হোম > নারী

তরুণ নারী সম্মেলন

মিছিলে ব্যানার ধরিয়ে নারীদের সামনে রাখা হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেওয়া হয় না জায়গা

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

নরওয়ে দূতাবাস ও ইউএন উইমেনের সহযোগিতায় মানিকগঞ্জের কৈট্টায় প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রে দুই দিনব্যাপী এই তরুণ নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

মিছিলে ব্যানার ধরিয়ে নারীদের সামনে রাখা হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয় না। নির্বাচনে মনোনয়নের ক্ষেত্রেও তাঁদের উপেক্ষা করা হয়। আজ বৃহস্পতিবার নারীপক্ষ আয়োজিত তরুণ নারী সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেছেন। নরওয়ে দূতাবাস ও ইউএন উইমেনের সহযোগিতায় মানিকগঞ্জের কৈট্টায় প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

সম্মেলনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, বছরের পর বছর রাজনীতি করেও নারীদের প্রথম সারির নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে লড়াই করতে হচ্ছে। ২০২৬ সালেও একজন নারীকে প্রমাণ করতে হচ্ছে যে, তিনি মানুষ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্য। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে শুধু নারীদের প্রস্তুত করলেই হবে না, পুরুষদের মানসিকতারও পরিবর্তন করতে হবে।

নারীদের রাজনৈতিক মনোনয়নের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে নিলুফার চৌধুরী বলেন, অভিজ্ঞতার অজুহাতে নারীদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। একজন পুরুষ যদি অভিজ্ঞতা ছাড়া নির্বাচন করতে পারেন, তাহলে একজন নারী কেন পারবেন না?

নরওয়ে দূতাবাস ও ইউএন উইমেনের সহযোগিতায় মানিকগঞ্জের কৈট্টায় প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রে দুই দিনব্যাপী এই তরুণ নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

নিলুফার মনি বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেক সময় নারীর নিজের যোগ্যতার চেয়ে পারিবারিক পরিচয় বেশি গুরুত্ব পায়। একজন মন্ত্রীর মেয়ে কিংবা সংসদ সদস্যের স্ত্রী বা সন্তান সহজেই রাজনৈতিক সুযোগ পেয়ে যান। কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীদের একই জায়গায় পৌঁছাতে অনেক বেশি সংগ্রাম করতে হয়। নিজের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাশাপাশি তিনি আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন। তখন মিছিলে সামনে থাকা ও আন্দোলনে অংশ নেওয়া নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিযোগিতায় নামতে চাইলে তাঁকে ভিন্নভাবে দেখা শুরু হয়। তিনি বলেন, ‘মিছিলে সামনে থাকা, আন্দোলন করা—এসব যেন নারীর জন্য গ্রহণযোগ্য ছিল। কিন্তু নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় যেতে চাওয়াটা যেন অপরাধ হয়ে গেল।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম বলেন, ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে বসা নারীর জন্য কোনো বিশেষ লক্ষ্য নয়, এটি একটি স্বাভাবিক ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু সমাজে নারীকে সারা জীবন নিজেকে প্রমাণ করতে হয় বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় পৌঁছানোও তাঁদের কাছে অনেক দূরের বিষয় হয়ে ওঠে।’

রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নারীদের দৃশ্যমান উপস্থিতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে নুসরাত তাবাসসুম বলেন, ছয় ফুটের একটি ব্যানার ধরতে চার-পাঁচজন নারী লাগে। ক্যাম্পাসের কোনো রাজনৈতিক মিছিল দেখবেন না, যেখানে কয়েকজন নারী নেই। কিন্তু ব্যানার ধরার প্রয়োজনীয় সংখ্যক নারী ছাড়া আর কোনো নারীদের রাখা হয় না। পরে নারীদের বলা হয়, ‘তোমাকে তো সুযোগ দিয়েছি, মিছিলে সামনে তো তুমিই ছিলে, ছবিতেও তোমার ছবিটা বেশি স্পষ্ট।’

নুসরাত বলেন, মিছিলে সামনে ব্যানার ধরার সুযোগকে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে মনোনয়ন, নেতৃত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জায়গায় নারীদের সেই সুযোগ দেওয়া হয় না।

নারীদের জন্য সমান সুযোগের দাবিকে ‘বেশি সুবিধা চাওয়া’ হিসেবে দেখার সমালোচনা করে নুসরাত বলেন, পুরুষেরা জন্মের পর থেকেই অনেক ক্ষেত্রে নারীদের তুলনায় বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছেন। পুষ্টিকর খাবার, শিক্ষা, বিশ্রাম ও স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও বৈষম্য রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সংসদ ও রাজনৈতিক দলগুলোতে এখনো পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো বিদ্যমান বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের কোনো সুপারিশ গ্রহণ না করে এই কমিশন নিয়ে নাটক করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় সংগীতের মধ্যে দিয়ে তরুণ নারী সম্মেলন শুরু হয়। অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে সভাপতিত্ব করেন নারীপক্ষের সভানেত্রী কে এ জাহান রুমী। সম্মেলনের উদ্দেশ্য, প্রকল্প পরিচিতি, নারী নেতৃত্ব ও নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নারীপক্ষের অবস্থান তুলে ধরেন সংগঠনের সদস্য মাহীন সুলতান। তিনি বলেন, জনজীবনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব এখনো কম। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনে তরুণ নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকলেও পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাঁদের ধরে রাখা যায়নি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশে ইউএন উইমেনের প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিং বলেন, তরুণ নারীদের ওপর বিনিয়োগ মানে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রে বিনিয়োগ। তরুণ নারী নেতৃত্বকে এগিয়ে নিতে আন্তদলীয় ও আন্তপ্রজন্ম নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

সম্মেলনের বিভিন্ন পর্ব সঞ্চালনা করেন কামরুন নাহার, সামিয়া আফরীনসহ নারীপক্ষের সদস্যরা।

বক্তব্য দেন লেখক ও মানবাধিকার কর্মী ইলিরা দেওয়ান, ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক তপতী সাহা, সাংস্কৃতিক কর্মী বীথি ঘোষ প্রমুখ।

দুই দিনের এই সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিভিন্ন পেশার শতাধিক নারী অংশ নিচ্ছেন। জনজীবনে তরুণ নারীদের প্রতিবন্ধকতা, সম্ভাবনা ও অবদান সম্পর্কে মতামত তুলে ধরছেন তাঁরা। আগামীকাল শুক্রবার বিকেলে সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি ও কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে সম্মেলন শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।