টেলিযোগাযোগ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অংশীজনদের অভিযোগ, মতামত ও প্রশ্ন জানতে প্রতি চার মাসে একবার গণশুনানি করবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)।
আজ বুধবার সকালে সংস্থাটির সপ্তম গণশুনানিতে এ কথা জানানো হয়। অনলাইনে অনুষ্ঠিত এই গণশুনানিতে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি ভবন থেকে সংস্থাটির কর্মকর্তারা যুক্ত হন। আর অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কনভে ও জুমে গ্রাহক, সাংবাদিক ও বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনেরা যুক্ত ছিলেন।
গণশুনানিতে সভাপতিত্ব করেন কমিশনের স্পেকট্রাম বিভাগের কমিশনার মাহমুদ হোসেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কমিশনের সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহজাদ পারভেজ মহিউদ্দিন।
অনলাইনে আয়োজিত এই গণশুনানিতে টেলিযোগাযোগ সেবার মান, নেটওয়ার্ক কাভারেজ, কলড্রপ, ইন্টারনেটের গতি ও মূল্য, মোবাইল ডেটা ও ভয়েস সেবার চার্জ, গ্রাহকসেবা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্ন, অভিযোগ ও মতামত উপস্থাপন করা হয়। গণশুনানি উপলক্ষ্যে গত ১৭ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত অনলাইনে মোট ২ হাজার ৯৯০ জন গ্রাহক নিবন্ধন করেন। তাঁদের মধ্যে নারী অংশগ্রহণকারী ছিলেন ১৭২ জন।
বিটিআরসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গণশুনানিতে কমিশনের সিস্টেম এন্ড সার্ভিসেস বিভাগ সম্পর্কিত বিষয়ে ১ হাজার ৪৫টি, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগ সম্পর্কিত ৮৪৪টি, স্পেকট্রাম বিভাগ সংশ্লিষ্ট ৬৩টি, লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং বিভাগ সম্পর্কিত ১৯টি এবং এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড ইন্সপেকশন ডিরেক্টরেট সংশ্লিষ্ট ৫টি অভিযোগ, মতামত ও প্রশ্ন এসেছে। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে ট্যারিফ, ডেটা স্পিড ও মেয়াদ, ডেটা ক্যারি-ফরওয়ার্ড, নেটওয়ার্ক কাভারেজ, সিম নিবন্ধন, এনইআইআর, লাইসেন্স ও সেবার মান সংক্রান্ত বিষয়ে।
গণশুনানিতে স্বাগত বক্তব্যে বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের কমিশনার মাহমুদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১ (সংশোধিত ২০২৬) এর ধারা ৮৭ অনুযায়ী, কমিশন প্রতি চার মাসে একবার গণশুনানি আয়োজন করবে। এ গণশুনানিতে জনগণ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা টেলিযোগাযোগ সেবা, ট্যারিফ, লাইসেন্সিং এবং জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে তাঁদের প্রশ্ন, মতামত, সুপারিশ ও উদ্বেগ তুলে ধরার সুযোগ পাবেন।
মাহমুদ হোসেন বলেন, গণশুনানিতে উত্থাপিত প্রতিটি গঠনমূলক প্রশ্ন, সুপারিশ ও উদ্বেগকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে কমিশনের গণশুনানি কার্য-পর্যবেক্ষণ তালিকাতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পরবর্তীতে এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সমাধান এবং অগ্রগতি নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে।
গণশুনানিতে অংশ নিয়ে জামালপুর থেকে রাকীব রায়হান নামের একজন গ্রাহক মুঠোফোন অপারেটরদের কলরেট কমানো এবং গ্রামাঞ্চলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অপারেটর টেলিটকের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের বিষয়ে জানতে চান। জবাবে সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক জানান, বর্তমানে বিটিআরসি কর্তৃক নির্ধারিত ভয়েস কলের ট্যারিফ সর্বনিম্ন ৪৫ পয়সা এবং সর্বোচ্চ ২ টাকা। গ্রাহকদের স্বার্থ বিবেচনায় ভয়েস কলের ফ্লোর প্রাইস কমানোর বিষয়ে বিটিআরসিতে কাজ চলছে।
টেলিটকের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিউল আলম পারভেজ বলেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর টেলিটক বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক রোলআউটের বাধ্যবাধকতা পূরণ করছে। পাশাপাশি হাওর-বাঁওড়সহ দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে টেলিটকের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
গণশুনানিতে কমিশনের প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক মো. মেহেদী-উল-সহিদ, স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আমিনুল হক, লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং বিভাগের মহাপরিচালক আশীষ কুমার কুন্ডুসহ বিটিআরসির বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে অনলাইনে গণশুনানির পরিবর্তে গ্রাহকের সরাসরি অংশগ্রহণে গণশুনানি আয়োজনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন। আজ বুধবার দুপুরে এক বিবৃতিতে সংগঠনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, গণশুনানির মূল উদ্দেশ্য হলো সাধারণ গ্রাহকের মতামত, অভিযোগ, সমস্যা ও প্রত্যাশা সরাসরি সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু অনলাইনে সীমিত পরিসরে গণশুনানি আয়োজন করে প্রকৃত অর্থে দেশের কোটি কোটি গ্রাহকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
দেশে এখনো প্রায় ৪৫ শতাংশ ফিচার ফোন ব্যবহারকারী। ইন্টারনেটের বাইরে আছেন অনেকে। সেখানে অনলাইনে গণশুনানি কতটুকু যুক্তিসংগত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি বলেছে, ২০২২ সালের গণশুনানিতে ৮৪৮ জন নিবন্ধন করেছিলেন। সেখানে মাত্র ৯৪ জন অংশ নিতে পেরেছিলেন। এরপর ২০২৪ সালে সশরীরে অনুষ্ঠিত হলেও ২০২৫ সালে আবার অনলাইনে গণশুনানি হয়।
বিবৃতিতে সংগঠনটি অভিযোগ করেছে, ‘২০২৫ সালের গণশুনানিতে আমরা অংশগ্রহণ করেও কথা বলতে পারিনি। কিংবা তারা (বিটিআরসি) আমাদের কথা শুনতে চায়নি। বলা চলে, একপর্যায়ে তারা বাধার সৃষ্টি করেছে। এখানে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ জন নিবন্ধন করলেও হাতেগোনা অল্প কয়েকজনের কথা শোনা হয়। অনেকে মনে করেন, এই ব্যক্তিরাও তাদের পূর্বে থেকে নির্ধারিত।’ এসব অভিযোগ তুলে ধরে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।