বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে প্রতি তিন কিশোরীর মধ্যে দুজন মাসিক-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে। এর মধ্যে অনেকের তীব্র ব্যথায় দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে, এমনকি স্কুলেও অনুপস্থিত থাকতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) অ্যাডসার্চ পরিচালিত এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার (এসআরএইচআর) বিষয়ক জ্ঞানেও বড় ঘাটতি রয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, এ বিষয়ে তাদের জন্য আরও আগে থেকেই কার্যকর শিক্ষা ও তথ্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার কানাডা ক্লাবে আয়োজিত এক সেমিনারে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। এতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের প্রতিনিধি ও উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন।
আইসিডিডিআরবির বালিয়াকান্দি হেলথ অ্যান্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভেইল্যান্স সিস্টেমের (এইচডিএসএস) আওতায় ২ হাজার ৭১৩ কিশোর-কিশোরীর ওপর ২৪ মাস ধরে এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতি চার মাস পরপর অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী ১ হাজার ২৫৫ কিশোরীর মধ্যে ৬৪ শতাংশ অন্তত একটি মাসিক-সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগেছে। সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে মাসিকের তীব্র ব্যথা বা ডিসমেনোরিয়া, যা ছিল ৫৬ শতাংশ কিশোরীর মধ্যে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রতি তিন কিশোরীর একজন জানিয়েছে, গবেষণাকালে তিন বা তার বেশি মাসিক চক্রে তারা তীব্র ব্যথার সম্মুখীন হয়েছে। ৯ শতাংশ কিশোরী নিয়মিত মাসিকের ব্যথায় ভুগেছে। প্রায় ৪০ শতাংশ জানিয়েছে, ব্যথার কারণে তাদের দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয়েছে। এ ছাড়া তীব্র ব্যথা বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে প্রতি চার কিশোরীর মধ্যে একজন স্কুলে যেতে পারেনি।
বালিয়াকান্দি ও রাজবাড়ীর ১ হাজার ৭৭ জন ১৬ বছর বয়সী অবিবাহিত কিশোর-কিশোরীর ওপর পৃথক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে তাদের জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। এক-তৃতীয়াংশের বেশি কিশোর জানত না যে ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার পর মেয়েরা গর্ভবতী হতে পারে। কিশোরীদের মধ্যে এই হার ছিল ১৬ শতাংশ।
পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কেও কিশোর-কিশোরীদের ধারণা সীমিত। গবেষণায় দেখা যায়, ৮৪ শতাংশ কিশোর কনডম সম্পর্কে জানলেও কিশোরীদের মধ্যে এই হার ৪৫ শতাংশ। জরুরি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সম্পর্কে জানে ৩৮ শতাংশ কিশোর, আর কিশোরীদের মধ্যে এই হার মাত্র ৪ শতাংশ।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বিয়ের আগে প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে জ্ঞান থাকলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি কমে। যেসব মেয়ে বিয়ের আগে পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানত, তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের হার ছিল ৫ শতাংশ; জ্ঞান না থাকা মেয়েদের ক্ষেত্রে তা ছিল ১০ শতাংশ।
অনুষ্ঠানে অ্যাডসার্চের দুটি উদ্ভাবনী প্রকল্পও তুলে ধরা হয়। এগুলোর মধ্যে চাঁদপুরের মতলবে স্মার্টফোনভিত্তিক একটি শিক্ষা প্রকল্পে ৮৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী ইতিবাচক মত দিয়েছে। এ ছাড়া ‘কৈশোর কথা’ নামে একটি বিনা মূল্যের বাংলা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে অ্যানিমেশন, ইনফোগ্রাফিকস ও প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য দেওয়া হচ্ছে।
আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ড. ফাওজিয়া আখতার হুদার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ফারহানা দেওয়ান, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের উপদেষ্টা সৈয়দ মো. নুরুদ্দীন, বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ফাইন্যান্সিং ফ্যাসিলিটির কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর নন্দিনী লোপা, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ডা. মো. মনজুর হোসেন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডা. আসিফ ইকবাল।
আলোচনায় বক্তারা মাসিক নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার দূর করা, স্কুলভিত্তিক স্বাস্থ্যশিক্ষা জোরদার, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং কিশোর-কিশোরীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডিয়ান হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি-ডেভেলপমেন্ট (হেলথ) এডওয়ার্ড কাবরেরা বলেন, কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার নিশ্চিত করতে ‘গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা’ বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।