হোম > বিশ্লেষণ

আমিরাতের ওপেক ত্যাগ তেলের বাজারে কতটা প্রভাব ফেলবে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: সংগৃহীত

জ্বালানি উৎপাদক দেশগুলোর জোট ওপেক ও ওপেক প্লাস বৈশ্বিক তেলের বাজারে তাদের প্রভাব কিছুটা হারাতে পারে। কারণ, জোটের সদস্য দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত ১ মে থেকে এই দুই জোট ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। জোটের প্রতিনিধি ও বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, বাকি উৎপাদক দেশগুলো একসঙ্গেই থাকবে এবং তেল সরবরাহ নীতিতে সমন্বয় চালিয়ে যাবে।

প্রায় ৬০ বছর সদস্য থাকার পর গতকাল মঙ্গলবার আরব আমিরাত ঘোষণা দেয়, তারা অর্গানাইজেশন অব দ্য পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ বা ওপেক ছাড়ছে। ওপেকের চতুর্থ বৃহত্তম উৎপাদক দেশ হিসেবে পরিচিত আমিরাতের এই সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে আবুধাবি আর ওপেক ও তার মিত্রদের নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা মানতে বাধ্য থাকবে না। এসব লক্ষ্যমাত্রার মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য রাখা হয়।

ওপেক প্লাস সংশ্লিষ্ট পাঁচটি সূত্র জানিয়েছে, আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত তাদের জন্য বিস্ময়কর ছিল। তাদের মধ্যে চারজন বলেন, আমিরাত বেরিয়ে গেলে বৈশ্বিক উৎপাদনের ওপর ওপেক প্লাসের নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে, ফলে সরবরাহ সমন্বয়ের মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখার কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

আমিরাত এখন পর্যন্ত ওপেক ছাড়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক দেশ। এটি সংগঠনটির জন্য বড় ধাক্কা। বিশেষ করে, এর প্রকৃত নেতৃত্বদানকারী দেশ সৌদি আরবের জন্য। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে আবুধাবি প্রতিদিন প্রায় ৩৪ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করত, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৩ শতাংশ। তবে যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো আমিরাতকেও রপ্তানি কমাতে এবং কিছু উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে।

ওপেক ছাড়ার পর আমিরাত যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের মতো স্বাধীন উৎপাদকদের কাতারে যোগ দেবে, যারা নিজেদের ইচ্ছামতো উৎপাদন করে। তবে বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে কার্যত জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় আমিরাত খুব বেশি উৎপাদন বা রপ্তানি বাড়াতে পারবে না। যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দেশটি তাদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা অনুযায়ী দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত উৎপাদন বাড়াতে পারবে।

আমিরাত ও সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই উৎপাদন কোটা নিয়ে টানাপোড়েন ছিল। বর্তমানে আমিরাতর কোটা প্রতিদিন ৩৫ লাখ ব্যারেল। কিন্তু ১৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ কর্মসূচির মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পর আমিরাত বড় কোটা দাবি করছিল।

আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের হেলিমা ক্রফট বলেন, ‘বছরের পর বছর আবুধাবি তাদের বাড়ানো সক্ষমতার বিনিয়োগ থেকে লাভ তুলতে চাইছে।’ তবে তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধ সেই পরিকল্পনাকে ধীর করে দেবে, কারণ ড্রোন ও রকেট হামলায় আমিরাতর উৎপাদন স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা–আইইএ জানিয়েছে, এই যুদ্ধ সরাসরি দৈনিক তেল উৎপাদনের দিক থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিঘ্ন তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এই সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যও প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে আমিরাত ও সৌদি আরবের বিরোধ অন্যতম।

সুদান, সোমালিয়া ও ইয়েমেন নিয়ে দ্বন্দ্ব, এবং রিয়াদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি—এসব কারণে বহু বছর ধরেই আমিরাতের ওপেক প্লাস ছাড়ার গুঞ্জন ছিল। পাশাপাশি দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমিরাত ওপেক প্লাস ছাড়ার ক্ষেত্রে চতুর্থ দেশ, তবে সবচেয়ে বড়। ২০২৪ সালে অ্যাঙ্গোলা উৎপাদন মাত্রা নিয়ে মতবিরোধের কারণে জোট ছাড়ে। ২০২০ সালে ইকুয়েডর এবং ২০১৯ সালে কাতারও ওপেক ত্যাগ করে।

