হোম > নারী

সিরিয়ার সেনাবাহিনীতে কি জায়গা হবে: নারী যোদ্ধাদের

জগৎপতি বর্মা, ঢাকা

ছবি: সংগৃহীত

সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাসাকা প্রদেশ। সূর্য ডোবার সময় পাহাড়ের ওপর দুর্গের মতো তৈরি সামরিক স্থাপনার পাশ দিয়ে ছুটছেন কয়েকজন তরুণী। কারও হাতে কালাশনিকভ অর্থাৎ একে-৪৭ রাইফেল। তবে শত্রুর দিকে অস্ত্র তাক করতে নয়, সূর্যাস্তের হালকা নীল ও সবুজ আলোয় ছবি তুলতেই তাঁদের এই ব্যস্ততা।

এই তরুণীরা কুর্দি নারী সুরক্ষা ইউনিট বা ওয়াইপিজের সদস্য। আইএসবিরোধী যুদ্ধে, ইয়াজিদি জনগোষ্ঠীকে উদ্ধার এবং রোজাভা নামে পরিচিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছিল এই নারী বাহিনী।

কিন্তু আজকের সিরিয়ায় এই নারী যোদ্ধাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

সম্প্রতি সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস বা এসডিএফ ভেঙে নতুন সামরিক বাহিনীতে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির অন্তর্বর্তী সরকার। চুক্তি অনুযায়ী এসডিএফের পুরুষ যোদ্ধারা সেনাবাহিনীতে জায়গা পেলেও ওয়াইপিজের নারী যোদ্ধাদের নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে নতুন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নারীদের সামরিক বাহিনীর যোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির ধারণাই প্রত্যাখ্যান করেছে।

সিরিয়া সরকারের প্রেসিডেনশিয়াল টিমের প্রতিনিধি মোস্তফা আবদি জানান, সিরিয়ার আইন অনুযায়ী নারীরা রাষ্ট্রের যেকোনো উচ্চ পদে কাজ করতে পারলেও সামরিক বাহিনীর যোদ্ধা হিসেবে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই।

পরে ওয়াইপিজের নারী যোদ্ধাদের শুধু প্রশাসনিক কাজের প্রস্তাব দেওয়া হলে তা একবাক্যে প্রত্যাখ্যান করেছেন এই অকুতোভয় নারীরা।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের মধ্য দিয়ে সিরিয়ায় নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের শুরু হয়। এরপর দেশকে একীভূত করার লক্ষ্যে নতুন সরকার এসডিএফের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। প্রায় এক বছর ধরে আলোচনা চললেও তেমন অগ্রগতি হয়নি। পরে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী এসডিএফ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আকস্মিক অভিযান শুরু করলে পরিস্থিতি বদলে যায়। চাপে পড়ে এসডিএফ সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করতে সম্মত হয়।

গত ২৭ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে ওয়াইপিজে জানায়, তাঁরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছেন যাতে ওয়াইপিজেকে একটি পৃথক ও সুসংগঠিত সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একীভূত করা যায়। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা ছাড়া আর কিছু করার নেই এই নারীদের।

১৪ বছর বয়সে যুদ্ধে

হাসাকায় ওয়াইপিজের রোশাম ব্রিগেডের সদস্যদের একটি ব্যারাকে বসেছিলেন ২২ বছর বয়সী সিয়া জুডি। তিনি দলের সদস্যদের কুর্দি ভাষার বিপ্লবী স্লোগান আরবিতে অনুবাদ শেখাচ্ছিলেন।

২০১৪ সালে আইএস যখন দেইর আজ-জোর দখল করে, তখন ছোট্ট জুডি ঘর হারান। তিনি জানান, আইএস আসার পর তাঁদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। নারীদের একা বাইরে বের হওয়ারও অনুমতি ছিল না। তবে আইএসের নৃশংসতা তাঁকে ওয়াইপিজেতে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করেনি। ২০১৮ সালে এসডিএফ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় তুরস্কের স্থল অভিযান তাঁকে যুদ্ধে নামার সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৪ বছর।

ওয়াইপিজের সদস্যরা ‘ক্যাডার’ হিসেবে পরিচিত। তাঁদের কোনো চাকরির চুক্তি নেই, নির্দিষ্ট ছুটিও নেই। সামান্য দৈনিক ভাতা পান তাঁরা। মূলত তাঁদের পুরো জীবনই সংগঠনের আদর্শ ও সংগ্রামের জন্য উৎসর্গ করা।

জুডি বলেন, তিনি স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছিলেন এবং তাঁর পরিবারও সিদ্ধান্তটি মেনে নিয়ে তাঁকে উৎসাহিত করেছিল। নারীরা নিজেদের ঘর রক্ষার জন্য অস্ত্র হাতে লড়ছে—এই ধারণাই তাঁকে টেনেছিল। জুডি বলেন, ‘আমি নিজের জীবনের লক্ষ্য নিজেই বেছে নিয়েছিলাম।’

