ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানি এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলায় সৃষ্ট যুদ্ধের দামামা এখন দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তানেও প্রবলভাবে অনুভূত হচ্ছে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরব এবং প্রতিবেশী ইরানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে এক নজিরবিহীন কূটনৈতিক ও সামরিক সংকটে পড়েছে ইসলামাবাদ।
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমে ইরানের সঙ্গে প্রায় ৯০০ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করেন পাকিস্তানের লাখ লাখ শ্রমিক, যাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। গত বছরের সেপ্টেম্বরে রিয়াদের সঙ্গে স্বাক্ষরিত একটি ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ পাকিস্তানকে বর্তমানে এক কঠিন অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই চুক্তির মূল শর্ত হলো, এক পক্ষের ওপর আক্রমণ হলে তা অপর পক্ষের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় আলী খামেনির মৃত্যুর ঘটনাকে পাকিস্তান ‘অযৌক্তিক’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। তবে এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের পাল্টা হামলাকে ‘সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করেছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বর্তমানে রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যে ‘শাটল ডিপ্লোম্যাসি’ বা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছেন।
ইসহাক দার জানান, তিনি ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে সৌদি আরবের প্রতি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। জবাবে তেহরান গ্যারান্টি চেয়েছে, সৌদি আরবের মাটি ব্যবহার করে যেন ইরানে হামলা চালানো না হয়।
প্রতিরক্ষা চুক্তি ও সামরিক বাধ্যবাধকতা
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তিটি এখন অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবেই রিয়াদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বর্তমানে সৌদি আরবে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার পাকিস্তানি সেনা রয়েছে। ৬ মার্চ প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সেনাপ্রধান আসিম মুনির জরুরি ভিত্তিতে রিয়াদে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
এই যুদ্ধ শুধু কূটনৈতিক নয়, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। খামেনির মৃত্যুর পর গিলগিট-বালটিস্তানসহ সারা দেশে বিক্ষোভে অন্তত ২৩ জন নিহত হয়েছে। পাকিস্তানের শিয়া সম্প্রদায় (জনসংখ্যার প্রায় ১৫-২০ %) এবং ইরান-সমর্থিত ‘জয়নাবিয়ুন ব্রিগেড’-এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষক আমির রানা সতর্ক করেছেন, এই দ্বন্দ্বে সরাসরি পক্ষ নিলে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ভয়াবহ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
পাকিস্তানের হাতে বিকল্প কী?
সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পাকিস্তান সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে কোনো আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশ নেবে না। তবে সৌদি আরবের আকাশসীমা রক্ষায় তারা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে পারে।
ইতিহাসবিদ ইলহান নিয়াজ বলেন, ‘যদি শেষ পর্যন্ত কোনো একটি পক্ষ বেছে নিতেই হয়, তবে পাকিস্তানের পাল্লা নিশ্চিতভাবেই সৌদি আরবের দিকে ভারী থাকবে। তবে ইরানের পতন বা অস্থিতিশীলতা পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে, তা ইসলামাবাদের জন্য হবে চরম উদ্বেগের বিষয়।’
মধ্যপ্রাচ্যের এই দাবানল থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতে পাকিস্তান বর্তমানে কেবল কূটনীতিকেই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তু যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে এই ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ বা ভারসাম্যের রাজনীতি কতক্ষণ টিকবে, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা