হোম > প্রযুক্তি

আলেক্সান্ড্র ওয়াং অচিরেই বদলে দেবেন পৃথিবী

মইনুল হাসান, ফ্রান্স  

এআইকে প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহারের আগে বিপুল ইনপুট ডেটা সতর্কতার সঙ্গে বাছাই, পরিশোধন ও সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো হয়। ছবি: স্কেল এআই

বহু মানুষের জীবনের পুরোটাই খরচ হয়ে যায় সোনার হরিণের পেছনে দৌড়ে। আর কারও কাছে সোনার হরিণ নিজেই দরজায় এসে কড়া নাড়ে। আলেক্সান্ড্র ওয়াং তেমনই এক বিস্ময়কর উদাহরণ, যিনি মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিরাচরিত লেখাপড়া ছেড়ে উদ্যোক্তা হন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশমান জগতে গড়ে তোলেন নিজের বিশাল সাম্রাজ্য। উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো নিজেকে বসিয়েছেন ‘অতি-বুদ্ধিমত্তা’ অর্থাৎ সুপার ইন্টেলিজেন্সের প্রায় অতিপ্রাকৃত জগতের কেন্দ্রে।

আজ ২৯ বছর বয়সী ওয়াং শুধু একজন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা নন; তিনি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী এআই প্রতিষ্ঠান মেটার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশলের সঙ্গেও যুক্ত। ফোর্বস জানিয়েছে, চলতি বছর তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩২০ কোটি মার্কিন ডলার। দেশে বা বিদেশে যেখানেই যান, তাঁর সান্নিধ্য পেতে ভিড় করেন এআই জগতের নক্ষত্ররা। রাষ্ট্রপ্রধানেরা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকেন। প্রচণ্ড আশাবাদী এই তরুণের বিশ্বাস, আমাদের চিরপরিচিত পৃথিবীকে আমূল বদলে দেওয়া এখন শুধু সময়ের ব্যাপার।

চীনা অভিবাসী বাবা-মায়ের সন্তান

আলেক্সান্ড্র ওয়াংয়ের গল্পের শুরু যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর লস আলামোসে। ১৯৯৭ সালের জানুয়ারিতে সেখানেই তাঁর জন্ম। ওয়াংয়ের বাবা-মা দুজনই পদার্থবিজ্ঞানী। আশির দশকে চীন থেকে ভাগ্যের সন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তাঁরা। ছোট্ট ওয়াংয়ের বেড়ে ওঠা ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পরিবেশে। ছোটবেলা থেকে গণিত ও কম্পিউটারের প্রতি তাঁর খুব আগ্রহ ছিল। স্কুলজীবনে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করেন তিনি।

১৯ বছর বয়সে লেখাপড়া ছেড়ে দেন

মাত্র ১৭ বছর বয়সে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ভর্তি হন নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে। কিন্তু গৎবাঁধা শিক্ষাকে তিনি মনে করতেন সময়ের অপচয়। তাই মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়কে বিদায় দিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন স্কেল এআই নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান। সঙ্গে নেন লুসি গুওকে।

অতি-বুদ্ধিমত্তার বিস্ময়কর তরুণ আলেক্সান্ড্র ওয়াং। ছবি: স্কেল এআই

প্রতিষ্ঠানটির মূল কাজ হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল তথ্যকে মানুষের সহায়তায় সংগঠিত, লেবেল ও মূল্যায়ন করা। সোজা কথায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বুদ্ধি বৃদ্ধিতে রসদ সরবরাহ করে মস্তিষ্ক গঠনে কাজ করা।

এরপর তাঁকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দক্ষতা সৃষ্টির তাঁর এই অনন্য উদ্ভাবনী প্রকল্পে আগ্রহ প্রকাশ করে মেটা, ওপেনএআই ও মাইক্রোসফটের মতো শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। সেই সঙ্গে সরকারি প্রতিরক্ষা খাতের জন্য ডেটা সিস্টেম তৈরিতে তাঁর প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হয় দেশ রক্ষায় নিয়োজিত কর্মকর্তারা। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ, বিশেষ করে মার্কিন সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং পেন্টাগনের সঙ্গেও প্রতিষ্ঠানটির চুক্তি হয়। ব্যবসাটি দ্রুত বড় হতে থাকে। ২০২১ সালে স্কেল এআইয়ের মূল্যায়ন ৭৩০ কোটি ডলারে পৌঁছায় এবং ২০২২ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে ওয়াং প্রথমবারের মতো ফোর্বসের কোটিপতিদের সীমিত তালিকায় জায়গা করে নেন। তিনি হন বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ কোটিপতি।

বর্তমানে তিনি মেটা সুপার ইন্টেলিজেন্স ল্যাবসের প্রধান হিসেবে অতি-বুদ্ধিমত্তার জগৎ দখলের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ওয়াং এখন শুধু একজন কোটিপতি উদ্যোক্তা নন; তিনি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটির এআই কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাঁর গল্প তাই শুধু বিপুল অর্থসম্পদের গল্প নয়; তরুণ বয়সে ঝুঁকি নেওয়া, চিরাচরিত পথ থেকে বেরিয়ে আসা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎকে ব্যবসার কেন্দ্রে নিয়ে আসার এক অতি অসাধারণ উদাহরণ।

এখন তাঁর বয়স ২৯। হাতে এখনো অনেক সময়। আর সেই সময়েই তিনি এমন একটি প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশ নিচ্ছেন, যা ভবিষ্যৎ পৃথিবীর অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, কর্মসংস্থান এবং মানুষের জীবনযাত্রাকে আমূল বদলে দিতে পারে। সম্ভবত আগামী দশকের পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হবে শুধু অর্থ বা প্রাকৃতিক সম্পদ নয়—জ্ঞান, সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং প্রযুক্তিকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর দক্ষতা।

সেই প্রতিশ্রুতিই দিচ্ছেন অতি-বুদ্ধিমত্তার বিস্ময়কর তরুণ আলেক্সান্ড্র ওয়াং। সম্ভবত তিনি অচিরেই বদলে দিতে যাচ্ছেন আমাদের পরিচিত পৃথিবীর দৃশ্যপট।