হোম > নারী

আন্তর্জাতিক নারী

কুঁড়েঘরে নারীদের বড় স্বপ্ন বুনছেন কাইলি

ফিচার ডেস্ক

কাইলি ডিক্সন মাশরুমকে গল্পের চরিত্র বানিয়ে শিশুদের জন্য বই লিখেছেন এবং তৈরি করেছেন মাশরুম-অনুপ্রাণিত শিল্পকর্ম। ছবি: সংগৃহীত

ইংল্যান্ডের ইস্ট ডারহামের সিহ্যামের এক অ্যালটমেন্টের কুঁড়েঘরে প্রতিদিন জড়ো হন নানা বয়সের নারী। কেউ নিয়ে আসেন তাঁদের অসমাপ্ত স্বপ্ন, কেউবা জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার সাহস। আর তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে কাইলি ডিক্সন বারবার মনে করিয়ে দেন, কোনো আইডিয়াকে সবাই আজব বলে উড়িয়ে দিলেও, সেটিই একদিন হতে পারে একটি সফল ব্যবসার ভিত্তি। ব্যাংকের নিরাপদ চাকরি ছেড়ে মাশরুমের ছবি এঁকে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া এই নারী আজ অসংখ্য নারীর কাছে হয়ে উঠেছেন আশা, সাহস এবং নতুন শুরুর প্রতীক।

কাইলি ডিক্সন এমবিই যুক্তরাজ্যের নাগরিক। তিনি ইংল্যান্ডের কাউন্টি ডারহামের সিহাম অঞ্চলের একজন উদ্যোক্তা ও লেখক। তিনি দ্য নর্দার্ন ল্যাস লাউঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা। ২০২০ সালে গড়ে ওঠা এই অনলাইন কমিউনিটির উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসা শুরু করা এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী নারীদের সহায়তা করা। প্ল্যাটফর্মটি দ্রুতই বিস্তৃত হয়েছে এবং বর্তমানে এটি মেন্টরিং, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও পারস্পরিক সহায়তার মাধ্যমে সরাসরি প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জন এবং পরোক্ষভাবে ২০ হাজারের বেশি নারীকে সহায়তা করছে।

পরে দ্য নর্দার্ন ল্যাস লাউঞ্জ একটি লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত হয়, যার একটি সামাজিক উদ্যোগ এবং সাত সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ রয়েছে। তাদের লক্ষ্য, জাতীয় পর্যায়ে তাদের কার্যক্রমের প্রভাব আরও বিস্তৃত করা। নারী ব্যবসায়ে বিশেষ অবদানের জন্য কাইলি রাজা তৃতীয় চার্লসের জন্মদিনের মেম্বার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।

৪৫ বছর বয়সী কাইলি ডিক্সন ২০১৫ সালে ইউনিভার্সিটি অব সান্ডারল্যান্ড থেকে ফাইন আর্টে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, পৃথিবীর সবচেয়ে আজব বা ব্যতিক্রমী আইডিয়াটিও একদিন সফল ব্যবসায় পরিণত হতে পারে। তিনি একটি ব্যাংকে টানা ১৮ বছর চাকরি করেছেন। স্থায়ী আয় আর নিরাপদ জীবন—সবই ছিল তাঁর। কিন্তু মনের ভেতরে ছিল অন্য এক ডাক। সেই ডাকে সাড়া দিয়েই একদিন চাকরি ছেড়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন নিজের স্বপ্নের পথে। আজ সেই সিদ্ধান্তের কথা বলতে গিয়ে কাইলির কণ্ঠে ফুটে ওঠে আত্মবিশ্বাসের উজ্জ্বল হাসি। তিনি বলেন, ‘আমি মাশরুমের ছবি এঁকে একটি সফল ব্যবসা গড়ে তুলেছি’।

কাইলি শুধু ছবি আঁকাতেই থেমে থাকেননি। মাশরুমকে গল্পের চরিত্র বানিয়ে শিশুদের জন্য বই লিখেছেন, তৈরি করেছেন মাশরুম-অনুপ্রাণিত শিল্পকর্ম এবং নানা ধরনের পণ্য। অনেকেই তাঁর এই ভিন্নধর্মী পথচলায় অবাক হয়ে দেখেছেন। কিন্তু কাইলির কাছে এটি ছিল নিজের সৃজনশীলতা বিশ্বাস করার গল্প। তিনি বলেন, ‘মানুষ আমাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়। তারা ভাবে, যদি আমি এটা করতে পারি, তাহলে তারাও তাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।’

