটি নিশ্ছিদ্র প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্র কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যেখানে ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্র বা ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ রক্ষা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। খোমেনির সেই বিখ্যাত ‘ইসলামিক রিপাবলিক রক্ষা করা ইমাম মাহদির জীবনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ উক্তিটি আজও ইরানি শাসকশ্রেণির মূলমন্ত্র। এই দর্শনের কারণে ইরান গত কয়েক দশকে একাধিক শীর্ষ নেতার মৃত্যু বা হত্যাকাণ্ড সত্ত্বেও স্থিতিশীল থেকেছে।

সংকটে উত্তরণের সাংবিধানিক সুরক্ষা ইরানের সংবিধানে নেতৃত্ব শূন্যতা পূরণের স্পষ্ট রোডম্যাপ রয়েছে। সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি সর্বোচ্চ নেতা মারা যান বা দায়িত্ব পালনে অক্ষম হন, তবে ক্ষমতা অবিলম্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিলের কাছে হস্তান্তরিত হয়। এই কাউন্সিলে থাকেন প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন জ্যেষ্ঠ আলেম। ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির আকস্মিক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং পরবর্তী দ্রুত নির্বাচন প্রমাণ করেছে, সংকটের সময় ইরানের প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত কার্যকরভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে।

প্রতিষ্ঠানগুলোর ভারসাম্য ও নজরদারি ইরানের ক্ষমতা কাঠামোতে গার্ডিয়ান কাউন্সিল, অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস এবং এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের মতো সংস্থাগুলো একে অপরের ওপর নজরদারি করে। অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস সর্বোচ্চ নেতাকে নির্বাচন ও তদারক করে, যা ক্ষমতা এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক হওয়া রোধ করে। ফলে একজন নেতা নিহত হলেও এই প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে নতুন উত্তরাধিকারী খুঁজে নিতে সক্ষম। এই জটিল প্রাতিষ্ঠানিক বুননই ইরানকে অন্যান্য স্বৈরতান্ত্রিক দেশের তুলনায় আলাদা এবং টেকসই করেছে।

ইরানে নেতৃত্বের পরিবর্তনের সময় সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস বা আইআরজিসি। তাদের মূল লক্ষ্য হলো বিপ্লব ও রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষা করা। কোনো নেতার মৃত্যু হলে আইআরজিসি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং সীমান্ত সুরক্ষায় আরও কঠোর অবস্থান নেয়। বেইজিং বা মস্কোর মতো ইরানও তাদের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজিয়েছে, যাতে বিদেশি আক্রমণে ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব মারা গেলেও মাঠপর্যায়ে প্রতিরোধব্যবস্থা অটুট থাকে।

ইরানি নেতারা নিজেদের ইতিহাস থেকে শিখেছেন, নেতৃত্বের শূন্যতা মানেই গৃহযুদ্ধ বা বিদেশি শক্তির আধিপত্য। সাফাভি বা কাজার রাজবংশের পতন তাদের শিখিয়েছে, বিশৃঙ্খলা এড়াতে হলে ঐকমত্য প্রয়োজন। তাই বর্তমান যুদ্ধে খামেনি বা অন্য কোনো শীর্ষ নেতা যদি ‘শহীদ’ হন, তবে সেই আবেগ জনমনে প্রতিশোধের স্পৃহা এবং ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। উত্তরাধিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি শুধু ধর্মীয় নয়, বরং সামরিক (আইআরজিসি) এবং ধর্মীয় (কোম) শক্তির একটি দর-কষাকষির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যা শেষ পর্যন্ত স্থিতিশীলতাকেই অগ্রাধিকার দেয়।

আমেরিকা ও ইসরায়েলের হামলা ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, কিন্তু এটি রাজনৈতিক কাঠামোকে ধসিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। ইরানের এই ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি যে এটি ঝড়ের মুখে নুয়ে না পড়ে বরং আরও শক্তভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়। উত্তরাধিকার পরিবর্তনের সময় বাইরের দুনিয়ার কাছে যা বিশৃঙ্খলা মনে হতে পারে, তা আসলে ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার একটি প্রক্রিয়ামাত্র। সুতরাং, শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হত্যা করে ইরানকে লিবিয়া বা ইরাকের মতো পরিস্থিতিতে ফেলা সহজ হবে না; বরং এটি দেশটিকে আরও দীর্ঘমেয়াদি এবং কঠোর প্রতিরোধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

ফরেন পলিসি থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

বল এখন ইরানের আম জনতার কোর্টে, তাঁরা কি পারবেন ইতিহাস গড়তে

নতুন স্বার্থ হাসিল নয়, ইরানের পরাজয় ঠেকাতে কাজ করছেন এরদোয়ান

যুদ্ধে ইরান হারলে কপাল পুড়বে পুতিনেরও

যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের চোরাবালিতে আটকে রাখতে চায় চীন

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হামলায় কী অর্জন করতে চায় ইরান, যুদ্ধ চলবে তেহরানের মর্জিমাফিক

ইরানের গোপন ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’ এবং আরও যা যা আছে

খামেনি হত্যাও টলাতে পারবে না ইরানকে, আঘাতের মূল অস্ত্র হবে ড্রোন

ইরানে রেজিম পরিবর্তনে ট্রাম্পের জুয়া—অতীতের চেয়ে আলাদা যেখানে, সফল হবে কি

ইরান হামলায় ট্রাম্পকে গোপনে উসকানি দিয়েছেন সৌদি যুবরাজ ও নেতানিয়াহু

খামেনির উত্থান ও মৃত্যু, একটি যুগের সমাপ্তি