হোম > নারী

কিশোরীদের সরব জীবনে অন্তরালের শিক্ষকেরা

আব্দুল বাশির, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি

দারিদ্র্য, লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা বাল্যবিবাহের আশঙ্কা কাটিয়ে, অভাব-অনটন আর সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতা পায়ে দলে একদল কিশোরী ছুটছে ফুটবল মাঠে! তাদের মধ্যে কারও গায়ে উঠেছে জাতীয় দলের জার্সি, কেউ খেলছে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে। কেউ আবার ফুটবল ও অ্যাথলেটিকস—দুই ক্ষেত্রে ভালো করার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার পথে। এই স্বপ্নপূরণে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুই ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ। তাঁদের একজন শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট ইউনিয়নের পুকুরিয়া গ্ৰামের রাইজিং কুইন্স স্পোর্টস একাডেমির লাইসেন্সধারী কোচ মো. সেতাউর রহমান, অন্যজন সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের আতাহার গ্ৰামের মাসুদ-উল হক ইনস্টিটিউটের শারীরিক শিক্ষা বিভাগের সহকারী শিক্ষক ওয়াহেদুল ইসলাম।

সেতাউর রহমানের পথচলা

রাইজিং কুইন্স স্পোর্টস একাডেমির সেতাউর রহমান চার বছর ঠাকুরগাঁওয়ে কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে আসেন তিনি। এখানে ৩৫ জন কিশোরীকে নিয়ে শুরু করেন নারী ফুটবল একাডেমির কার্যক্রম।

গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের ফুটবল খেলা নিয়ে আছে নানান সামাজিক বাধা। মেয়েদের পরিবার ও সমাজের বাধায় পড়েও থেমে যাননি সেতাউর রহমান। তাঁর একাডেমিতে এখন ব্যাচে নিয়মিত অনুশীলন করছে ২৫ জন স্কুলপড়ুয়া কিশোরী। তারা অনূর্ধ্ব-১৪ ও ১৭ এবং জেলা, বিভাগীয়, ঢাকা ও বিভিন্ন স্কুল পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে এরই মধ্যে সুনাম অর্জন করেছে। তাদের নিয়ে গর্বিত অভিভাবক ও স্কুলের শিক্ষকেরা। তাঁর একাডেমি থেকে জাতীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ পেয়েছে সোহাগী কিসকু, কোহাতি কিসকু, গোলরক্ষক সাগরিকা, মুন্নী ও স্বপ্না রানী।

ওয়াহেদুল ইসলামের গল্প

২০০৯ সাল থেকে কিশোরীদের ফুটবল ও অ্যাথলেটিকস শিখিয়ে চলেছেন মাসুদ-উল হক ইনস্টিটিউটের শারীরিক শিক্ষা বিভাগের সহকারী শিক্ষক ওয়াহেদুল ইসলাম। ১৭ কিশোরীকে নিয়ে শুরু করা তাঁর দল বিভাগীয়, অনূর্ধ্ব-১৪ ও ১৭ পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সুনাম অর্জন করেছে। অ্যাথলেটিকসেও তাঁর দলের শিক্ষার্থীরা জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। সম্প্রতি তাঁর দলের দুজন খেলোয়াড় নতুন কুঁড়ির ফুটবল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তাঁর দলের সাহিমা সরেন এখন স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনার পাশাপাশি ওয়াহেদুল ইসলামের সহকারী রেফারি হিসেবেও কাজ করছেন।

ওয়াহেদুল ইসলাম জানিয়েছেন, তাঁর দলের অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় বাল্যবিবাহের কারণে ঝরে পড়েছে। আবার কখনো বিয়ের আয়োজনের খবর পেয়ে পরিবারকে বুঝিয়ে সেই বিয়ে বন্ধ করে খেলোয়াড়কে মাঠে ফিরিয়ে আনতে হয়েছে তাঁকে।

শুধু প্রতিপক্ষ দল নয়, সমাজের সঙ্গেও সমানতালে লড়ে চলেছেন দুই ক্রীড়াপ্রেমী কোচ। তাঁদের লড়তে হচ্ছে সমাজের প্রচলিত ধারণা ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে।

সেতাউর রহমান জানান, কিশোরীদের খেলাধুলায় ধরে রাখার পাশাপাশি বাল্যবিবাহ ঠেকাতেও পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে হয়। আর্থিক টানাপোড়েন, পরিবারের চাপ, সামাজিক চাপ—সবকিছু মোকাবিলা করেই কিশোরীদের মাঠে রাখতে হয়। তিনি চান, মেয়েরা আগে নিজের পায়ে দাঁড়াক, নিজের স্বপ্ন পূরণ করুক। তারপর অন্য কিছু।