তাঁর প্রথম ব্যবসা মাশরুম মার্ভেলাস গড়ে উঠেছিল তাঁর আঁকা ছবি ও শিল্পকর্ম থেকে। পরে এটি শিশুতোষ বইয়ের সিরিজ ‘দ্য ম্যাজিক্যাল ওয়ার্ল্ড অব মাশরুম মার্ভেলাস’-এ রূপ নেয়। এটি আঞ্চলিকভাবে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

নারী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৫ সালে কাইলি মেম্বার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার বা এমবিই সম্মাননায় ভূষিত হন। ২০২০ সালে, যখন তিনি দেখলেন কম খরচে ব্যবসা শুরু করার জন্য নারীদের সহজ পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত, সে সময় কাইলি গড়ে তোলেন অনলাইন কমিউনিটি দ্য নর্দার্ন ল্যাস লাউঞ্জ। ধীরে ধীরে সেটিই হয়ে ওঠে শত শত স্বপ্নবাজ নারীর নিরাপদ আশ্রয়।

বর্তমানে সিহ্যামের কমিউনিটি অ্যালটমেন্টের সেই ছোট্ট ঘরটি এখন নারীদের স্বপ্ন বুননের ঠিকানা। এখানে বসে তাঁরা ব্যবসার পরিকল্পনা করেন, নিজেদের ভয়-সংশয় ভাগাভাগি করেন, আবার একে অপরের সাফল্যে আনন্দও উদ্‌যাপন করেন।

তবে পথটা মোটেও সহজ ছিল না। ব্যবসা শুরু করার পর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। ব্যবসার কর কীভাবে পরিশোধ করবেন, ওয়েবসাইট কীভাবে তৈরি করবেন, অর্থায়ন কোথা থেকে পাবেন—এসব প্রশ্নই অনেকের আত্মবিশ্বাস নাড়িয়ে দেয়। পরিসংখ্যানও সেই কঠিন বাস্তবতার কথাই বলে। জেন্ডার ইনডেক্স ২০২৫ অনুযায়ী, উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ডের মাত্র ১৫ শতাংশ ব্যবসা নারীদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। অন্যদিকে, ওম্যান অ্যান্ড ইকুয়ালিটিস কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ভেঞ্চার ক্যাপিটালের মাত্র ২ শতাংশ অর্থ নারী প্রতিষ্ঠাতাদের হাতে পৌঁছায়, যেখানে শুধু পুরুষদের নিয়ে গঠিত দলগুলো পায় মোট তহবিলের প্রায় ৮০ শতাংশ।

কাইলির ভাষায়, ‘অনেক নারী এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েন যে একসময় মনে হয় তাঁদের কণ্ঠ যেন চাপা পড়ে যায়।’ সংসারের দায়িত্ব, সন্তান লালন-পালন, এমনকি মেনোপজের মতো শারীরবৃত্তীয় অভিজ্ঞতাও একজন নারী উদ্যোক্তার পথ কঠিন করে তোলে। তাই তিনি মনে করেন, শিশু যত্নের আরও ভালো ব্যবস্থা, নিউরোডাইভার্স নারীদের জন্য বিশেষ সহায়তা এবং শক্তিশালী নারী রোল মডেল তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।’

সবুজে ঘেরা সেই ছোট্ট অ্যালটমেন্ট ঘরটির দিকে তাকিয়ে কাইলি বলেন, ‘এটা জাদুকরি। এখানে এলেই শৈশবের স্মৃতি ফিরে আসে।’ তাঁর চোখে এই ঘর শুধু কাঠ আর ইটের একটি কাঠামো নয়, এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে অনেকের সাহস জন্ম নেয়, অনেকের স্বপ্নগুলো ডানা মেলে আর নারীরা নতুন করে বিশ্বাস করতে শেখেন তাঁদের ব্যতিক্রমী ধারণাগুলোও একদিন পৃথিবী বদলে দিতে পারে।

সূত্র: বিবিসি এবং অন্যান্য