হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক অবস্থান ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক খুঁজে পাচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। সুদানে চলমান গৃহযুদ্ধ বন্ধে কার্যকর ভূমিকা না নেওয়া এবং সোমালিয়ার অখণ্ডতা সমর্থন করেও বিচ্ছিন্নতাবাদী সোমালিল্যান্ডের বন্দরে বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে লন্ডনের ‘দ্বিমুখী’ আচরণ এখন কাঠগড়ায়। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাজ্য এখন আর নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী নয়, বরং কেবল নিজের স্বার্থের জন্য কাজ করছে।
সুদানের সেনাবাহিনী ও আধা সামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের (আরএসএফ) মধ্যে যুদ্ধে যুক্তরাজ্য কেবল মুখে জবাবদিহির কথা বলছে, কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, পর্দার আড়ালে যুক্তরাজ্য রক্তপাত বন্ধে ‘সবচেয়ে কম উচ্চাকাঙ্ক্ষী’ পরিকল্পনা নিয়েছে।
সুদানি নীতি বিশ্লেষক আমজাদ ফরিদ আল-তায়েবের মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাত আরএসএফকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে বলে যে অভিযোগ রয়েছে, যুক্তরাজ্য সেই আগ্রাসনের ‘সহযোগী’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। লন্ডনের লক্ষ্য হলো কূটনৈতিকভাবে আরএসএফের নৃশংসতাকে আড়াল করা। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর অবশ্য দাবি করেছে, তারা মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে সহিংসতা বন্ধে কাজ করছে।
সোমালিয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের নীতি আরও রহস্যজনক। সরকারিভাবে লন্ডন সোমালিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা সমর্থন করে। অথচ ব্রিটিশ সরকার তাদের উন্নয়ন অর্থায়ন সংস্থা বিআইআইয়ের মাধ্যমে সোমালিল্যান্ডের বারবেরা বন্দরের অংশীদার। এই সোমালিল্যান্ড একটি বিচ্ছিন্ন অঞ্চল, যাকে যুক্তরাজ্য বা কোনো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ই এখনো স্বীকৃতি দেয়নি।
বর্তমানে বারবেরা বন্দরের মালিকানা সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড, সোমালিল্যান্ড সরকার ও ব্রিটিশ বিআইআইয়ের হাতে। এটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। কারণ, লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই বন্দর ইথিওপিয়ার বাণিজ্যের জন্য বিকল্প করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মতে, বারবেরা বন্দরটি আমিরাতের সেই লজিস্টিক নেটওয়ার্কের অংশ, যা সুদানের আরএসএফকে অস্ত্র সরবরাহে ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাজ্য এই বন্দরের অংশীদার হওয়ায় নৈতিকভাবে চাপের মুখে পড়েছে। বিশ্লেষক আবদাল ফাত্তাহ হামিদ আলীর মতে, এটি লন্ডনের ‘নীতি ও চর্চার’ মধ্যকার বড় ব্যবধান স্পষ্ট করে।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের গবেষক ম্যাথিউ স্টার্লিং বেনসনের মতে, যুক্তরাজ্য ইচ্ছাকৃতভাবে এই অস্পষ্টতা বজায় রাখছে। একদিকে সোমালিয়ার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক রক্ষা, অন্যদিকে স্থিতিশীল সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা বজায় রাখা—এর মাধ্যমে লন্ডন কোনো রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ছাড়াই কৌশলগত সুবিধা নিচ্ছে।
তবে যুক্তরাজ্যের এই দ্বিমুখী নীতি দীর্ঘ মেয়াদে হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে তার নৈতিক কর্তৃত্ব কেড়ে নিচ্ছে। স্থানীয় শক্তিগুলো মনে করছে, লন্ডনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল প্রভাব বিস্তার ও বাণিজ্যিক মুনাফা, প্রকৃত শান্তি বা স্থিতিশীলতা নয়।