অনলাইনে খাবার সরবরাহকারী প্ল্যাটফর্মে জন্মদিনের কেক অর্ডার করেছিলেন চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের বাসিন্দা লিউ। কেক ডেলিভারি পাওয়ার পর দেখলেন, কেক যেসব ফুল দিয়ে সাজানো সেগুলো খাওয়ার উপযোগী নয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেন তিনি। এই অভিযোগের সূত্র ধরে বেরিয়ে আসে এমন সব তথ্য যা থেকে জরিমানা করা হয় ৩.৬ বিলিয়ন ইউয়ান (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬ হাজার ৬০৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা)।
সিএনএনের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কেকের ওপর নকল ফুল দেওয়ার অভিযোগটি প্রথমে একটি সাধারণ অভিযোগ বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু তদন্ত করতে গিয়ে সন্ধান মেলে এক ভুয়া বেকারি চেইনের। যারা দাবি করে, তাদের প্রায় ৪০০টি শাখা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তাদের কোনো দোকানই ছিল না। খাদ্য ব্যবসার ভুয়া লাইসেন্স ব্যবহার করে কার্যক্রম পরিচালনা করছিল তারা।
তদন্ত এগোতে থাকলে দেখা যায়, এ যেন কেঁচো খুড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসার দশা। দেখা গেল, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে খাবার সরবরাহ করা অনেক বিক্রেতা নিজেরা কোনো খাবার প্রস্তুত করতেন না। বরং তারা অর্ডার গ্রহণ করে মধ্যস্থতাকারী প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তৃতীয় পক্ষের উৎপাদনকারীদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যে প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে কম দামে খাবার সরবরাহ করতে পারত, তাদের কাছে অর্ডারগুলো যেত। এতে খাবারের দাম কমলেও মান ও নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি দেখা দেয়।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এ ধরনের ৬৭ হাজারের বেশি ‘ভূতুড়ে’ বিক্রেতাকে শনাক্ত করা হয়েছে। তারা সম্মিলিতভাবে ৩৬ লাখের বেশি কেক বিক্রি করেছে।
চীনের স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ফর মার্কেট রেগুলেশন (এসএএমআর) তদন্তে দেখতে পায়, পিডিডি হোল্ডিংস, আলিবাবা গ্রুপ, জেডি ডটকম, মেইতুয়ান এবং বাইটড্যান্সসহ কয়েকটি বড় প্ল্যাটফর্ম বিক্রেতাদের পরিচয় যথাযথভাবে যাচাই করতে এবং ভোক্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এ কারণে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মোট ৩৬০ কোটি ইউয়ান জরিমানা আরোপ করে। চীনের খাদ্য নিরাপত্তা আইনের আওতায় এটি অন্যতম বড় অঙ্কের জরিমানা।
তদন্ত চলাকালে বিভিন্ন ধরনের বাধার মুখেও পড়তে হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। কয়েকটি ক্ষেত্রে কর্মীরা তদন্তে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানান বা প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে বিলম্ব করেন। এমনকি প্রমাণ গোপনের চেষ্টার ঘটনাও ঘটে। এর মধ্যে একজন ‘চুপ থাকো’ লেখা একটি নোট গিলে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন।
অন্য একটি ঘটনায় নিরাপত্তাকর্মীরা কর্মকর্তাদের ধাক্কা দেন এবং তাঁদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদের সময় একজন নির্বাহী কর্মকর্তা হঠাৎ পড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। তবে পরে তাঁর গুরুতর কোনো শারীরিক সমস্যা পাওয়া যায়নি।
এই ঘটনায় চীনে মূল্য নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। দেশটিতে এ ধরনের প্রবণতাকে প্রায়ই ‘ইনভল্যুশন’ বলা হয়। খাবার সরবরাহকারী প্ল্যাটফর্মগুলো ভোক্তাদের আকৃষ্ট করতে দাম বেশ কমিয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এতে খাদ্য নিরাপত্তা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি উপেক্ষিত হচ্ছে। এদিকে সরকার ‘অ্যান্টি-ইনভল্যুশন’ কর্মসূচির মাধ্যমে এ ধরনের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।