কূটনীতিতে নারী
১৫০৭ সালে ক্যাথরিন অব অ্যারগন স্পেনের দূত হয়ে ইংল্যান্ডের মাটিতে পা রাখেন। এরপর ১৫২৯ সালে ফ্রান্সের লুই অব স্যাভয় এবং অস্ট্রিয়ার মার্গারেট মিলে ইতিহাসের বিখ্যাত ‘লা পেক্স দেস দামেস’ বা নারীদের শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তখন পর্যন্ত বিশ্বরাজনীতিতে ‘জেন্ডার ইকুয়ালিটি’ শব্দটির জন্ম হয়নি। ইতিহাস বলে, কূটনীতির মঞ্চ কখনোই শুধু পুরুষদের একচেটিয়া ছিল না। কিন্তু উনিশ শতকে এসে বৈদেশিক মন্ত্রণালয়গুলোর পেশাদারীকরণ শুরু হলে নারীদের ভূমিকা সংকুচিত হয়ে পড়ে। শুধু অদৃশ্য অনানুষ্ঠানিক চাণক্য হিসেবে সেখানে রাখা হয় নারীদের। তাঁদের কাজ ছিল রাষ্ট্রদূত স্বামীদের কূটনৈতিক যাপনকে নিখুঁতভাবে সামলানো। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে, সেই অদৃশ্য দেয়াল কি আসলেই ভেঙেছে, নাকি শুধু রূপ বদলেছে।
সুইডেনের গুটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জেনডিপ’ প্রোগ্রাম এবং আনোয়ার গারগাশ ডিপ্লোমেটিক একাডেমির ২০২৫-২৬ সালের বৈশ্বিক সূচকগুলো পর্যালোচনা করলে একটি মিশ্র চিত্র ফুটে ওঠে। ১৯৬৮ সালে বিশ্বের মোট রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ছিল শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক পর, ২০২১ সালে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ২০ শতাংশে। এরপর ২০২৪ সালে তা উন্নীত হয় ২১ শতাংশে। তবে ২০২৫ সালে ১৬৪টি দেশের ওপর ভিত্তি করে সর্বশেষ বৈশ্বিক ট্র্যাক রেকর্ড অনুযায়ী এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে।
আঞ্চলিক বৈচিত্র্য
বিশ্বের সব প্রান্তে নারীদের এই প্রতিনিধিত্ব এক রকম নয়। তবে ২০২৫ সালের সূচক অনুযায়ী আঞ্চলিক বিভাজনের একটি চিত্র তুলে ধরা যায়। যেখানে আমেরিকা ও ইউরোপ—এই দুই অঞ্চলে নারী রাষ্ট্রদূতদের গড় হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ২৯ শতাংশ। এই হিসাব ২০২৪ সালে আমেরিকার জন্য ২৮ শতাংশ এবং ইউরোপের জন্য ছিল ২৭ শতাংশ। উত্তর আমেরিকার চার দেশ কানাডা, মেক্সিকো, সুরিনাম এবং যুক্তরাষ্ট্রের গড় হার ৩৯ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকা বাদে আফ্রিকার অন্যান্য অংশে এই হার ২০২৪ সালের ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
তিউনিসিয়া, মরক্কো, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকের অগ্রগতির কারণে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে এই হার সামান্য বেড়ে ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত দেশগুলোতে এই হার ৬ শতাংশ।
এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ১৩ শতাংশ নিয়ে শীর্ষে। ২০২৫ সালে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা ছিল এশিয়া। এটিই একমাত্র অঞ্চল, যেখানে নারী রাষ্ট্রদূতের হার গত বছরের ১৪ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ কমে ১৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
শুধু দেশভিত্তিক হিসাব করলে দেখা যায় যে বেলিজ, লিচেনস্টাইন ও নিউজিল্যান্ড ২০২৫ সালে তাদের শীর্ষ কূটনৈতিক পদে ৫০ শতাংশ নারী নিয়োগ দিয়ে পূর্ণ সমতা অর্জন করেছে। নেদারল্যান্ডস ও নরওয়ে রয়েছে ৪৯ শতাংশে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্র এই সমতার খুব কাছাকাছি, অর্থাৎ ৪০ থেকে ৪৮ শতাংশে অবস্থান করছে। এদিকে পিছিয়ে আছে ইউরোপের দেশগুলো। ইতালি ও চেক প্রজাতন্ত্রে এই হার মাত্র ১২ শতাংশ, বেলারুশে হলো ২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং রাশিয়ায় মাত্র ১ শতাংশ। এশিয়ার মধ্যে ফিলিপাইন ৩৯ শতাংশ নিয়ে চমৎকার অবস্থানে থাকলেও তাজিকিস্তান, আফগানিস্তান, কাজাখস্তান এবং উত্তর কোরিয়ায় এই হার মাত্র ৩ শতাংশ। তথ্য হলো, উজবেকিস্তানে কোনো নারী রাষ্ট্রদূত নেই।
গুটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অ্যান টাউনস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাঠামোগত ত্রুটি চিহ্নিত করেছেন। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোতে জুনিয়র কিংবা প্রবেশনারি স্তরের কূটনীতিকদের অন্তত অর্ধেক, কোথাও কোথাও তার চেয়ে বেশি অংশ নারী। কিন্তু যখনই শীর্ষ পদ বা রাষ্ট্রদূত নিয়োগের সময় আসে, তখন পুরুষেরাই রহস্যজনকভাবে অগ্রাধিকার পেয়ে যায়। যদিও এর পেছনে কাজ করছে তিনটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত বাধা।
১৯৯২-২০১৯ সালের ৪০টি শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে তৈরি জাতিসংঘের একটি মেটা-অ্যানালাইসিস দেখাচ্ছে, যে শান্তিচুক্তিতে নারীরা সরাসরি অংশ নেন, সেই চুক্তিগুলো পুরুষদের একা করা চুক্তির চেয়ে ১৫ বছরের বেশি স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। অথচ দুঃখজনকভাবে সত্য হলো, সে সময়ে বিশ্বে শান্তি আলোচনায় মাত্র ১৩ শতাংশ মধ্যস্থতাকারী এবং ৬ শতাংশ সমঝোতাকারী ছিলেন নারী। নারীরা শুধু টেবিলে বসলেই শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হয় না, তাঁরা নাগরিক সমাজ ও প্রতিনিধিদলের মধ্যে একধরনের ‘সেতুবন্ধ’ হিসেবে কাজ করেন। তা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জটিল সংকটে নারীরা সামাজিক ন্যায়বিচারকে যুক্ত করতে পারেন, যা বন্যা অথবা খরায় বাস্তুচ্যুত নারী এবং শিশুদের অধিকার রক্ষায় সরাসরি ভূমিকা রাখে। এমনকি কঠোরভাবে পিতৃতান্ত্রিক এবং লিঙ্গ-বিভাজিত সমাজে একজন পুরুষ কূটনীতিক যেসব নারী নেটওয়ার্ক কিংবা সামাজিক বলয়ে প্রবেশাধিকার পান না, সেখানে একজন নারী কূটনীতিক অনায়াসে পৌঁছাতে পারেন।
সূত্র: ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন, ২০২৫ উইমেন ইন ডিপ্লোমেসি ইনডেক্স, ইউএন উইমেন