হোম > ল–র–ব–য–হ

বিশ্বের ‘সবচেয়ে সুন্দর’ শিশুদের কার কী পরিণতি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

বাঁ দিক থেকে থিলান ব্লনডু, বিয়র্ন আন্দ্রেসেন ও আনাস্তাসিয়া কানিয়াজেভা। ছবি: ডেইলি মেইল

গ্ল্যামার, আলো, আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইট—বাইরে থেকে দেখলে গ্ল্যামারের দুনিয়াকে মনে হয় এক রূপকথার জগৎ। বিশেষ করে যখন কোনো শিশুকে বিশ্বের ‘সবচেয়ে সুন্দর’ তকমা দেওয়া হয়, তখন সাধারণ মানুষের ধারণা থাকে, তাদের পুরো জীবনটাই হয়তো সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে কাটবে। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠটা সবসময় এক হয় না।

সম্প্রতি ২০ বছর ধরে বিশ্বের ‘সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে’ হিসেবে পরিচিত ফরাসি মডেল থিলান ব্লনডু প্যারিসে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে তাঁর দীর্ঘদিনের প্রেমিক ফরাসি ডিজে বেন আতালকে বিয়ে করেছেন। থিলানের এই রূপকথার মতো জীবনের গল্প আমাদের আনন্দ দিলেও, বিশ্বমঞ্চে ‘সবচেয়ে সুন্দর’ তকমা পাওয়া সব শিশু মডেলের ভাগ্য কিন্তু এতটা সহায় ছিল না। কারও জন্য এই খ্যাতি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে, আবার কারও জন্য তা বয়ে এনেছে চরম মানসিক বিপর্যয় ও ট্র্যাজেডি।

থিলান ব্লনডু: অভিশাপ জয় করে নতুন জীবনের শুরু

ফরাসি ফুটবলার প্যাট্রিক ব্লনডুর মেয়ে থিলান ব্লনডু মাত্র চার বছর বয়সে ২০০৫ সালে প্যারিসের চ্যাম্পস এলিসিসে প্রখ্যাত ডিজাইনার জঁ পল গটিয়েরের জন্য র‍্যাম্পে হেঁটে ফ্যাশন দুনিয়ায় ঝড় তোলেন। এর দুই বছর পর, মাত্র ছয় বছর বয়সে ‘ভোগ এনফ্যান্টস’ পত্রিকার কভারে তাঁর ছবি প্রকাশের পর বিশ্ব তাঁকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। তবে খ্যাতির অন্ধকার দিক নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে থিলান একবার বলেছিলেন, ‘আমি শুধু একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে বাঁচতে চেয়েছিলাম। এই তকমাটি ধরে রাখা আমার জন্য এক বড় মানসিক চাপ ছিল।’

১০ বছর বয়সে ‘ভোগ প্যারিস’-এর একটি ফটোশুটে থিলানকে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো মেকআপ, হিল জুতো এবং একটি লো-কাট গোল্ডেন পোশাকে উপস্থাপন করা হলে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। সমালোচকেরা একে ‘শিশুর যৌনকরণ’ বলে অভিহিত করেন। তবে থিলানের মা, ফ্যাশন ডিজাইনার ভেরোনিকা লুব্রি এই ছবির পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছিলেন, ‘এই ছবিতে আপত্তিকর যদি কিছু থাকে, তবে তা হলো থিলানের গলার ৩ মিলিয়ন ইউরো মূল্যের নেকলেসটি।’

তবে বিতর্ক পাশে ঠেলে থিলান তাঁর ক্যারিয়ার ধরে রাখেন। ২০১৭ সালে ১৬ বছর বয়সে মিলান ফ্যাশন উইকে ‘ডলচে অ্যান্ড গ্যাবানা’র হয়ে প্রাপ্তবয়স্ক মডেল হিসেবে তাঁর অভিষেক হয়। এরপর তিনি ল’রিয়াল-এর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হন এবং জর্ডান ডান ও গিগি হাদিদের মতো বিশ্বসেরা মডেলদের সঙ্গে কাজ করেন।

ডিজে বেন আতালকে সম্প্রতি বিয়ে করেছেন থিলান। ছবি: দ্য পিপল

বর্তমানে ২৫ বছর বয়সী থিলান তাঁর জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন। প্যারিসে ডিজে বেন আতালের সঙ্গে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাগদান ঘোষণার মাত্র তিন মাস পর তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের দিন সাদা রঙের কেপ-স্টাইল গাউন, বিশেষ হেয়ারস্টাইল এবং ক্যালা লিলি ফুলের তোড়া হাতে থিলানকে অপার্থিব সুন্দর লাগছিল।

ক্রিস্টিনা পিমেনোভা: ট্রল ও বিতর্কের দেয়াল পেরিয়ে রুপালি পর্দার স্বপ্ন

২০১৪ সালে থিলানের ‘সবচেয়ে সুন্দর শিশু’-এর মুকুটে ভাগ বসাতে আসেন রাশিয়ার মস্কোর ৮ বছর বয়সী কন্যা ক্রিস্টিনা পিমেনোভা। নীল চোখ আর সোনালি চুলের ক্রিস্টিনাকে ‘ওমেন ডেইলি’ ম্যাগাজিন বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে ঘোষণা করে। খুব দ্রুতই ফেসবুকে তার ২.১ মিলিয়নের বেশি লাইক এবং ইনস্টাগ্রামে লাখ লাখ ফলোয়ার জুটে যায়।

মাত্র ৯ বছর বয়সে ক্রিস্টিনা ‘ভগ’ এবং ‘আরমানি’-এর মতো বড় ব্র্যান্ডের মডেল হন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর ছবির নিচে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের কিছু আপত্তিকর মন্তব্য বিতর্ক তৈরি করে। অনেকেই ক্রিস্টিনার মা গ্লিকেরিয়া পিমেনোভাকে (যিনি নিজেও একজন প্রাক্তন মডেল) কাঠগড়ায় দাঁড় করান।

ক্রিস্টিনা পিমেনোভা। ছবি: ডেইলি মেইল

গ্লিকেরিয়া অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এই সমালোচনার জবাব দিয়ে বলেছিলেন, ‘যারা এই নিষ্পাপ ছবির মধ্যে যৌনতা খুঁজে পান, তাদের মানসিকতা একজন শিশুকামীর মতো এবং তাদের দ্রুত ডাক্তার দেখানো উচিত। আমার মেয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে খেলাচ্ছলে পোজ দিয়েছে, যা কোনোভাবেই কৃত্রিম বা যৌন উত্তেজক নয়।’

সমালোচনা ক্রিস্টিনাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। বর্তমানে ২০ বছর বয়সী ক্রিস্টিনা মডেলিংয়ের পাশাপাশি অভিনয়ে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য ড্রামা স্কুলে পড়াশোনা করছেন। ইতিমধ্যেই তিনি ‘দ্য রাশিয়ান ব্রাইড’ এবং এবং ‘ক্রিয়েটরস: দ্য পাস্ট’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ‘ব্ল্যাকপিঙ্ক’ ব্যান্ডের ভক্ত ক্রিস্টিনা এখন নিজের মতো করে জীবন উপভোগ করছেন।

বিয়র্ন আন্দ্রেসেন: সবচেয়ে সুন্দর ছেলের বেদনাদায়ক পরিণতি

শিশু খ্যাতির সবচেয়ে অন্ধকার এবং করুণ ইতিহাসটি সম্ভবত সুইডিশ অভিনেতা বিয়র্ন আন্দ্রেসেনের। ১৯৭১ সালে ইতালীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা লুচিনো ভিসকন্তি তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘ডেথ ইন ভেনিস’-এ তাদজিও চরিত্রের জন্য ১৫ বছর বয়সী বিয়র্নকে নির্বাচন করেছিলেন। ভিসকন্তি তাকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ছেলে’ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে পরিচয় করিয়ে দেন।

তবে বিয়র্নের শৈশব ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি কখনো তাঁর বাবার পরিচয় জানতে পারেননি এবং মাত্র ১০ বছর বয়সে তাঁর মা আত্মহত্যা করেন। দিদিমার ইচ্ছায় তিনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও অডিশন দিতে গিয়েছিলেন। অডিশনের সময় পরিচালক ভিসকন্তি তাঁকে অন্তর্বাস পরে পোজ দিতে বাধ্য করেছিলেন, যা কিশোর বিয়র্নের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে বিয়র্ন ভিসকন্তিকে একজন ‘সংস্কৃতিক শিকারি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন, যিনি সিনেমার প্রচারের জন্য একজন শিশুর সৌন্দর্যকে চরমভাবে শোষণ করেছিলেন।

চলচ্চিত্রের সাফল্যের পর প্যারিসে থাকার সময় ধনী পুরুষদের একটি দল বিয়র্নকে দামি খাবার ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের লোভ দেখিয়ে ব্যবহার করতে শুরু করে। নিষ্পাপ বিয়র্ন তখন বুঝতে পারেননি যে তাঁকে একটি ‘চলন্ত ট্রফি’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল।

বর্তমানে যে হালে আছেন বিয়র্ন আন্দ্রেসেন। ছবি: ডেইলি মেইল

প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে বিয়র্ন নারীদের প্রতি আকৃষ্ট হলেও স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি করতে ব্যর্থ হন। ১৯৮৪ সালে কবি সুজানা রোমানকে বিয়ে করলেও তাঁদের জীবন সুখের হয়নি। ১৯৮৭ সালে তাঁদের ৯ মাস বয়সী পুত্রসন্তান এলভিন মারা যায়। সেই রাতে মদ্যপ অবস্থায় ঘুমিয়ে থাকায় বিয়র্ন নিজেকে ছেলের মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন এবং তীব্র মানসিক অবসাদে ডুবে যান।

দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার পর ২০১৯ সালে তিনি বিখ্যাত হরর মুভি ‘মিডসোমার’-এ একটি ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন। অবহেলা, একাকিত্ব এবং মানসিক কষ্টের মধ্য দিয়ে জীবন পার করার পর, ২০২৫ সালের অক্টোবরে এই কালজয়ী সুন্দর মানুষটি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

আনা পাভাগা ও আনাস্তাসিয়া কানিয়াজেভা: রাশিয়ার দুই পুতুল-কন্যা

২০১৭ সালে রাশিয়া থেকে আরও দুজন শিশু মডেল বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়। তাঁরা হলেন—আনা পাভাগা এবং আনাস্তাসিয়া কানিয়াজেভা।

আনা পাভাগা

আনা পাভাগা মাত্র তিন বছর বয়স থেকে মডেলিং শুরু করেছিলেন। ২০১৭ সালে ৮ বছর বয়সে তিনি ‘রাশিয়ার সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে’ হিসেবে পরিচিতি পান। তবে আনার মা একাতেরিনা সবসময় মেয়ের স্বাভাবিক শৈশব নিশ্চিত করতে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি মডেলিংয়ের চেয়ে আনার ব্যালে নাচ ও জিমন্যাস্টিকসের প্রতি আগ্রহকে বেশি প্রাধান্য দেন। বর্তমানে ১৬ বছর বয়সী আনা ইনস্টাগ্রামে ১ মিলিয়নেরও বেশি ফলোয়ার নিয়ে একজন সফল ‘টিন মডেল’ এবং ব্যালে ড্যান্সার হিসেবে পরিচিত।

অন্যদিকে আনাস্তাসিয়া কানিয়াজেভা ৬ বছর বয়সে পুতুলের মতো চেহারা আর মায়াবী চোখ দিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। বড় বড় ব্র্যান্ডের মডেল হওয়ার পাশাপাশি তাঁকে অনেকেই পরবর্তী ‘ইরিনা শায়েক’ হিসেবে দেখছিলেন। তবে এত ছোট বয়সে মেকআপ করা এবং ক্যামেরার সামনে না হাসার কারণে তাঁর বাবা-মাকেও সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। বর্তমানে ১৫ বছর বয়সী আনাস্তাসিয়া মডেলিং ছেড়ে সংগীত ও টেলিভিশনে মনোযোগ দিয়েছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তাঁর একটি ক্রিসমাস সিঙ্গেল মুক্তি পায় এবং রাশিয়ার একটি রান্নার শো-তে তিনি নিয়মিত কাজ করছেন।

আনাস্তাসিয়া কানিয়াজেভা

শেষ কথা

সৌন্দর্য প্রকৃতির একটি চমৎকার উপহার। কিন্তু শৈশবেই সেই সৌন্দর্য যখন বাণিজ্যের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। থিলান ব্লনডু বা আনা পাভাগার মতো যারা সঠিক পারিবারিক সমর্থন পেয়েছেন, তারা হয়তো এই গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের বিষাক্ত দিকগুলো এড়িয়ে একটি সুন্দর জীবন বেছে নিতে পেরেছেন। কিন্তু বিয়র্ন আন্দ্রেসেনের মতো ট্র্যাজিক চরিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয়, খ্যাতির আলোর ঠিক নিচেই কতটা অন্ধকার লুকিয়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত, ‘বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর’ তকমাটি পাওয়ার চেয়ে একজন ‘স্বাভাবিক মানুষ’ হিসেবে সুস্থভাবে বাঁচতে পারাটাই জীবনের আসল সার্থকতা।

লটারিতে রাতারাতি কোটিপতি হওয়া বৌদ্ধ সন্ন্যাসী যে ঘোষণা দিলেন

ব্রাজিলীয় তিন বোনের সম্মিলিত বয়স ৩১৬ বছর, দীর্ঘায়ুর রহস্য নিয়ে চলছে গবেষণা

শীর্ষ ধনীদের গোপন ক্লাব: অদ্ভুত সব নিয়ম, নিজস্ব ধর্ম প্রচারসহ যেসব বিষয়ে চলে আলাপ

বিশ্বকাপে শুধু খেলা দেখেই ৫০ হাজার ডলার করে পাচ্ছেন দুই তরুণ, কীভাবে

১০ বছরে ডাউনিং স্ট্রিট ছাড়লেন ছয় প্রধানমন্ত্রী, রয়ে গেল ল্যারি নামের সেই বিড়াল

‘উনি যেন দ্রুত মারা যান’, মন্দিরের দানবাক্সে ২০ রুপির নোটে লেখা আরজি

বিশ্বকাপের মৌসুমে মেক্সিকোতে যেভাবে তারকাখ্যাতি পেল একটি হাঁস

ইয়েমেনের সেই ‘স্পাইডারম্যান’ পড়ে গেলেন আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে

ভারতের বিহারে চুরি হয়ে গেল আস্ত মোবাইল টাওয়ার

ভবন ৩২ তলা, ফ্ল্যাট বিক্রি হলো ৩৪ তলার