কখনো কখনো জীবনের কিছু গল্প শুনলে মনে হয়ে যেন সিনেমার কাহিনী। অবশ্য সিনেমাগুলো বাস্তবের ওপর নির্ভর করেই তৈরি হয় বেশির ভাগ সময়ই। কিন্তু বাস্তবতা কখনো কল্পনাকেও হার মানিয়ে দেয়। আর এমনই এক সিনেমাটিক জীবন মিনা ও মিনাল নামে দুই বান্ধবীর কিংবা বলা হয় দুই বোনের।
আশির দশকে ভারতে জন্ম মিনা গেলটিঙ্ক ও মিনাল টিজেনের। জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই পশ্চিম ভারতের মুম্বাই শহরের দুটি আলাদা অনাথ আশ্রম থেকে তাঁদের দত্তক নেওয়া হয়। তারপর সেখান থেকে নেদারল্যান্ডসে কাছাকাছি এলাকায় বড় হয়েছেন তাঁরা। পরে জানতে পারেন, একই বাবা-মায়ের সন্তান তাঁরা। একে অপরের বোন।
কৈশোরের শুরুতে প্রথমবার তাঁদের দেখা হয়েছিল। যে দত্তক গ্রহণকারী সংস্থার মাধ্যমে তাঁদের বাবা-মা তাঁদের দত্তক নিয়েছিলেন, সেই সংস্থার আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে তাঁদের দেখা হয়। তখনই চেহারা ও অঙ্গভঙ্গিতে অদ্ভুত মিল দেখে দুজনই অবাক হয়েছিলেন।
৪৩ বছর বয়সী মিনা সেই দিনের কথা স্পষ্ট মনে করতে পারেন। তিনি বলেন, ‘সব দত্তক নেওয়া শিশুকে এক জায়গায় আনা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল একসঙ্গে সময় কাটানো, পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং রাতের খাবার খাওয়া।’
মিনা ও মিনাল দুজনের সঙ্গেই তাঁদের বন্ধুরা ছিল। তাঁরাই প্রথম খেয়াল করেন, দেখতে দুজনের মধ্যে বেশ মিল।
মিনা বলেন, ‘তারা বলেছিল, “আয়নায় নিজেদের দেখো।” তখন আমি বললাম, “হায় ঈশ্বর! ওর নাকটা তো আমার মতো! আমাদের হাসিও একই রকম। ”’
মিনা বলেন, ‘রাতের খাবারের সময় আমি পুরোটা সময় ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলাম।’
পরদিন নিজেদের ফোন নম্বর ও ঠিকানা বিনিময় করেন এবং যোগাযোগ রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।
মিনা জানান, সে সময় নিজেদের মধ্যে রক্তের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি ভাবনাতেও আসেনি। তবু প্রথম দেখাতেই তাঁদের মধ্যে একধরনের গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। এরপর বছরের পর বছর তাঁরা একে অপরকে চিঠি লিখেছেন। চিঠিতে প্রায়ই একে অপরকে ‘বোন’ বলে সম্বোধন করতেন। কারণ, ‘আমাদের তেমনই মনে হতো।’
চিঠিতে তাঁরা স্কুল, বন্ধু, ছেলে, ঘুরতে যাওয়া ও নাচ নিয়ে লিখতেন। কে কোন খেলাধুলা করেন, তা নিয়েও কথা বলতেন। সংগীত নিয়েও তাঁদের অনেক কথা হতো। একসময় তাঁরা আবিষ্কার করেন, দুজনেরই প্রিয় ব্যান্ড ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ।
এরপর প্রায় ১৫ বছর আগে তাঁদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মিনাল ফ্রান্সে চলে যান। আর মিনা তখন সম্প্রতি প্রথম সন্তানের মা হয়েছেন, ফলে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
২০১৭ সালে ভারতে জন্ম নেওয়া দত্তক সন্তানদের আরেকটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন মিনা। সেখানে ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়ে জানতে পারেন। এরপর নিজেও ডিএনএ পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পরীক্ষার পর তিনি কোনো মিল খুঁজে পাননি। চলতি বছরের শুরুর দিকে ফোনের মেমোরি পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় তিনি ওই অ্যাপটিও মুছে দেন।
এরপর ২০ মে মিনার ফেসবুকে একটি বার্তা আসে মিনালের কাছ থেকে। মিনা বলেন, ‘সে লিখেছিল, “আমাকে মনে আছে?”’
