অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের দুর্গম বনাঞ্চলের ভেতরে ছোট্ট জনপদ লিকোলা। জনসংখ্যা মাত্র পাঁচজন। কয়েকটি কাঠের বাড়ি, একটি জেনারেল স্টোর, ছোট ক্যারাভান পার্ক ও একটি পেট্রল স্টেশন ঘিরেই পুরো শহরটি। মেলবোর্ন থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার পথ দূরত্বের শহরটি বিক্রির জন্য সম্প্রতি অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ভ্রমণকারী ও আলপাইন ন্যাশনাল পার্কগামী পর্যটকদের জন্য লিকোলা ছিল নির্ভরযোগ্য বিরতিস্থল। পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোরদের জন্য প্রায় ৫০ বছর ধরে এখানে ক্যাম্প ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি চালু রয়েছে। কিন্তু শহরটি বিক্রির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর উদ্বেগ বেড়েছে।
শহরটির মালিক স্থানীয় লায়ন্স ক্লাবের একটি শাখা। তারা জানিয়েছে, আর্থিক ক্ষতির কারণে শহরটি পরিচালনা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তাই গত বছরের শেষ দিকে চুপিসারে অনলাইনে বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, যার সম্ভাব্য দাম ধরা হয়েছে ৬ থেকে ১০ মিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার (প্রায় ৩০ থেকে ৫০ কোটি টাকা)।
এ সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন লিকোলার একমাত্র জেনারেল স্টোরের পরিচালক লিয়েন ও’ডনেল। তিনিই বর্তমানে শহরের একমাত্র স্থায়ী বাসিন্দা; থাকেন নিজের এক সন্তান, এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে।
লিয়েন বিবিসিকে বলেন, ‘এটা অসাধারণ একটা জায়গা। এখানে এসে মানুষ বলত, লিকোলায় তুমি কখনো লাখপতি হতে পারবে না। আমি বলতাম, আমি কি লাখপতি হতে এখানে এসেছি?’
২০২২ সালে তিনি দোকানটি কিনলেও ভবন বা জমির মালিক নন; লিজ নিয়ে সেটি পরিচালনা করছেন। তাঁর ধারণা ছিল, লিজের চুক্তি আরও ১৫ বছরের জন্য নবায়ন করা হবে।
লিয়েন ও’ডনেল বলেন, ‘আমি চাইতাম লিকোলা মানুষের জন্য বাড়ির মতো একটা জায়গা হোক। ফায়ার সার্ভিস থেকে শুরু করে ট্রাকচালক—প্রায় সবার কাছেই আমার ফোন নম্বর আছে। বেলা ৩টা হোক বা রাত ২টা, যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে আমি তাদের প্রথম যোগাযোগের মানুষ।’
কিন্তু এখন তাঁকেই এই জায়গা ছাড়তে বলা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ও’ডনেল আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি এই শহরটাকে ভীষণ ভালোবাসি... এটা যদি কোনো ডেভেলপারের হাতে পড়ে অন্য কিছু হয়ে যায়, সেটা আমার হৃদয় ভেঙে দেবে।’
ও’ডনেল বলেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি প্রথম জানতে পারেন শহরটি বিক্রি হতে যাচ্ছে। তখন তিনি লায়ন্স ক্লাবের বোর্ডকে সাহায্যের প্রস্তাব দেন। ও’ডনেল বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, আমি তহবিল সংগ্রহ করব, কমিউনিটি সাহায্য করবে। কিন্তু তারা বলল, কয়েক মিলিয়ন ডলার না আনতে পারলে কিছু করার নেই।’
ও’ডনেলের দাবি, বোর্ড তাঁকে সরাসরি জানায় জমি ও ভবনের মালিক তারা, তাই চাইলে তাঁর ব্যবসা বন্ধ করে দিতে পারে। আইনি পরামর্শ নেওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, লিজের কারণে বাস্তবেই তাঁর কিছু করার নেই।
ডিসেম্বরে অনলাইনে পুরো শহর বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখে বিষয়টি জনসমক্ষে আসে এবং শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া।
অনলাইনে এক ব্যবহারকারী লেখেন, ‘মানুষ এই দোকানের ওপর নির্ভর করে। পর্যটনের ভরা মৌসুমে এটা বন্ধ করা চরম বোকামি।’ আরেকজন মন্তব্য করেন, ‘বছরের পর বছর যারা এখানে ক্যাম্প করেছে, এই সিদ্ধান্ত তাদের সবার ওপর প্রভাব ফেলবে।’
লিকোলার দোকান রক্ষায় অনলাইন পিটিশনে ইতিমধ্যে ৮ হাজারের বেশি স্বাক্ষর জমা পড়েছে।
বোর্ডের এক মুখপাত্র বলেন, শহরের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাড়তে থাকা খরচ, বিমা মূল্যবৃদ্ধি, পুরোনো অবকাঠামো ও স্কুল-ক্যাম্পে অংশগ্রহণ কমে যাওয়ায় মালিকানা ধরে রাখা আর সম্ভব নয়। তাঁদের ভাষ্য, ‘নিরুপায় হয়েই এটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
বোর্ড চেয়ারম্যান ডেনিস ক্যারাথার্স বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব শুধু জায়গাটা ধরে রাখা নয়; বরং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সহায়তার বিষয়টিকে টিকিয়ে রাখা।’ বোর্ডের দাবি, আর্থিক চাপে ও’ডনেলের লিজ নবায়ন করা হয়নি এবং তাঁকে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে জায়গা ছাড়তে বলা হয়েছে।
বিক্রির অর্থ দিয়ে একটি নতুন ফাউন্ডেশন গঠন করা হবে, যেটি ভিক্টোরিয়াজুড়ে পরিচালিত বিভিন্ন ক্যাম্পে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ভরণপোষণের খরচ বহন করবে। তবে ভবিষ্যতে লিকোলায় ক্যাম্প চলবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। আবার কে হবেন নতুন মালিক এবং শহরের ভবিষ্যৎ কী হবে—তা-ও এখনো অজানা। লিকোলার বর্তমান বাসিন্দা ও আশপাশের মানুষের আশা একটাই—ছোট্ট এ শহরটি যেন তার পুরোনো পরিচয় হারিয়ে না ফেলে।