হোম > প্রযুক্তি

এক দশকের মধ্যে মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে এআই, গবেষকের উদ্বেগ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ওপেনএআই দাবি করেছে, তাদের এআই মডেল ও কয়েক হাজার বট মাত্র ৮৮ ঘণ্টায় ৯০ বছরের পুরোনো এক অমিমাংসীত গাণিতিক সমীকরণ সমাধান করেছে। প্রতীকী ছবি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে উদ্বেগ আর সতর্কতা বাড়ছেই। এবার অ্যানথ্রপিকের শীর্ষস্থানীয় গবেষক ইভান হুবিঙ্গার বললেন, এআই এত দ্রুত এগোচ্ছে যে, আগামী এক দশকের মধ্যে এটি সব মানুষকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দিতে পারে এমন সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি। এআইয়ের লক্ষ্য ও মানুষের মূল্যবোধের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার কোনো পরিকল্পনা এখনো নেই বলেও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইভান হুবিঙ্গার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে থাকা মডেলগুলোর ঝুঁকি ‘কম’। তবে প্রযুক্তিটি দ্রুত উন্নত হয়ে নিজেই নিজের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। অচিরেই এটি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যখন মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

ভবিষ্যতে এআই ব্যবস্থা কীভাবে মানুষের অস্তিত্ব বিলীন করে দিতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি হুবিঙ্গার।

এআই নিয়ে সতর্কবার্তা ক্রমেই বাড়ছে। বিতর্ক এখন এআই সত্যিই ঝুঁকি তৈরি করছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকে সরে ঝুঁকির মাত্রা কতটা সেদিকে চলে গেছে।

অ্যানথ্রপিক থেকে সম্প্রতি পদত্যাগ করা এবং আগে ওপেনএআইয়ে কাজ করা এআই গবেষক জ্যাকব কক্সনের এক্স পোস্টের জবাবে এসব কথা বলেন হুবিঙ্গার। কক্সন লিখেছিলেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠানই দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছে না।’

জ্যাকব কক্সন আরও লেখেন, ‘শিগগিরই এগুলো এমন সব ব্যবস্থা হয়ে উঠবে, যেগুলো মানুষের চেয়ে বেশি সক্ষম হবে, যেকোনো কিছু হ্যাক করতে পারবে, রাতারাতি যেকোনো ক্ষেত্রকে আমূল বদলে দিতে পারবে এবং বাস্তব ক্ষমতা ও সম্পদ অর্জন করতে পারবে।’

মন্তব্যের জন্য ওপেনএআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।

এআই বিষয়ে জাতিসংঘের পরামর্শক কম্পিউটার বিজ্ঞানী ডেম ওয়েন্ডি হল বিবিসিকে বলেন, হুবিঙ্গার ও কক্সনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখে তিনি ‘হতবাক’ হয়েছেন।

বিবিসি রেডিও ফোরের ‘ওয়ার্ল্ড অ্যাট ওয়ান’ অনুষ্ঠানে ডেম ওয়েন্ডি হল বলেন, এসব বক্তব্যের কিছু অংশ ‘জনসংযোগ ও বিপণন’ কৌশলও হতে পারে। কারণ, অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআই বহুল প্রত্যাশিত শেয়ারবাজারে প্রবেশের দিকে এগোচ্ছে।

ডেম ওয়েন্ডি হল বলেন, ‘কেউ এমন কথা বলতে চাইবে কেন? তাঁদের মূল্যবোধ যদি এমন হয়, তাহলে আমি বিনিয়োগকারীদের কাছে এই কোম্পানিতে বিনিয়োগ না করার জন্য অনুরোধ জানাব।’

কক্সনের পদত্যাগের পর যুক্তরাজ্যের সাবেক ট্রেজারি চিফ সেক্রেটারি ড্যারেন জোনস প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের কাছে একটি খোলা চিঠি লেখেন। চিঠিতে নিরাপদভাবে এআই উন্নয়নের জন্য নতুন বহুজাতিক চুক্তির আহ্বান জানানো হয়।

ড্যারেন জোনস বিবিসিকে বলেন, সুপারইনটেলিজেন্স বা অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নকে কেন্দ্র করে একটি চুক্তি কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে সরকারগুলোকে একসঙ্গে ‘সহযোগিতা’ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘সরকারগুলো এসব সতর্কবার্তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা না নিলে এবং এ বিষয়ে এগিয়ে না এলে উন্নয়নের গতি এমন হতে পারে যে, এটি আমাদের জন্য কোনো সমস্যা কি না, তা খতিয়ে দেখা শুরু করার আগেই আমরা সমস্যার মুখোমুখি হয়ে যাব।’

এদিকে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এআই ঝুঁকি মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান যুক্তরাজ্যের এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে অ্যানথ্রপিক তাদের সর্বশেষ মডেলটি গোপন রেখেছে।

অ্যানথ্রপিক তাদের কর্মীদের এসব পোস্ট কিংবা এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটের সঙ্গে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

সর্বশেষ মডেলটি এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে গোপন রাখা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে যুক্তরাজ্যের ক্যাবিনেট অফিসের একজন মুখপাত্রও মন্তব্য করেননি। তবে তিনি বলেন, মডেলগুলোকে আরও নিরাপদ করতে অ্যানথ্রপিকসহ শিল্প খাতের অংশীদারদের সঙ্গে সরকার ‘ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে’।

হুবিঙ্গারের পোস্টটি ১ কোটির বেশি বার দেখা হয়েছে। পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমরা সত্যিই আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি’ যে, এআই মানুষের প্রজাতির অস্তিত্ব শেষ করে দেওয়ার মতো ঝুঁকি তৈরি করছে।

ইভান হুবিঙ্গার আরও বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, অ্যানথ্রপিক যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। কিন্তু সুপারইনটেলিজেন্সের ক্ষেত্রে এআইয়ের লক্ষ্য ও মানুষের মূল্যবোধের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার সমস্যা সমাধানের কোনো পরিকল্পনা এখনো আমাদের নেই। এ ক্ষেত্রে আমরা যে সঠিক পথে এগোচ্ছি, সেটিও স্পষ্ট নয়।’

হুবিঙ্গার এআই অ্যালাইনমেন্ট বা এআইয়ের লক্ষ্য ও মানুষের মূল্যবোধের মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়ে কাজ করেন। এর লক্ষ্য প্রযুক্তির মধ্যে মানুষের নৈতিক ধারণা ও নীতিগুলো যুক্ত করা। অর্থাৎ মানুষ যে মূল্যবোধকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, এআই যেন সেই অনুযায়ী পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য।

অনেক শীর্ষস্থানীয় গবেষক মনে করেন, এসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। চলতি গ্রীষ্মে একের পর এক এমন ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে এআই এজেন্টগুলো সাইবার হামলা চালিয়েছে।

এআই খাতের তিন প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও মেটা তাদের এআই সরঞ্জামের মাধ্যমে পরিচালিত হ্যাকিংয়ের ঘটনা প্রকাশ করেছে। আগস্টে প্রকাশিত অ্যানথ্রপিকের নিরাপত্তা প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো কাল্পনিক শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছার সঙ্গে তাদের মডেলগুলোর লক্ষ্য ও আচরণের অমিল তৈরি হলে মডেলগুলো ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাকে কাজে লাগানো বা তাতে কারসাজি করার মতো পরিস্থিতি তৈরির ঝুঁকি কম।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অত্যন্ত সক্ষম এআই ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা’ করতে সক্ষম হওয়ার ঝুঁকিও একইভাবে কম। এর ফলে ‘এআইয়ের মাধ্যমে শুরু হওয়া বিপর্যয়কর ক্ষতি’ হতে পারে। তবে অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, আগের তুলনায় এ মূল্যায়নের বিষয়ে তারা ‘কম আত্মবিশ্বাসী’।

অ্যানথ্রপিক লিখেছে, ‘সম্ভাব্য দ্রুতগতির অগ্রগতির প্রাথমিক লক্ষণ আমরা দেখতে পাচ্ছি।’

এআই খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা প্রযুক্তিটির নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে বহু বছর ধরে সতর্ক করে আসছেন। ২০২৩ সালে ওপেনএআই, গুগল ডিপমাইন্ড ও অ্যানথ্রপিকের প্রধানেরাও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এসব সতর্কবার্তা আরও জোরালো হয়েছে। কারণ, প্রতিষ্ঠানগুলো এআইকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে, এমন প্রমাণ সামনে আসছে।

চলতি মাসের শুরুতে ওপেনএআইয়ের প্রধান বিজ্ঞানী জ্যাকুব পাচকোকি এআইয়ের অগ্রগতি নিয়ে ‘চরম সতর্কতা’ অবলম্বনের আহ্বান জানান। ‘ভবিষ্যৎ যেন মানুষের নিয়ন্ত্রণেই থাকে’, তা নিশ্চিত করতে আরও হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন এই খাতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। তাঁদের মধ্যে অ্যানথ্রপিকের প্রধান দারিও আমোদেই ও জ্যারেড কাপলানও রয়েছেন।

এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর ১ হাজার ৩০০ কর্মীর স্বাক্ষর করা একটি খোলা চিঠিতে তাঁরা মার্কিন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যেন ‘স্বয়ংক্রিয় এআই উন্নয়নের সর্বাধুনিক পর্যায়ের গতি ইচ্ছাকৃতভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে সমর্থন করা হয়’।