অন্যদিকে ওপেক প্লাসের তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদক দেশ ইরাক জানিয়েছে, তারা জোট ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা করছে না। স্থিতিশীল ও গ্রহণযোগ্য তেলের দাম বজায় রাখাই তাদের লক্ষ্য। ব্ল্যাক গোল্ড ইনভেস্টরসের সিইও এবং দীর্ঘদিনের ওপেক বিশ্লেষক গ্যারি রস বলেন, ওপেক প্লাস ভেঙে পড়বে না, কারণ সৌদি আরব এখনো এই জোটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে। তাঁর ভাষায়, ‘শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবই ছিল মূল ওপেক—একমাত্র দেশ যার অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা আছে।’ সৌদি আরব প্রতিদিন ১ কোটি ২৫ লাখ ব্যারেল উৎপাদন করতে সক্ষম হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদন ১ কোটি ব্যারেলের নিচেই রেখেছে।

বিশ্লেষকেরা বলেন, ওপেক প্লাস সদস্যপদ দেশগুলোর কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বাড়ায়। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সংঘাতের চরম সময়েও ইরান ওপেকে থেকে যাওয়ার পেছনে এটিই একটি বড় কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ওপেক তেলের দাম বাড়িয়ে বিশ্বকে ‘ঠকাচ্ছে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ওপেকের নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতি সামরিক সহায়তা পুনর্বিবেচনা করতে পারে। তবে কোভিড মহামারির সময় ২০২০ সালে তেলের দাম পড়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদকদের রক্ষায় ওপেক প্লাসকে উৎপাদন কমাতে রাজি করানোর ক্ষেত্রে তিনিই ভূমিকা রেখেছিলেন।

রিস্টাড এনার্জির জর্জ লিওন বলেন, আমিরাতর এই পদক্ষেপ ওপেকের জন্য একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা, এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি ওপেককে কাঠামোগতভাবে দুর্বল করে দেবে। হেলিমা ক্রফট মনে করেন, আপাতত ওপেক প্লাস দেশগুলো উৎপাদন কমানোর বদলে যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো পুনর্গঠনে বেশি মনোযোগ দেবে। ফলে এখনই বড় ধরনের ভাঙন ঘটার সম্ভাবনা নেই।

তবে বাস্তবতা হলো, ওপেকের প্রভাব বহু দশক ধরেই কমছে। ১৯৬০ সালে গঠিত এই জোট একসময় বৈশ্বিক উৎপাদনের ৫০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করত। এখন প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর উৎপাদন বাড়ায় তা নেমে এসেছে প্রায় ৩০ শতাংশে, যেখানে গত বছর মোট বৈশ্বিক তেল ও তরল জ্বালানির উৎপাদন ছিল প্রতিদিন ১ কোটি ৫ লাখ ব্যারেল।

গত ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র ওপেকের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। একসময় ওপেকের ওপর নির্ভরশীল দেশটি এখন শেল তেলের উত্থানের ফলে বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ জোগান দিচ্ছে। এই উৎপাদন বৃদ্ধির চাপেই ২০১৬ সালে ওপেক কয়েকটি ওপেকবহির্ভুত দেশের সঙ্গে জোট গড়ে তোলে, যার নেতৃত্বে ছিল রাশিয়া। আইইএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এই জোট বৈশ্বিক তেল উৎপাদনের প্রায় ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত। তবে আমিরাতর প্রস্থান সেই অংশ কমিয়ে প্রায় ৪৫ শতাংশে নামিয়ে আনবে।

ভ্যাটিকানের দ্বারস্থ সিলিকন ভ্যালি, ধর্ম ও বিজ্ঞানের বিরোধ কি মিটে যাচ্ছে

ফ্রান্সের কবলমুক্ত মালি এখন রাশিয়ার হাতে, ঠেকাতে এককাট্টা আল-কায়েদা ও বিচ্ছিন্নতাবাদীরা

মার্কিন অবরোধের মুখে ইরানি অর্থনীতির লাইফলাইন হতে পারবে কি রাশিয়া

আমিরাতের ‘ওপেক’ ত্যাগ একটি বড় ঘটনা: বিবিসি

স্যাটেলাইট সেবায় যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্য কেড়ে নিল ইরান যুদ্ধ

পাকিস্তানের কাছে কেন হঠাৎ ৩.৫ বিলিয়ন ডলার ফেরত চাইল আমিরাত

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন: এসআইআর আতঙ্ক, বাঙালি অহং এবং পরিচয়ের তালগোল পাকানো রাজনীতি

ঢাকায় নতুন হাইকমিশনার পেশাদার কূটনীতিক নন রাজনীতিক, কেন প্রথা ভাঙল ভারত

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন: বিজেপি কি পারবে ১০০ আসনের গণ্ডি পার করতে

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন: বিজেপি কেন আর বাংলাদেশবিরোধী বয়ান দিচ্ছে না