এপ্রিল মাসে নেদারল্যান্ডসে নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে মিনাল ডিএনএ পরীক্ষা করেছিলেন। ফেসবুকে পাঠানো বার্তার সঙ্গে তিনি পরীক্ষার ফলাফলের একটি স্ক্রিনশটও যুক্ত করেছিলেন।
মিনা বলেন, ‘আমি অ্যাপটি আবার ইনস্টল করলাম। এতটাই নার্ভাস ছিলাম যে, লগইন করতে গিয়ে ১০ বার ভুল পাসওয়ার্ড দিয়েছিলাম।’ এরপর যে ফলাফল তিনি দেখলেন, তা নিয়ে কোনো সংশয়ই ছিল না। দুজনের ডিএনএ ‘১০০ শতাংশ মিলে গেছে’।
মিনা জানান, ‘আমার একটি “ফুল সিস্টার” পাওয়া গিয়েছিল। এর অর্থ, আমাদের একই জৈবিক মা ও বাবা।’
মিনা বলতে থাকেন, ‘মনে হচ্ছিল, শরীরে যেন হঠাৎ অ্যাড্রেনালিনের ঢেউ উঠেছে। আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। মিনাল ছিল আমার সেই হারিয়ে যাওয়া ধাঁধার অংশ, যার জন্য আমি এত দিন অপেক্ষা করছিলাম। আমরা একে অপরকে বোন বলে ডাকতাম। এই ডিএনএ পরীক্ষার ফলই নিশ্চিত করল, আমাদের এত দিনের টান আসলে ঠিক ছিল।’
আগস্টের এক সুন্দর রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে দুই পুরোনো বন্ধু দেখা করেন। প্রথমবারের মতো বোন হিসেবে।
তিন সন্তানের মা মিনা বলেন, ‘অসাধারণ অনুভূতি ছিল। মনে হলো, ঘরে ফিরে এসেছি। বছরের পর বছর মিনা আর আমি আমাদের হৃদয়ে একটা বড় শূন্যতা অনুভব করেছি। এখন মনে হচ্ছে, সেই শূন্যতা পূর্ণ হয়েছে। সবকিছু এখন যেন ঠিক যেভাবে হওয়ার কথা ছিল, সেভাবেই হচ্ছে।’
তাঁদের ‘আবেগঘন পুনর্মিলন’ নিয়ে প্রতিবেদনে রয়টার্স জানিয়েছে, তাঁদের সাক্ষাতে ছিল ‘কান্না, আলিঙ্গন আর হাসি’। এরপর তাঁরা একসঙ্গে প্রথমবারের মতো সেলফি তোলেন।
৪৪ বছর বয়সী মিনাল এখন ফ্রান্সে তাঁর সঙ্গী ও দুই ছেলেকে নিয়ে থাকেন। রয়টার্সকে তিনি জানান, এপ্রিল মাসে ডিএনএ পরীক্ষার ফল হাতে পাওয়ার পর প্রথমে তিনি বুঝতেই পারেননি যে পরীক্ষায় পাওয়া মিলটি সেই কিশোরীর সঙ্গে, যে ৩০ বছর আগে প্রথম দেখা হওয়ার সময় তাঁকে জড়িয়ে ধরেছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিনার ছবিগুলো দেখার পর বিষয়টি তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়। মিনা তাঁর বোন এটি তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না।
মিনাল বলেন, ‘বোন হওয়ার আগে আমরা বন্ধু ছিলাম। আমরা পুরো সময়টাই বোন ছিলাম, শুধু আমরা তা জানতাম না।’
মিনা ও মিনালকে মুম্বাইয়ের দুটি আলাদা অনাথ আশ্রম থেকে দুটি ভিন্ন ডাচ দম্পতি দত্তক নিয়েছিলেন। মিনা জানান, নেদারল্যান্ডসের একটি ছোট গ্রামে তাঁর বেড়ে ওঠা। তাঁর দত্তক বাবা-মা একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন।
মিনা বলেন, ‘তাঁরা আমার শিক্ষকও ছিলেন। তাঁরা খুবই স্নেহশীল ও বিশ্বাসপ্রবণ মানুষ ছিলেন।’
কয়েক বছর আগে তাঁর বাবা মারা গেছেন। তবে মা এখনো সেই একই গ্রামে থাকেন। মিনা বলেন, ‘প্রতিদিন মায়ের কথা বলি। তিনি এখনো আমার নিরাপদ আশ্রয়।’
২০০৩ সালে ১৯ বছর বয়সে মুম্বাইয়ের সেই অনাথ আশ্রমে গিয়েছিলেন মিনা। সঙ্গে ছিলেন তাঁর বাবা-মা এবং গোয়া থেকে দত্তক নেওয়া তাঁর ভাই। দুই সপ্তাহ ধরে তাঁরা বিভিন্ন নথি খুঁজেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল মিনার জৈবিক বাবা-মা সম্পর্কে কিছু জানা। মিনা বলেন, ‘আমার জন্য এটা জানা গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে আমি কোথা থেকে এসেছি। কিন্তু অনাথ আশ্রম কর্তৃপক্ষ তাঁদের সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।’
মে মাস থেকে মিনা ও মিনাল এক দিন পরপর কথা বলছেন। তাঁরা একে অপরের স্বামী বা সঙ্গী, সন্তান, ভাই ও বাবা-মায়ের সঙ্গেও দেখা করেছেন। মিনা বলেন, ‘সবাই খেয়াল করে যে আমরা কীভাবে একজনের কথা আরেকজন শেষ করি দিই, কীভাবে মাথা নাড়ি বা একই রকমভাবে হাঁটি।’
মিনা বলেন, ‘কখনো কখনো আমরা দুই ঘণ্টা কথা বলি, সময়ের হিসাবই থাকে না। হঠাৎ মনে পড়ে, আমাদের বাজার করতে হবে অথবা স্কুল থেকে বাচ্চাদের নিয়ে আসতে হবে।’
মিনা জানান, তাঁদের একটি বিষয় ‘খুব করতে ইচ্ছা করে’। যে জায়গা থেকে তাঁদের গল্পের শুরু, সেখানে আবার ফিরে যাওয়া। তিনি বলেন ‘কোনো একসময় আমরা একসঙ্গে ভারতে যেতে চাই। মুম্বাইয়ের রাস্তায় একসঙ্গে হাঁটতে চাই।’
মিনা আরও বলেন, ‘এমন সময়ও গেছে, যখন আমরা দুজনই খুব একা অনুভব করেছি। যেমন, আমি যখন বাবাকে হারিয়েছি বা যখন কোনো সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছিল। আমরা একে অপরের পাশে থাকতে পারিনি, এটাই আমার আফসোস। আমরা একে অপরের আনন্দ ভাগ করে নিতে পারতাম, কঠিন সময়ে একে অপরকে সাহায্য করতে পারতাম।’