বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক ক্রীড়া আসর শুধু মাঠের নায়কই তৈরি করে না, তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নতুন তারকাও। একটি ম্যাচ, একটি দুর্দান্ত পারফরম্যান্স কিংবা একটি ভাইরাল মুহূর্ত রাতারাতি একজন খেলোয়াড়কে কোটি মানুষের নজরে এনে দিতে পারে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে—এই আকস্মিক জনপ্রিয়তা কি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সাফল্যে রূপ নেওয়া সম্ভব?
সম্প্রতি কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা (Vozinha) সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে স্পেনের বিপক্ষে অসাধারণ গোলরক্ষণ করে তিনি দলকে ০-০ গোলে ড্র এনে দেন। টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট দলের বিপক্ষে এই ফলাফল ছিল বড় চমক। ম্যাচের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোজিনহার জনপ্রিয়তা বিস্ফোরণের মতো বাড়তে থাকে। তাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৭৪ লাখে, যা এনএফএল কিংবদন্তি টম ব্র্যাডির অনুসারীর সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় অনুসারী গোষ্ঠী বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড অংশীদারত্ব এবং স্পনসর্ড পোস্টের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য আয় করার সুযোগ তৈরি করে। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল মিডিয়া গবেষক ব্রুক ডাফি বলেন, বর্তমানে অনুসারীর সংখ্যা এক ধরনের মুদ্রার মতো কাজ করে। একজন প্রভাবশালী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তারকা একটি পোস্টের জন্যই ছয় অঙ্কের ডলারের পারিশ্রমিক দাবি করতে পারেন।
তবে এই খ্যাতি কতটা স্থায়ী, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বোস্টন কলেজের মিডিয়া ও ক্রীড়া বিশেষজ্ঞ মাইক সেরাজিওর মতে, ভাইরাল জনপ্রিয়তার বৈশিষ্ট্যই হলো দ্রুত উত্থান এবং দ্রুত পতন। তিনি বলেন, অতীতে খেলোয়াড়দের বিজ্ঞাপন বা বাণিজ্যিক সাফল্য পেতে হলে নিজেদের খেলায় সেরাদের সেরা হতে হতো। কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে জনপ্রিয়তা সব সময় ক্রীড়া দক্ষতার সমানুপাতিক নয়।
এর আরেকটি উদাহরণ নিউজিল্যান্ডের ডিফেন্ডার টিম পেইন। বিশ্বকাপ শুরুর আগে একজন আর্জেন্টাইন কনটেন্ট নির্মাতা তাকে ‘সবচেয়ে কম পরিচিত’ খেলোয়াড় হিসেবে তুলে ধরেন। সেই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর কয়েক দিনের মধ্যেই পেইনের ইনস্টাগ্রাম অনুসারী সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার থেকে বেড়ে প্রায় ৬০ লাখে পৌঁছে যায়। মজার বিষয় হলো, তাঁর অনুসারীর সংখ্যা এখন নিউজিল্যান্ডের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকাপ শেষে এই জনপ্রিয়তা ধরে রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, নেইমার বা কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো তারকারা অবসরের পরও ব্র্যান্ড চুক্তি পেতে পারেন। কিন্তু এক বা দুটি ভাইরাল মুহূর্তের মাধ্যমে আলোচনায় আসা খেলোয়াড়দের জন্য সেই পথ অনেক কঠিন।
তবুও সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাগবি খেলোয়াড় ইলোনা মাহার ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পরে তিনি পডকাস্ট, ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরশিপ, মডেলিং এবং টেলিভিশন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নিজের পরিচিতিকে সফল ক্যারিয়ারে রূপ দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকাপের ভাইরাল তারকাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পরও তারা কতটা দক্ষতার সঙ্গে নতুন অনুসারীদের ধরে রাখতে পারেন এবং নিজেদের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে পারেন তার ওপর। আকস্মিক খ্যাতি সুযোগ এনে দেয়, কিন্তু সেই সুযোগকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে পরিণত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক খেলা।
বিবিসি অবলম্বনে