২০১৯ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে আইএসের পতনোন্মুখ খেলাফতের বিরুদ্ধে দেইর আজ-জোর মুক্তির যুদ্ধে অংশ নেন তিনি। জুডি বলেন, আইএস যোদ্ধারা নারীদের অস্ত্রের মুখোমুখি হতে ভয় পেত। সেই লড়াইয়ে তাঁর অনেক সহযোদ্ধা নিহত হন। জুডির কাছে ওয়াইপিজেতে থাকা মানে স্বাধীনতা। তবে সেই স্বাধীনতার সঙ্গে আছে কঠোর সামরিক জীবন।

২০ বছর বয়সী সুসান বিরহাতও ওয়াইপিজের সদস্য। ২০২২ সালে ১৬ বছর বয়সে তিনি এই সংগঠনে যোগ দেন। তাঁর বাবা পুরুষ বাহিনী পিপলস প্রোটেকশন ইউনিটস বা ওয়াইপিজির কর্মকর্তা ছিলেন এবং তাঁর চার বোনও অস্ত্র হাতে নিয়েছেন।

বিরহাত মনে করেন, ওয়াইপিজেকে অবশ্যই সামরিক বাহিনীতে যোদ্ধার ভূমিকা দেওয়া উচিত। তাঁর যুক্তি, সেনাবাহিনীতে নারীর উপস্থিতি সামরিক বাহিনীর কঠোরতা ও সহিংসতার লাগাম টেনে ধরতে পারে। তবে একই নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে কাজ করতেও আপত্তি নেই বিরহাতের। তাঁর কথা, আমাদের বাহিনী স্বীকৃতি পেলে আমরা পুরো সিরিয়ার নারীদের স্বাধীনতার জন্য কাজ করব।

ওয়াইপিজের মুখপাত্র রুকসান মোহাম্মদ জানান, প্রথম আলোচনার পর এপ্রিল মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে তাঁদের মাত্র একবার বৈঠক হয়েছে। সেখানে ওয়াইপিজেকে কীভাবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সে বিষয়ে একটি প্রস্তাব দিতে বলা হয়েছিল। তাঁরা প্রস্তাব জমা দিলেও কোনো উত্তর পাননি। পরবর্তী বৈঠকের অনুরোধও উপেক্ষা করা হয়েছে।

ওয়াইপিজের দাবি, এখন পর্যন্ত তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা হলো যোদ্ধার পরিবর্তে শুধু প্রশাসনিক কাজের জন্য যুক্ত হওয়া।

রোজাভার ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন

তবে ওয়াইপিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে মূল বিরোধ শুধু সামরিক কাঠামো নিয়ে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সিরিয়ার নতুন সরকারের সঙ্গে রোজাভার রাজনৈতিক আদর্শের পার্থক্য।

সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্বায়ত্তশাসিত এই অঞ্চলে রয়েছে গণতন্ত্র এবং নারী-পুরুষের সমান অধিকার। প্রশাসন ও এসডিএফের বিভিন্ন স্তরে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

জুডিও মনে করেন, সরকার ওয়াইপিজেকে অস্তিত্বহীন করে দিতে চায়। কারণ, তাঁদের সংগঠন সমাজ গঠনে একটি বিকল্প পথের প্রতিনিধিত্ব করে।

ওয়াইপিজের মুখপাত্র রুকসান মোহাম্মদ বলেন, তাঁদের সুরক্ষার জন্য অন্য কারও প্রয়োজন নেই। তাঁরা নিজেদের রক্ষা করতে শিখেছেন।

তবে ওয়াইপিজে সামরিক সংগঠন হিসেবে টিকে থাকবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু সংগঠন বিলুপ্ত হলেও এর আদর্শ টিকে থাকবে বলে মনে করেন রুকসান মোহাম্মদ। তাঁর মতে, নারীরা ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন—তাঁরা হয়তো আজ নেই, কিন্তু তাঁদের অর্জন ও দর্শন থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া যায়।

রুকসান বলেন, ওয়াইপিজে শুধু একটি সামরিক বাহিনী নয়, এটি তাঁদের জীবন ও সংস্কৃতির অংশ। সংগঠনটি অস্তিত্ব হারালেও তাঁদের সংগ্রাম থামবে না।

সিরিয়ার নতুন ভূ-রাজনীতি ও সামরিক কাঠামোর পুনর্গঠনে শেষ পর্যন্ত এই ঐতিহ্যবাহী নারী বাহিনীর স্থান কোথায় গিয়ে ঠেকে, তা এখনো অস্পষ্ট। তবে বন্দুক ছেড়ে কেরানির কাজে ফিরতে নারাজ এই নারী যোদ্ধারা। কারণ, অস্ত্র হাতে এই নারীরা এখন নিজেদের রক্ষা করতে শিখেছেন।

‘দ্য টাইম’ থেকে অনূদিত