বন্ধুদের মাঝে নিজের ফ্যাশন-সচেতনতা আর স্বতন্ত্র স্টাইলের জন্য একসময় বেশ পরিচিত ছিলেন রুমাইয়া করিম রামিসা। বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা গয়না বিক্রির মাধ্যমে তাঁর অনলাইন গয়নার ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়েছিল। এখন তিনিই সেগুলোর নকশা করেন। এরপর দক্ষ কারিগরের কাছ থেকে তৈরি করে নিজের ব্র্যান্ড দে’শীর মাধ্যমে বিক্রি করেন। পেশাদার ডিজাইনার না হয়েও সৃজনশীলতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে আলাদাভাবে পরিচিতি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। ভাবনাটা ছিল নিজের মতো করে এমন কিছু করা, যেখানে সাধারণ মেয়েরা হাতের নাগালেই পেয়ে যাবেন মনের মতো সব গয়না।
২০২০ সালে টিউশনির টাকায় মেপে মেপে দিন কাটত রামিসার। এমন দিনও গেছে, যখন মেরুল বাড্ডা থেকে হেঁটে উত্তর বাড্ডা কিংবা গুলশানে গেছেন টিউশনি করতে। পোশাকের ব্যবসা দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও তাতে আশানুরূপ সাফল্য মেলেনি। এরপর নিজের তৈরি করা হেয়ার অয়েল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে গিয়ে ব্যবসায়িক আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হন। স্বজন এবং আশপাশের মানুষ তখন বলতে শুরু করে, ‘এসব করে লাভ নেই, এসবে সম্মান নাই। ব্যাংকে জব করো, না হলে কোনো প্রতিষ্ঠানে।’ চুড়িওয়ালি বা ফেরিওয়ালির মতো কথাও শুনেছেন। পরিবার থেকেও শুরুতে সমর্থন আসেনি, বাবা বিশ্বাস করতে পারেননি, মেয়ে পারবে।
কিন্তু মা, বোন আর কাছের কয়েকজন বন্ধুর সমর্থনে সব বাধা দূর করে এগিয়ে যান রামিসা। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর স্বপ্নের ব্র্যান্ড দে’শী (De’She)। এটিই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। পেশাদার ডিজাইনার না হয়েও নিজস্ব পছন্দ এবং পিন্টারেস্টের থিম-থিওরি কাজে লাগিয়ে শুরু করেন গয়নার কাজ। চেনা পরিচিত ‘প্রিয় মাওলা মেরে’ গানের সেই ভিনটেজ ঝুমকা তিনিই প্রথম নকশা করে ভারতের কারখানায় গিয়ে তৈরি করিয়ে নিয়ে আসেন। বর্তমানে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিবিএ বিভাগের এই শিক্ষার্থী একদিকে ক্লাস সামলান, অন্যদিকে গভীর রাত পর্যন্ত পরিচালনা করেন ইনভেনটরি ও মডারেটরদের কাজ। তাঁর ব্র্যান্ডের ঝুড়িতে এখন রয়েছে কাশ্মীরি চুড়ি, কাশ্মীরি ঘড়ি, পরান্দি, টার্কিশ রিং, অ্যান্টি-টার্নিশ জুয়েলারি, কাচের তৈরি দুলসহ নানা পিন্টারেস্ট অনুপ্রাণিত সংগ্রহ। দেশের বাইরে থেকে আনা মানসম্মত উপকরণ ব্যবহার এবং কোনো সমস্যা থাকলে গয়না বদলে দেওয়ার বিশ্বস্ততায় ব্র্যান্ডটি দ্রুতই ক্রেতাদের মন জয় করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্র্যান্ডটির একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর প্রথম আন্তর্জাতিক অর্ডার আসে পাকিস্তান থেকে। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি রামিসাকে। বর্তমানে ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে দে’শীর পণ্য। রামিসা বলেন, ‘আমার কাছে সব পিন্টারেস্টের প্রোডাক্ট পাবেন ক্লায়েন্টরা। এখন বিশের দশকের জুয়েলারি নিয়ে কাজ করছি। পাশাপাশি কিছু পাকিস্তানি জুয়েলারিও আছে, যেগুলো আমরা ছোটবেলায় দেখতাম। কিন্তু এখন এগুলো প্রায় নেই বললেই চলে।’
দেশের মাটিতে নিজস্ব আউটলেট খোলার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে দে’শীর আউটলেট তৈরি করাই এখন রামিসার স্বপ্ন। শূন্য হাতে শুরু করা এক তরুণীর ইচ্ছা আর অধ্যবসায় যে সাফল্য এনে দিতে পারে, রামিসার এই পথচলা তার অনন্য প্রমাণ।