ওয়াহেদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এই সংগ্রামটা প্রতিদিনের যুদ্ধের মতো। তবে মেয়েদের খেলাধুলার মধ্যে রাখতে পারলে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে পারে।’

সেতাউর রহমানের একাডেমির অনেক খেলোয়াড় নিম্ন আয়ের অসচ্ছল পরিবারের সন্তান। তাই ফুটবল শেখানোর পাশাপাশি তাদের পড়াশোনা যাতে বন্ধ না হয়, সেদিকেও নজর রাখেন তিনি। খেলোয়াড়দের বই-খাতা, সাইকেলসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ কিনে দেওয়ার পাশাপাশি কখনো কখনো পড়াশোনার খরচও বহন করেন তিনি। বাড়ি থেকে মাঠে যাতায়াতের সুবিধার জন্য অটোরিকশার ব্যবস্থাও করেছেন। কোনো খেলোয়াড়ের পরিবার আর্থিক সংকটে পড়লে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করেন তিনি। নিজের আয় থেকে খেলোয়াড়দের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে তাঁকে অনেক সময় আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হয়। ফলে অনেক কিশোরীর কাছে একাডেমিটি শুধু ফুটবল প্রশিক্ষণের জায়গা নয়, হয়ে উঠেছে নিরাপদ আশ্রয়।

অন্যদিকে, ওয়াহেদুল ইসলামের দলের কিশোরীদের প্রতি মাসে মহানন্দা ট্রাস্টের উদ্যোগে দেড় হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়। বিদ্যালয়ের আনুষঙ্গিক ফিও মওকুফ করা হয়েছে। খেলোয়াড়দের যাতায়াতের জন্য সাইকেল দেওয়া হয়েছে। তারা খেলাধুলার পাশাপাশি যত দিন পড়াশোনা করবে, ট্রাস্ট থেকে তাদের শিক্ষার খরচ বহন করা হবে।

মাঠে তৈরি হচ্ছে আত্মবিশ্বাস

কৈশোরে শারীরিক ও মানসিক নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয় কিশোরীদের। সামাজিক বিধিনিষেধ, বাল্যবিবাহের চাপ কিংবা আত্মবিশ্বাসের অভাব অনেক সময় তাদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফুটবল ও অ্যাথলেটিকস সেই জায়গায়ও পরিবর্তন আনছে। নিয়মিত অনুশীলন, দলবদ্ধভাবে খেলাধুলা এবং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে কিশোরীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে আত্মবিশ্বাস। তারা শিখছে নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও পরিশ্রমের মূল্য।

ওয়াহেদুল ইসলামের দলের সাবেক খেলোয়াড় সাহিমা সরেন এখন দলের সহকারী রেফারি। তিনি বলেন, ‘স্যারের অবদান ভোলার মতো নয়। তিনি আমার মতো বহু কিশোরীকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার ভরসা দিয়েছেন। বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তির পথও দেখিয়েছেন।’

স্বীকৃতি

কিশোরীদের খেলাধুলায় যুক্ত করা, নারী ফুটবলের প্রসার এবং সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখায় সেতাউর রহমান পেয়েছেন উদ্দীপন ও রোটারি ক্লাবের সম্মাননা। ওয়াহেদুল ইসলামও পেয়েছেন বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরস্কার।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোনো মাঠে যখন কিশোরীরা ফুটবল নিয়ে দৌড়ায়, তখন তাদের সঙ্গে ছুটে চলে বাল্যবিবাহ থেকে মুক্তির স্বপ্ন, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন এবং জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানোর স্বপ্ন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা আবু জাফর মাহমুদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা মনে করি, বিভিন্ন পর্যায়ের খেলাধুলায় কিশোরীদের সম্পৃক্ততা তাদের বাল্যবিবাহ থেকে দূরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে অনূর্ধ্ব-১৪ ফুটবল প্রতিযোগিতায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের মেয়েরা অংশ নিয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল।’

সেতাউর রহমান ও ওয়াহেদুল ইসলাম জানান, মাঠে একটি কিশোরীর হাসিমুখ, বাল্যবিবাহের আয়োজন থেকে ফিরে এসে আবার অনুশীলনে যোগ দেওয়া কিংবা কোনো খেলোয়াড়ের জাতীয় পর্যায়ে সুযোগ পাওয়াই তাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।