হোম > বিশ্লেষণ

হরমুজে লিভারেজ হারাচ্ছে ইরান, নাকি সত্যিই যুদ্ধে জিতছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

প্রতীকী ছবি

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে এখন একটি প্রচলিত ধারণা তৈরি হয়েছে—ইরান জিতে গেছে। যুক্তিটা সরল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানে বোমা হামলা চালিয়েছে, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে এবং বড় ধরনের ছাড় দিতে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু ইরান আত্মসমর্পণ করেনি। দেশটির সরকার এখনো ক্ষমতায়। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র এখনো পুরো অঞ্চলের জন্য হুমকি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তেহরানের এখনো হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা রয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বড় একটি অংশকে বেশি জ্বালানি খরচ বহন করতে হচ্ছে।

গ্রীষ্মকালে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার মধ্যে পড়ে যেতে পারে। এটি শক্তিশালী যুক্তি। কিন্তু হয়তো এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোটা কিছুটা আগেভাগেই হয়ে গেছে। বাস্তবে ইরান যুদ্ধ হলো চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে তা ধরে রাখার লড়াই। আর কয়েক মাস আগের তুলনায় এখন সেই লড়াইয়ের চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।

চার অধ্যায়

ইরানকে ঘিরে ছয় মাসের এই সংঘাত এখন পর্যন্ত চারটি অধ্যায়ে এগিয়েছে। প্রথম অধ্যায় শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্যাপক বিমান হামলার মধ্য দিয়ে এবং চলে ছয় সপ্তাহের তীব্র সামরিক অভিযান পর্যন্ত। দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয় ৭ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার মাধ্যমে। এর পরিণতি ছিল ১৭ জুন ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের স্বাক্ষর করা সমঝোতা স্মারক।

এর কয়েক সপ্তাহ পর শুরু হয় তৃতীয় অধ্যায়। ওই সময় ইরান আবারও হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে দুই পক্ষের মধ্যে আবারও পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা শুরু হয়। সেটিই ছিল সেই মুহূর্ত, যখন যুক্তরাষ্ট্রের হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার্যত ছেড়ে দেওয়া এবং ইরানকে সেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান বাড়তে থাকে। মনে হচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আর কোনো বিকল্প নেই।

কিন্তু এত দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আবারও সামরিক অবরোধ এবং ইরানের তেল বাণিজ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে। একই সময়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী নিরলসভাবে জাহাজ চলাচলের পথ পরিষ্কার করতে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দিতে কাজ করেছে। এর ফল হয়েছে ইরানের তেল রপ্তানির ওপর একটি কার্যকর অবরোধ।

একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ আবারও বাড়ছে এবং জ্বালানির দামও আশ্চর্যজনকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ চলতি সপ্তাহে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন যুদ্ধের আগের মাত্রার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে ফিরে এসেছে। এর অর্থ হলো, এখন চাপ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নয়, বরং ইরানের ওপর ক্রমশ বাড়ছে। আর ইরান যদি হরমুজ প্রণালিকে জিম্মি করে রাখার সক্ষমতা হারায়, তাহলে তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতাও দ্রুত কমে যাবে।

আরও কার্যকর মার্কিন কৌশল

যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই বহু বছরের নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে ইরান দুর্বল অবস্থায় ছিল। এখন দেশটির অবস্থান আরও খারাপ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর ইরানের অর্থনীতি ৫ শতাংশের বেশি সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

ইরানের মুদ্রার মূল্য ব্যাপকভাবে কমে গেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে আকাশচুম্বী হারে। ইরানের শ্রম মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা সম্প্রতি হিসাব দিয়েছেন, যুদ্ধের প্রথম তিন মাসেই দেশটিতে ১০ লাখের বেশি কর্মসংস্থান হারিয়ে গেছে।

এই পরিসংখ্যানগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইরানের পক্ষে এই সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা শুধু তাদের হাতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। যুদ্ধের আগে ইরানি সরকার তাদের দমনমূলক শাসন এবং ব্যর্থ অর্থনীতির বিরুদ্ধে নজিরবিহীন জনচাপের মুখে ছিল। রাজপথে হাজার হাজার ইরানি নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। শুরু থেকেই আরও কার্যকর একটি মার্কিন কৌশল হয়তো হতে পারত ইরানের সেই জনগণকে অর্থনৈতিকভাবে সমর্থন করা, যারা পরিবর্তনের দাবি তুলছিল।

যুদ্ধের প্রথম অধ্যায়ে ইরানের অধিকাংশ শীর্ষ নেতাকে সরিয়ে দেওয়ার ফলে বরং রেভল্যুশনারি গার্ড বা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসির ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের শাসনের বিরোধিতা করা অধিকাংশ ইরানির ওপর দমন-পীড়নও আরও বেড়েছে।

কিন্তু বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখতে রেভল্যুশনারি গার্ডের সম্পদের প্রয়োজন। আর এই নতুন চতুর্থ অধ্যায়, অর্থাৎ সামরিক অবরোধ, এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে যার মুখোমুখি ইরান আগে কখনো হয়নি। প্রকৃতপক্ষে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর এই প্রথম ইরান হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে তার অর্থনীতির প্রধান জীবনরেখার ওপর এমন এক ধরনের অবরোধের মুখোমুখি হয়েছে।

এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার পথ হলো হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে হুমকি বন্ধ করা এবং প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়া ইরানের পারমাণবিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির যা কিছু অবশিষ্ট আছে, সেটিও পরিত্যাগ করা।

এমন একটি চুক্তি ট্রাম্প মেনে নেবেন। কিন্তু রেভল্যুশনারি গার্ডের দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুইটির যেকোনো একটি করা মানে দুর্বলতা প্রদর্শন করা এবং তাদের শাসনের জন্য হুমকি তৈরি করা।

ইরানের হাতে থাকা কার্ড

তেহরান হয়তো এই ফাঁদ থেকে লড়াই করে বের হওয়ার চেষ্টা করবে। যুদ্ধের প্রথম তিনটি অধ্যায়ে ইরানের কৌশল ছিল পরিষ্কার—হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর হুমকি তৈরি করা, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম বাড়ানো, বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ানো এবং শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে পিছু হটতে বাধ্য করা।

বিশেষ করে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম নির্বাচন সামনে থাকায় ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানো ছিল এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং আবারও তা করতে পারে। ইয়েমেনে ইরানের প্রক্সি বাহিনী হুথিরাও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে লোহিত সাগর দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।

এর সবই যুদ্ধের প্রথম দিকের একই কৌশলে ফিরে যাওয়ার অর্থ হবে।

কৌশলগতভাবে, ইরানের জন্য এটি কাজ করেনি। উপসাগরীয় দেশগুলো যুদ্ধ নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। কিন্তু তাদের অধিকাংশই হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ‘চাঁদাবাজিমূলক’ দাবির কাছে নতি স্বীকার করতে সমর্থন করে না। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করতে ইরানের ড্রোন ও মাইন ব্যবহারের চেষ্টাও এখন প্রথমবারের মতো ব্যর্থ হচ্ছে। তাই অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে থাকলে ইরান আরও বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে, এই ঝুঁকিকে আমি উড়িয়ে দেব না।

তবে এই পর্যায়ে এসে সেটি হয়তো ওই অর্থনৈতিক চাপ কমাতে যথেষ্ট হবে না। ট্রাম্প এখন ইরানের নেতারা যতটা ধারণা করেছিলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে।

ভেঙে পড়ার সীমা

ইরানের নেতারা এবং পশ্চিমা বিশ্বের অনেক বিশ্লেষক চাপ মোকাবিলায় ইরানের এক ধরনের অমরত্বের ধারণা তুলে ধরছেন। তাদের বক্তব্য হলো, ইরান কখনোই তার পারমাণবিক কর্মসূচি বা হরমুজ প্রণালির দাবি ছেড়ে দেবে না। একইভাবে তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা তাদের সন্ত্রাসী প্রক্সি বাহিনীগুলোকেও ছাড়বে না।

তেহরানের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা হিসেবে আমাদের সবাইকে এটি মেনে নিতে হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত সপ্তাহে যুক্তি দিয়েছেন, অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার চাপ ‘ব্যর্থ হতে বাধ্য।’ যেমন তাঁর ভাষায়, এর আগে নেওয়া অন্যান্য সব প্রচেষ্টাও ইরানের নীতি পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হয়েছে। আইএসআইএসকে পরাজিত করার অভিযান পরিচালনার সময় আমিও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে একই কথা শুনতাম।

গাজায় জিম্মিদের মুক্তি নিয়ে আলোচনার সময় হামাস সম্পর্কেও একই কথা শুনেছি। বাস্তবতা হলো, প্রত্যেকেরই একটি ভেঙে পড়ার সীমা আছে।

ইরান মনে করেছিল, তারা ট্রাম্পের সেই সীমা খুঁজে পেয়েছে। এখন হয়তো ট্রাম্পও ইরানের সীমা খুঁজে বের করতে পারেন। এখনই অবশ্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় হয়নি।

এটিই শেষ অধ্যায় নয়

এই সংঘাত কোনো না কোনো রূপে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শেষ পর্যন্ত এবং তার পরেও চলতে পারে। কারণ এর শিকড় প্রায় পাঁচ দশক ধরে বিস্তৃত। এই যুদ্ধের আগের অধ্যায়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল বারবার পরিবর্তনশীল এবং লক্ষ্যগুলো ছিল অস্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে ছিল ব্যাপক দোদুল্যমানতা এবং পরস্পরবিরোধী বক্তব্য।

কিন্তু চতুর্থ অধ্যায়টি আলাদা বলে মনে হচ্ছে। এখন মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি স্পষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। চলতি সপ্তাহে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার সেই লক্ষ্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। লক্ষ্য হলো ইরানের ওপর অবরোধ কার্যকর করা এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক লক্ষ্যও একইভাবে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হওয়া উচিত। ইরানকে হরমুজ প্রণালির ওপর তার দাবি ছেড়ে দিতে হবে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পরিত্যাগ করতে হবে।

ততক্ষণ পর্যন্ত এটাই হবে নতুন বাস্তবতা। আর সেই নতুন বাস্তবতা, সম্ভবত যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো, এখন তেহরানের নয়, বরং ওয়াশিংটনের পক্ষে যাচ্ছে।

সিএনএন থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান