আন্তর্জাতিক নারী
টিকটকের ফিড স্ক্রল করতে করতে চোখ থমকে গেল একটা ভিডিওতে। স্ক্রিনে তখন এক জেন-জি তরুণী বেশ মজা করে আচার খাচ্ছেন। হ্যাশট্যাগ #পিকল-এর ভিউ তখন বিলিয়ন ছাড়ানোর পথে। একই সঙ্গে বিলিয়ন দর্শকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে আচার তৈরির প্রতিষ্ঠান ‘গুড গার্ল স্ন্যাকস’-এর নাম।
এই আচারের ব্র্যান্ড তৈরি করেছেন দুই বন্ধু লিয়া মার্কাস ও ইয়াসামান বখতিয়ার। তাঁরা খেয়াল করেছিলেন, বাজারে পাওয়া আচারের প্যাকেটগুলো সেকেলে। আবার স্বাস্থ্যসচেতন জেন-জি প্রজন্মের মনমতো অরগানিক ও তাজা উপাদানের ঘাটতিও ছিল আগের আচারে। সোশ্যাল মিডিয়ার জোয়ার আর বাজারের খালি জায়গাটির মাঝখানেই নতুন সম্ভাবনার আলো দেখতে পেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া দুই বন্ধু।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের পাট চুকিয়ে লিয়া কাজ করছিলেন এক টেক স্টার্টআপে আর ইয়াসামান ডুবে ছিলেন শিল্পকলার জগতে। তবে বছরখানেকের মধ্যেই করপোরেট জীবনের ছকবাঁধা একঘেয়েমি দুজনকে গ্রাস করে। ঠিক এমন সময়, ২০২৩ সালের দিকে সামাজিক মাধ্যমে তুঙ্গে থাকা আচারের ট্রেন্ড দেখে ইয়াসামান কৌতূহলবশত লিয়াকে মেসেজ পাঠালেন, ‘আমরা আচার বানানোর একটা প্রতিষ্ঠান খুললে কেমন হয়?’ দুই তরুণীর কৌতূহল আর সাহসের ওপর ভর করে শুরু হয় একটি প্রতিষ্ঠানের রোমাঞ্চকর পথচলা। কয়েক দিনের মধ্যে ওয়েবসাইটের ডোমেইন কেনা থেকে শুরু করে ৯ মাসের নিরলস প্রস্তুতি। চাকরি ছেড়ে দিয়ে তাঁরা দুজনে ঝাঁপিয়ে পড়েন অনিশ্চিত কিন্তু স্বপ্নের এক ব্যবসায়িক অভিযানে। এভাবেই জন্ম নেয় জেন-জি প্রজন্মের পছন্দের ঘরোয়া স্ন্যাকস ব্র্যান্ড ‘গুড গার্ল স্ন্যাকস’।
তাঁদের এই পথচলা একেবারেই সহজ ছিল না। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বেড়ে ওঠার পাশাপাশি লিয়া ও ইয়াসামানের পরিবার যথাক্রমে মিসরীয়, তিউনিসীয় এবং ইরানি (পার্সিয়ান) ঐতিহ্যের অংশ। মধ্যপ্রাচ্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও পারিবারিক রুচিকে তাঁরা তাঁদের পণ্যে ছড়িয়ে দিতে চাইলেন। আচার তৈরিতে তাঁরা ব্যবহার করলেন হলুদ ও সরিষার মতো ভিন্নধর্মী ও সমৃদ্ধ মসলা। বাজারে এল তাঁদের প্রথম আইকনিক সৃষ্টি ‘হট গার্ল পিকলস’।
লিয়া ও ইয়াসামানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁদের ব্র্যান্ডিং ও বিল্ডিং ইন পাবলিক বা সততার সঙ্গে ব্যবসার গল্প তুলে ধরার কৌশল। খাবারের ব্যবসায় পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় তাঁরা এটাকে আশীর্বাদ হিসেবে নেন। ২০২৩ সালের ১ অক্টোবর থেকে প্রতিদিন তাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দেওয়া শুরু করেন। নিজেদের ভুলভ্রান্তি, হাসি-ঠাট্টা আর উদ্যোক্তা জীবনের আসল রূপ কোনো রূপক ছাড়াই ক্যামেরায় তুলে ধরেন।
এমনকি ব্যবসায়িক চরম বিপদের দিনগুলো নিয়েও তাঁরা কনটেন্ট তৈরি করেছেন। একবার শিপিংয়ের ভুলের কারণে প্রায় ৩ হাজার পাউন্ড শসা ঠান্ডায় জমে গিয়ে পুরো চালানটি নষ্ট হয়ে যায়। আরেকবার মেক্সিকোর ঝড় তাঁদের সব ফসল নষ্ট করে দেয়। এগুলোকে তাঁরা রসিকতা করে ‘কুকাম্বার গেট’ নামে সিরিজে শেয়ার করলে তা ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়। জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার অ্যালিক্স আর্ল তাঁদের আচার খোলার এক মজার ভিডিও পোস্ট করেন। ভিডিওটি এক রাতেই শত শত অর্ডার আসতে শুরু করে। এক ডলারও পেইড বিজ্ঞাপনে খরচ না করে শুধু সততা ও অরগানিক কনটেন্টের জোর দিয়ে তাঁরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশাল জনপ্রিয়তা পান।
অবশ্য মিষ্টি গল্প দিয়ে শুধু সফল ব্যবসা চলে না। লিয়া ও ইয়াসামান সোশ্যাল মিডিয়ায় যতটা খোলামেলা, পেছনের অপারেশনস, মার্কেট রিসার্চ ও ডেটার বিশ্লেষণে ছিলেন ঠিক ততটাই শক্ত। কোল্ড ই-মেইল ও লিংকডইনের মাধ্যমে তাঁরা ফুড ইন্ডাস্ট্রির অভিজ্ঞ পরামর্শক ও ফুড সায়েন্টিস্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রোডাক্টের মান উন্নত করেন। ক্রেতাদের মতামত শুনে বড় আচারের বদলে মুচমুচে ছোট আকারের শসা ব্যবহার শুরু করেন। এই সুচিন্তিত পরিকল্পনার বলেই ২০২৪ সালে ব্যবসা শুরুর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে তাঁদের প্রোডাক্ট প্রথমবার সেল-আউট হয়ে যায়। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ইরেওন এবং হোল ফুডসের মতো যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা ও অভিজাত সুপারমার্কেটগুলোতে জায়গা করে নেয় গুড গার্ল স্ন্যাকস।
এ বছর সুইজারল্যান্ডে ২ হাজারের বেশি আউটলেটে নিজেদের স্ন্যাকস পৌঁছে দেওয়া এবং একটি গ্লোবাল ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন লিয়া মার্কাস ও ইয়াসামান বখতিয়ার। দুই বন্ধুর শুরু করা সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ জেন-জি প্রজন্মের ঘরোয়া ব্র্যান্ডে পরিণত হওয়ার পথে।
সূত্র: গুড গার্ল স্ন্যাকস, সিএনবিসি